November 15, 2018

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বিশ্বনাথের মোবাশ্বের আলীর স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন স্ত্রী সুনু বিবি

স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও মিলেনি সনদ : গৃহহীন পরিবার

picমোঃ আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি  :: ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ শহীদ আর ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জ্বতের বিনিময়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্বনাথবাসীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ অঞ্চলের প্রায় দেড় শতাধিক বীরসন্তান নিজের জীবন বাজী রেখে দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য অংশগ্রহন করেন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বনাথের ৬জন গর্বিত সন্তান দেশের জন্য জীবন দিয়ে শহীদ হওয়ার বিরল গৌরব অর্জন করেন। তাদের এ অবদানের জন্য বিশ্বনাথবাসী গর্বিত। মুক্তিযোদ্ধে শহীদ বিশ্বনাথের ৬ কৃতিন্তানদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন শহীদ সিপাহী মোবাশ্বের আলী। কিন্ত সিপাহী মোবাশ্বের আলী নামে যে বিশ্বনাথে একজন গর্বিত সন্তান মুক্তিযোদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন তা এখনো জানেন না এ অঞ্চলের অনেকেই।

স্বামীর স্মৃতিকে বুকে আকড়ে ধরে বেঁচে আছেন শহীদ সিপাহী মোবাশ্বের আলীর স্ত্রী মোছাঃ সুনু বিবি। তিনি অভাবের তাড়নায় স্বামীর ভিটেমাটি বিক্রি করে গৃহহীন হয়ে বসবাস করছেন অন্যত্র। স্বাধীনতার ৪৬বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো মিলেনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সনদ। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন নং মুবিম/প্রঃ৩/মুক্তিযোদ্ধা/গেজেট/২০০৩/৪৭৯ তারিখ ৪ সেপ্টেম্বর ২০০৩ ইং মোতাবেক ২০০৪ সালের ১৫জুন প্রকাশিত শহীদ গেজেট’র ৪৯৩ নম্বারে এবং বিডিআর’র শহীদ তালিকায় ১১০১১ নাম্বারে নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে শহীদ মোবাশ্বের আলীর।

জাতির গর্বিত সন্তান শহীদ সিপাহী মোবাশ্বের আলী বিশ্বনাথ উপজেলার অলংকারী ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের মরহুম তাখরেছ আলী ও মরহুমা পাকি বিবির পুত্র। তিনি ১৯৩১ সালের ২ জুন জন্মগ্রহন করেন।

১৯৫৮ (সম্ভাব্য) সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বেঙ্গল রেজিমেন্ট (বিডিআর) এ তিনি যোগদেন। ১৯৬৩ সালে আপন চাচাতো বোন সুনু বিবির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মোবাশ্বের আলী। ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতির উপর যখন পাকহানাদার বাহিনী অতর্কিত ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন স্ত্রী, ৭বছর বয়সী এক কন্যা ও ২বছরের এক পুত্র সন্তানের মায়া ত্যাগ করে দেশ প্রেমিক মোবাশ্বের আলী জীবনের ঝুকি নিয়ে সশ্রস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন। ১৯৭১ সালের ১৫ই এপ্রিল কুমিল্লা গঙ্গাসাগর মিরাসানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে সিপাহী মোবাশ্বের আলী’সহ ১৪জন মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাতবরণ করেন। মিরাসানী বধ্যভূমিতে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভে শহীদ মোবাশ্বের আলী’সহ ১৪জন শহীদের নাম লিখা রয়েছে।

এদিকে, দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে মুক্তিযোদ্ধারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্ত সিপাহী মোবাশ্বের আলী বাড়িতে ফিরে না আসায় এবং তার কোন সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা ব্যাকুল হয়ে পড়েন। এর কিছুদিন পর পরিবারের সদস্যরা একই গ্রামের কৃতিসন্তান মুক্তিযোদ্ধে বীরবিক্রম খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অবঃ) আব্দুল মালিকের মাধ্যমে জানতে পারেন মুক্তিযোদ্ধে শহীদ হয়েছেন সিপাহী মোবাশ্বের আলী।

১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধের প্রায় ৫মাস পর চিকিৎসার অভাবে তাদের ২বছর বয়সী একমাত্র পুত্র মারা যায়। এরপর একমাত্র কন্যা সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন সুনু বিবি। তিনি দীর্ঘদিন মানষিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ছিলেন। মেয়ের বয়স ১৭ পূর্ণ হওয়ার পর তাকে পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগীতায় নিজ গ্রামেরই যুবক সিরাজুল ইসলামের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। অভাবের তাড়নায় একপর্যায়ে নিজের ভিটে মাটি বিক্রি করে মেয়ের শশুর বাড়িতে আশ্রয় নেন সুনু বিবি। সেখানেই তিনি বসবাস করে আসছেন।

আলাপকালে সুনু বিবি সাংবাদিকদের জানান, স্বামীর রেখে যাওয়া স্মৃতিকে বুকে নিয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন। অশ্রুসিক্ত চোঁখে তিনি বলেন ‘আমার স্বামী দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন। এতে আমি গর্বিত। ২০১৫ সালে বার্ডর গার্ড বাংলাদেশ সদর দপ্তরের রেকর্ড অফিসার-২ এস এম শামীম রেজা স্বাক্ষরিত শহীদ সিপাহী মোবাশ্বের আলীর মুক্তিযোদ্ধা প্রত্যয়নপত্র বুকে জড়িয়ে ধরে সুনু বিবি বলেন, স্বাধীনতার ৪৬বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আমি আমার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটটি পাইনি। পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতা পেলেও শহীদ ভাতা এবং রেশন আমি পাচ্ছি না। তাছাড়া আমার মাথা গুজার ঠাই না থাকায় আমি মেয়ে জামাইর বাড়িতে থাকতে হচ্ছে।

এদিকে, শহীদ সুলেমানের নামে বিশ্বনাথের একটি গ্রামের নামকরণ করা হলেও এখনো শহীদ সিপাহী মোবাশ্বের আলী’সহ অপর ৪ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে কিছুই হয়নি। তবে সম্প্রতি উপজেলার রামপুর গ্রামে শহীদ সিপাহী মোবাশ্বের আলীর বাড়ির সামনে তাঁর স্মৃতিতে একটি নামফলক স্থাপন করা হয়েছে। আর এই নামফলকটি শহীদ সিপাহী মোবাশ্বের আলীর জামাতা সিরাজুল ইসলাম ও চাচাতো ভাই সিরাজুল ইসলামের উদ্যোগে করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার জন্য প্রবাস থেকেও অনেক প্রবাসী বিশ্বনাথীরা ছুটে আসেন। অন্যদিকে প্রবাসে অবস্থানকারী বিশ্বনাথীরা মুক্তিযুদ্ধের ফান্ড সংগ্রহ করতে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়তে গূরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙ্গালীদের অসীম আত্ত্যাগের ফলে আমাদের দেশ সোনার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কারনে আমরা আত্তর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার জন্য একটি নিজস্ব পরিচয় পাই। ৭১ সালের ২৬শে মার্চ কালো রাত্রিতে বর্বর পাকহানাদার বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালী জাতির উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করে এদেশের হাজার হাজার মানুষকে।

বাংলাদেশের আবাল বৃদ্ধ-বনিতার মত বিশ্বনাথের বীর সন্তানরা সশ্রস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দেশের অন্যান্য স্থানের মত বিশ্বনাথের প্রায় দেড় শতাধিক তরুণ যুবক জীবনের মায়া ত্যাগ করে কেউবা নবপরিনীতা স্ত্রী, বাবা, মা ও নবজাতক শিশু সন্তান কে ঘরে রেখে দেশ মাতৃকার টানে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধে অংশ নেন। এতে ব্যারাক থেকে আসা সৈনিক যেমন রয়েছেন। ঠিক তেমনি আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কৃষিক, ছাত্র, যুবক সহ একাধিক প্রবাসীও রয়েছেন। এর মধ্যে ৫জন সরাসরি যুদ্ধে শহীদ হন। এছাড়া আর একাধিক সাধারন মানুষ যেমন শক্রর হাতে জীবন দিয়েছেন ঠিক তেমনি এর পাশাপাশি এ অঞ্চলের মা বোনেরাও সাহসীকতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বিভিন্ন ভাবে সহযোগীতা করেন। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র এই সংগ্রামে শশুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যুদ্ধের ময়দানে বিশ্বনাথের শহীদ সিপাহী মোবাশ্বের আলী’সহ ৬ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। অন্য ৫ মুক্তিযোদ্ধার হলেন- শহীদ সুলেমান হোসেন, শহীদ ল্যান্সনায়ক নরমুজ আলী, শহীদ আব্দুল আহাদ, শহীদ শামছুল হক, এবং শহীদ দীগেন্দ্র কুমার দাশ।

মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। দেশের অনেক এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান। নির্মান করা হয়েছে তাদের নামে বিভিন্ন স্থাপনা। এর পাশাপাশি অনেক স্থানে তাদের নাম সম্বলিত স্মৃতিস্তম্ভও নির্মান করা হয়েছে। কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্বনাথের এই বীর সন্তানদের নামে কোন স্মৃতিস্তম্ব নির্মান করা হয়নি। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও বিবেকবান মানুষের মনের মধ্যে ক্ষোভের অন্ত নেই। বিশ্বনাথবাসীর এই প্রাণের দাবি বিগত ২০০৬ সাথে তৎকালীন সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে তৎকালীন বিশ্বনাথ প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষরিত এক আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা সমন্নয় কমিটির সভায় কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ করে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্ত এখনও বিশ্বনাথ প্রেসক্লাবের সেই দাবি আলোর মুখ দেখেনি। এমতাবস্থায় বিশ্বনাথের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য অবদানের কথা বিবেচনা করে তাদের সকলের নাম সম্মলিত কোন স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা নামফলক নির্মানের জন্য বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার, স্থানীয় সংসদ সদস্য’সহ সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিশ্বনাথবাসী দাবি জানিয়েছেন।

Related posts