September 21, 2018

মিসরে ৬ দশকের আধুনিক ফেরাউনরা

89
নীল নদ, মমি আর ফারও বা ফেরাউনদের জন্য বিখ্যাত মিশর। প্রাচীন যুগে দেশটি শাসন করেছে ফারাও রাজবংশের বিভিন্ন বংশধরেরা। যুগ বদলেছে কিন্তু সেখানকার সাধারণ মানুষদের অবস্থা কি বদলেছে খুব একটা। এখনো তারা আধুনিক ফেরাউন বা স্বৈরশাসকদের দ্বারাই শাসিত হচ্ছেন। এ নিয়েই বিবিসি’র বিশ্লেষণ ‘Six decades of Egyptian history in six movies’।

মিশরে জনতার প্রতিবাদের মুখে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান  আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসি। বরাবরের মত এবারও শাঁখের করাত জনতার দোহাই দিয়ে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। যদিও এতে জনতার কোনো লাভ হয়নি। ফলে আধুনিক ‘আরব বসন্ত’ তাদের অবস্থারও কোনো পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে পট পরিবর্তন হয়েছে দেশটিতে। এইসব পট পরিবর্তন নিয়েই বিবিসি’র ডকুমেন্টারি ‘Modern Pharaohs’। এখানে তুলে ধরা হয়েছে দেশটিতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের নানা ঘটনা।

তিন পর্বের ওই তথ্যচিত্রে দেশটিতে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত  বিপ্লব ও নিপীড়নের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। ওইসব বিপ্লবের ফলে বিভিন্ন সময়ে দেশটির রাজনৈতিক মঞ্চে কিছু নতুন নতুন  রাজনৈতিক অভিনেতার উদ্ভব হয়েছে  যা পরিবর্তিত সময়ে ঐতিহ্যগত ভূমিকা রেখেছে। এটি তৈরি করেছেন নির্মাতা জিহান এল তাহরি। তিনি মিশরের বিভিন্ন জনপ্রিয় ছবি থেকে ক্লিপ নিয়ে এটি তৈরি করেছেন। নিচে ওই ছয়টি আলোচিত ছবি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব।
90
দ্য সিন
১৯৬৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবির পরিচালক হেনরি বারাকাত। মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ছবিটি। ১৯৫২ সালে দেশটিতে যে সামরিক অভ্যূত্থান হয়েছিল তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী তরুণ সেনা কর্মকর্তা নাসের। অনেক স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন এই নেতা। তাকে ঘিরে আপ্লুত হয়েছিল মিশরের তরুণ সমাজ। অশিক্ষা ও দারিদ্রতা দূর করে মিশরকে একটি আধুনিক ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রে উন্নত করাই ছিল তার লক্ষ্য। এজন্য প্রচুর সংস্কারও করেছিলেন তিনি।

নাসেরের সংস্কার নিয়েই গড়ে ওঠেছে ‘সিন’ বা পাপ ছবির গল্প। একজন ধনী ভূস্বামী এক দরিদ্র চাষী বৌকে ধর্ষণ করেন। এই প্রতীকি গল্পের মাধ্যমে পরিচালক জিহান এল তাহরি দেশটিতে দরিদ্র গোষ্ঠীর ওপর ধনীক শ্রেণির নানা শোষণের চিত্র তুলে ধরেছেন।

সামাজিক-বাস্তববাদী ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি ‘সিন’  মিশরের অনেক ক্লাসিক  চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম যেখানে দেরিদ্র শ্রেণির উদ্বেগের বিষয় প্রাণবন্তভাবে চিত্রিত হয়েছে।
91
গামাল আবদেল নাসের

আনোয়ার কাওয়াদরি পরিচালিত ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ১৯৯৯ সালে। এটিও মিশরের ইতিহাসে নাসেরের নাটকীয় আবির্ভাব নিয়ে তৈরি। ১৯৫২ সালে মিসরে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর জেনারেল মোহাম্মদ নাগিব ক্ষমতায় আসেন। সেই থেকে শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সেনাবাহিনীকে। হয় সরাসরি না হয় বেসামরিক প্রশাসনকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতার কলকাঠি নেড়েছে সেনাবাহিনী। এর মাত্র দুই বছরের মাথায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন গামাল আবদেল নাসের।
মিশরের জনপ্রিয় শাসক মোহাম্মদ নাগিবেরই একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন নাসের। একসময় দুই জনের মধ্যে শুরু হয় ক্ষমতার দ্বন্ধ্ব। মিশরকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য ছিল নাগিবের। কিন্তু নাসের মনে করতেন,অনুন্নত ও রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশটি এখনো গণতন্থ্রের জন্য প্রস্তুত হয়নি। আসলে নাগিবের জনপ্রিয়তা নিয়ে ভীত ছিলেন নাসের। এ সম্পর্কে পরিচালক এল তাহরি বলেছেন,‘মিশরে ওই সময় মধ্যবিত্তের সংখ্যা ছিল কম। বাকি আমজনতা তো লেখাপড়াই জানত না।

তাই নাসেরের যুক্তি ছিল কেবলমাত্র সেনাবাহিনী দেশে পরিবর্তন আনতে পারে।’ দুজনের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হলেন নাসের।  তিনি নাগিবকে জোরপূর্বক ক্ষমতাত্যাগে বাধ্য করেন। বিপ্লবের দু বছর পর ক্ষমতাচ্যূত হলেন নাগিব। মিশরে সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলের যে সংস্কৃতি তা শুরু হয়েছিল নাসেরের হাত ধরেই। ক্ষমতায় আসার পর নাসের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠোন জাতীয়করণ করেন। তিনি সংস্কারের নামে গোটা দেশটিকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। গত ষাট বছরেরও বেশি সময় আগে নাসের ও নাগিব যা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন তারই প্রতিধ্বনি দেখা যাচ্ছে ত্রই আজকের দিনে বিরোধী ও সরকার সমর্থকদের মধ্যে।

দ্য বুলেট ইজ স্টিল মাই পকেট

এটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৪ সালে। পরিচালক ছিলেন আলদিন মোস্তফা। ১৯৭৩ সালে ইসরায়েল-মিশরের যুদ্ধকে (রমজান বা ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ) কেন্দ্রে করে গড়ে ওঠেছে এই ছবির বিষয়বস্তু। মিশরীয় বাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে পৌঁছে গিয়েছিল সিনাই উপদ্বীপে। ১৯৬৭ সালে অনুষ্ঠিত ছয়দিনের যুদ্ধে ওই অঞ্চলটি দখল করে নিয়েছিল ইসরায়েল।  এ কাজে নাসেরকে সহায়তা করেছির সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক উপদেষ্টোরা। কিন্তু ১৯৭০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর নাসের মারা যাওয়ার পর ধূলিস্মাৎ হয়ে যায় মিশরীয়দের স্বপ্ন। তার উত্তরসূরী প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত মনে করলেন, মিশরীয়দের পক্ষে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ঘুরে যায় যুদ্ধের মোড়। ফলে ১৯৭৩ সালে সিনাই উপত্যকাটি ফের দখলে নেয়। এভাবেই পদদলিত হয় মিশরীয়দের জাতীয় অহঙ্কার। এর কয়েক বছর পর ইসরায়েলের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন সাদাত। এই চুক্তির কারণে তিনি ইসলামপন্থিদের চক্ষুশূলে পরিণত হন।

ফ্যাট ক্যাট
১৯৭৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল হাসান ইউসেফ পরিচালিত ফ্যাট ক্যাট। এটি সাদাতের অর্থনৈতিক নীতির  সুবিধাভোগী শ্রেণির কুণ্ঠাহীন দুর্নীতির একটি প্রতিকৃতি। এতে দেখানো হয়েছে কীভাবে লোভী ব্যবসায়ীরা জনতার অর্থ লুণ্ঠন করে। সাদাত এর উদারীকরণ নীতির “খোলা দরজা” দিয়েই এই নব্য ব্যবসায়ী শ্রেণিটির জন্ম।

প্রেসিডেন্ট নাসেরের প্রবর্তিত সমাজবাদী অর্থনৈতিক সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল আনোয়ার সাদাতের এই উদারবাদ নীতি, যেখানে কেবল ব্যক্তিগত সেক্টরকে জোরদার করা হয়েছিল। এল তাহরি জানান, ফ্যাট ক্যাট ছবিতে সে সময়ের দুর্নীতির গোটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করিা হয়েছে।’ সাদাত এর নীতি মুসলিম ব্রাদারহুডের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেননা নাসেরের সমাজতান্ত্রিক  ব্যবস্থায় ইসলামপন্থিদের কিছু  স্কুল ও ক্লিনিক পরিচালিত হচ্ছির রাষ্ট্রীয় অর্থে।

লস্ট

সাদাতের মুক্তবাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্মিত এই ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৬ সালে। ছবিটির পরিচালক হচ্ছেন আতেফ সালেম। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের টিকে থাকার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছিল ছবির কাহিনী। এক শিক্ষিত দম্পতি তাদের চাহিদামত কাজ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। পরে পরিবারের জন্য বিদেশ পাড়ি জমান স্ত্রীটি। তবে ছবিটি যখন মুক্তি পায় মিশরে তখন শুরু হয়েছে হুসনি মুবারকের শাসন। এ সময় বিদেশে অভিবাসনকে ততটা উৎসাহিত করা হত না।

দা টেররিস্ট

নাদের গালাল নির্মিত ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ১৯৯৩ সালে। নব্বই দশকে একটি পর্যটকদের বাসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে ছবির কাহিনী। মিশরে গত এক দশক ধরে চলছে এ ধরনের হামলা। সিসি ক্ষমতায় আসার পর তো সেনা ও পুলিশ নিয়মিতই হামলার শিকার হচ্ছে।

সূত্রঃ বিবিসি
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts