September 19, 2018

মিসরে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় বাংলাদেশে

 মিশরে অপহরণ করে বাংলাদেশ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, অপহরণের পর টাকা না দিলে অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ওই চক্রের দলনেতার নাম রিপন বলে জানা গেছে। বাড়ি ঝিনাইদহে। রাব্বুল এবং আলী নামে তার দুই সহযোগীও রয়েছে।

সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে নিউজ পোর্টাল ‘প্রবাস কথা’য়। ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে ফারুক নামে শিকলে বাঁধা এক ব্যক্তির ছবিও দেয়া হয়। সম্প্রতি ফারুককে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে অপহরণ করা হয়। পরে শারীরিক নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। মিশর থেকে পাঠানো ফারুককে নির্যাতনের ছবির পাশাপাশি ব্যাংকের একটি পেমেন্ট স্লিপও পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ওমর আলী নামের একজনের একাউন্টে গত ৪ ফেব্রুয়ারি ৫০ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। একাউন্ট নম্বর ১০০১২২১৫৭। আর টাকা পাঠিয়েছেন আরিফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তবে অস্পষ্টতার কারণে সোনালী ব্যাংকের কোন্ শাখা থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি। এই টাকা পরিশোধের পরই ফারুককে ছেড়ে দেয়া হয় বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এভাবে মিশরে অনেক বাংলাদেশিকে অপহরণ করে নিয়ে তাদের দিয়ে পরিবারের কাছে ফোন দেয়া হয়। তারপর মুক্তিপণের টাকা বাংলাদেশেই আদায় করা হয়। টাকা পাওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত হলেই কেবল মুক্তি মেলে অপহূতের। না হলে, নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এভাবে কয়েক দফায় একেক জনের কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।

কায়রোর বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃপক্ষ এ প্রসঙ্গে জানিয়েছে, এটা একটা সংঘবদ্ধ চক্র। তারা সব সময় খোঁজ-খবর রাখে যে কে ভালো উপার্জন করছে। তারপর মিশরীয়দের সহযোগিতায় তাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে। খোঁজ নিয়ে সেখানকার অপহরণকারী চক্রের আরও কিছু সদস্যের নাম জানা গেছে। তাদের মধ্যে একজনের নাম শফিক, আরেকজনের নাম আতিক। আতিকের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। দূতাবাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আইনগত ব্যবস্থা নেয়ায় শফিক এখন জেলে আছে, আর আতিক পলাতক। অনুসন্ধানে সাইফুল নামে আরো একজনের নাম বেরিয়ে এসেছে। তার বাড়ি যশোর।

বাংলাদেশ দূতাবাস আরো বলছে, গত আগস্ট মাসে দুলাল চন্দ্র মন্ডল নামে একজন অপহূত হয়েছিল। এ ব্যাপারে দূতাবাসের কাছে অভিযোগ আসায় তারা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অপহরণকারীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, এই অপহরণকারীরা দীর্ঘদিন ধরে মিশরে থাকে। কিন্তু তারা কোনো কাজ করে না। তাদের একমাত্র কাজ বাংলাদেশিদের উপর নজর রাখা এবং সময় মতো অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা। দূতাবাস জানায়, অপহরণকারীদের অনেকেই মিশরীয় মেয়ে বিয়ে করে স্থানীয় একটা প্রভাব বলয় তৈরি করেছে। সেই প্রভাবেই তারা মিশরীয়দের সহযোগিতা নিয়ে এই অপহরণ বাণিজ্য চালায়।

জানা গেছে, ২০১৩-১৪ সালের দিকে মিশরে প্রতি মাসেই ৩-৪টি অপহরণের ঘটনা ঘটতো। দূতাবাসে কেবল লিখিত অভিযোগ আসলেই তারা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে মিশরের প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ঘটনার শিকার যারা হচ্ছে তাদের সেখানে বসবাসের বৈধতার বিষয়টি।

অপহূত বা কোনো অপরাধের শিকার ব্যক্তির সেখানে বসবাসের যদি আইনগত বৈধতা না থাকে সেক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া কঠিন। তখন অপহূত ব্যক্তির কাছের কাউকে দিয়ে (যার মিশরে বসবাসের বৈধতা আছে) মামলা করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হয়। তবে ফারুক নামের যে লোকটিকে অপহরণ করে শিকল দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে তার ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পেয়েছিল মিশরের কায়রোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, চাকরি প্রত্যাশিদের বিদেশে নিয়ে ঐ চক্র আটকে শারীরিক নির্যাতন চালায়। এই দৃশ্যের ছবি পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এই ছবি দেখে আত্মীয়-স্বজন তাদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করেন। চক্রটি এভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। র্যাবের কাছে এসব প্রমাণ আসার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার ও তাদের নিকট থেকে আদায়কৃত টাকা উদ্ধার করা হয় বলে তিনি জানান।

Related posts