November 13, 2018

মার্কিণ গোয়েন্দা প্রধানের তথ্যে বহুজাতিক সন্ত্রাস ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

335
আবু জাফর মাহমুদ

বাংলাদেশে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ বন্ধ করার জন্যে ভারতকে উপদেশ দিয়েছে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র।গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে এই তথ্য।এরই মধ্যে ট্রান্স-ন্যাশানেল টেরোরিজম বা বহুজাতিক সন্ত্রাসের ব্যাপক উত্থানের বিষয়ে মার্কিণ সিনেট প্রতিরক্ষা কমিটিতে রিপোর্ট পেশ করে সি আই এ প্রধান।সেই রিপোর্টে বাংলাদেশে বহুজাতিক সন্ত্রাসের সম্ভাব্য সুনামীর আভাস দেয়া হয়েছে।মার্কিণ স্বার্থ এবং স্থাপনা নিরাপদ রাখার জন্যে বাংলাদেশে সেদেশের মনোযোগ স্থির করার প্রসঙ্গ বিবেচনায় নিতে চলেছেন মার্কিন নীতিনির্ধারকরা।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দক্ষিণ এশীয় ২য় প্রধান মিত্র।এই মিত্রের সীমাহীন প্রভাবাধীন বাংলাদেশ সরকারের আচরণের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে বহুজাতিক উপদ্রব বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে মার্কিণ গোয়েন্দা রিপোর্টে খবর।মার্কিণ সিনেটে ডিফেন্স এন্ড ইন্টেলিজেন্স কমিটিতে সকল গোয়েন্দা প্রধানদের উপস্থিতিতে শোনানো হয় এই রিপোর্ট।

বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে,ভারতকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট জানিয়ে দেবার অল্প সময়ের মধ্যেই মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর সেনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটি এবং সেনেট সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্স এর খবর বের হয়েছে সংবাদ মাধ্যমে।১০ফেব্রুয়ারী বুধবার আমেরিকার সকল স্পাই এজেন্সীগুলোর প্রধানদের উপস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান জেমস আর ক্লেপ্পার বলেছেন,বহুজাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপ বাংলাদেশেও সক্রিয় হতে পারে।যা ট্রান্স-ন্যাশানেল টেরোরিজম ছড়াতে পারে।

তার মন্তব্য থেকে ধরে নেয়া যায়,এতে ভারতের কেন্দ্রীয় কংগ্রেস এবং ভিজেপি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে থাকা প্রদেশগুলোয় সন্ত্রাস এবং সশস্ত্র স্বাধীনতার লড়াইয়ের এতোদিনের আগুণ ধাউ ধাউ করে উত্তাপ ছড়া্তে পারে।যদিও বাংলাদেশ সরকার এই ব্যাপারে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিতে অঙ্গিকারাবদ্ধ।
তিনি অবশ্য বাংলাদেশে সন্ত্রাস সম্পর্কিত বিষয়ে উক্তদেশের সরকারী কর্মকর্তাদের বক্তব্যকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন।সরকারের যে বক্তব্যে বাংলাদেশে আই এস বা ইসলামিক ষ্টেটের উপস্থিতি অস্বীকার করা হয়েছে।বিদেশী, সেক্যুলার ব্লগার এবং লেখক সম্পাদক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হত্যায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলগুলোর উপর দায় চাপিয়ে দেয় হয়েছে।সরকারের মতে,বাংলাদেশের সন্ত্রাসগুলো করছে এই দুই দল।তারা ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্যে উম্মাতাল হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সরকারের ক্ষুদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে সেনেটের সংবাদ বের হবার পরদিনই।বিবিসির প্রশ্নের জবাবে সরকারের রাজনৈতিক মুখপাত্র গালি দেয়ার ভাষায় মার্কিণ গোয়েন্দা প্রধানের রিপোর্টের জবাব দিয়েছেন।সরকার এতে রেগে কথা বলেছেন বুঝা গেছে।ক্ষেপে কথা বলার ভেতরের কারণ সাধারণ জনগণের বোধগম্য না হলেও সরকারের নীতিনির্ধারকরা তা বুঝেন ভালো করে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পারস্পরিক সহযোগীতার ধারায় না গিয়ে চ্যালেঞ্জের ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একধরণের বিরক্তি ও ক্ষোভের হাত নাড়লেন মনে হচ্ছে।এই ধরণের আচরণের মনস্তাত্বিক যুক্তি হচ্ছে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ভয়ে চিৎকার করা। অপরাধ স্বীকার করার কাছাকাছি যাওয়া।

সরকার ইতিমধ্যে এসব সন্ত্রাসের দায় চাপিয়ে দিয়ে বিএনপি জামাতকে আরো কষিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে চলেছে।বাংলাদেশী রাজনৈতিক সরকারেরও দোষ কি?নিজের অবস্থানের পক্ষে কে নেই?সবাই নিজের পক্ষে যুক্তি দেয়,কথা বলে।সরকার নিজের পক্ষে সাফাই দিতে গিয়েই মার্কিণ গোয়েন্দা প্রধানের বক্তব্যে আপত্তি করেছে।আমি এরকমই মনে করি।আমার যুক্তির সাথে সরকারের জবাব একই রকম নাও হতে পারে।তলে তলে মতে মিলেও যেতে পারে।যদিও তাতে কিছুই যায় আসেনা।এসবের কিছুতেই মার্কিণ তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করা গেলোনা।মূলতঃ প্রয়োজন হলো,মার্কিণ গোয়েন্দা তথ্য সত্য কি সত্য নয়,তা প্রমাণ করা।
বাংলাদেশ সরকারকে মনে রাখা উচিত যে,আমেরিকা নেপাল,ভূটান বা মালদ্বীপ কি? তাতো নয়।আমেরিকা বর্তমান বিশ্বের প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি।এই বিশ্বশক্তি সারা দুনিয়াজুড়ে নিজের স্বার্থ রক্ষায় লড়ছে।দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে নিজের সাথে নিয়েও পাকিস্তানকে হাতছাড়া করেনি।রাশিয়ার সাথে জটিল সমীকরণ সামাল দিয়ে বাংলাদেশ (সাবেক পূর্ব পাকিস্তান)কে ভারত,পাকিস্তান ও চীনের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে দেখার পথ নিচ্ছে।ডঃ হেনরী কিসিঞ্জার এবং রাশিয়ার প্রেসিডেণ্ট ব্লাদিমির পুটিনের সাথে মিটিং হয়েছে।এই মিটিং হওয়ায় আগেই ধরে নিয়েছিলাম দক্ষিণ এশিয়ায় বড় কিছু ঘটতে  চলেছে।মার্কিণ এই ঝানু কুটনীতিক দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বড় পন্ডিত। বরাবর শীতল থাকেন তিনি।সম্ভবতঃ পুটিনকে তিনি ম্যানেজ করে নিয়েছেন।

মার্কিণ স্পাই প্রধান বাংলাদেশকে সতর্ক হবার সুযোগ করে দিয়েছেন,বলা যায়।তিনি  বলেছে্ন,বাংলাদেশে সরকার বিরোধীদল দলনের যে পথ নিয়েছে,তাতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীরা নিজেদের কার্যক্রমের জন্যে বাংলাদেশকে নিরাপদ ভাবছে।ভারত-বার্মার কথা উল্লেখ না করেই তিনি বলেছেন অঞ্চল জুড়ে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।সশস্ত্র আক্রমনের প্রতিরোধ হয় সশস্ত্র পথে।যেহেতু এপথে জামাত-বিএনপি যাচ্ছেনা,অন্যেরা কেউ এই সুযোগকে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যবহার তো করতেই পারে।ওরা আসবার সময় বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিতে আবেদন করার কথা কেউই ভাবছে নাকি?এটা হতে পারে আই এস অথবা অন্য কেউ।

যাহোক, এই আভাস আসার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার কি করতে পারে অথবা কি করা উচিত নয় তা গভীরভাবে ভাবা দরকার।প্রকৃত অবস্থার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পর্যবেক্ষণ ইউনিটগুলোর আরো মনোযোগী হওয়া জরুরী,তর্ক-বিতর্ক করে আমেরিকাকে রাগানোর চেয়ে।সরকারকে দিয়ে আমেরিকার গোয়েন্দা প্রধানকে আক্রমণাত্নক ভাষায় বলানোর অর্থ গলার স্বর উঁচু করে শত্রুতা বাড়ানো।বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে যেভাবে রাজনৈতিক বদনাম-ভীতি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করে   চলেছেন,তাদের আরো বেশী অপেক্ষা করা উচিত বলে অনেকে মনে করেন।

কেননা রাশিয়া এই সময় আমেরিকার সাথে বাংলাদেশ নিয়ে বিবাদে যাবার কথা নয়।  ভারতের দুই পাশে চীন-পাকিস্তানের আকস্মিক বিরাটাকারে উত্থানের বর্তমান প্রেক্ষিতে রাশিয়া নিজের মধ্যে এমন ঝামেলা নাও নিতে পারে।কেননা আমেরিকার দক্ষিণ  এশিয়া বিষয়ক পলিশি রাশিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয়।আমেরিকা বলছে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসীদের ক্ষপ্পরে না পরতে চাইলে সব রাজনৈতিক মতামত এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সরকারকে সহনশীল হতে হবে।নিজেদের হার্ডলাইন পলিসি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।আমেরিকার নীতির বিরোধীতা না করে রাশিয়া তার সাথে একসাথে খাপ খাইয়ে চলার নীতি গ্রহন করছে শোনে আবাক হবার কিছু নেই।

মার্কিণ গোয়েন্দা প্রধান বলেছেন,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি জামাতকে যেভাবে অপদস্থ করছেন তার পরিণতি সম্ভবতঃ দক্ষিণ এশিয়ায় বহুজাতিক সন্ত্রাসীগ্রুপের অবস্থানের দুয়ার খুলে দিবে।দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই স্পাই প্রধান সম্ভাবনার যে আভাস দিয়েছেন তাতে সরকারের সতর্কতা বাড়ানোর যুক্তি আছে,অথচ সরকার এতে ক্ষেপে গেছেন এবং বকাঝকা শুরু করে দিয়েছেন।সরকার এতে কষ্ট পেয়েছেন বুঝা গেছে।

কেননা সরকারের নীতিনির্ধারকরা ভেবে নিয়েছেন, মার্কিণ গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া এই তথ্য আজগুবি এবং এটা বিএনপি জামাতকে সমর্থন দেয়ার উদ্দেশ্যে নথিভূক্ত করা হয়েছে।অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও জামাতের পক্ষ নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনা সরকারকে আর রাষ্ট্র পরিচালনায় দেখতে চায়না।সরকারের মুখপাত্র বিবিসিকে দেয়া মতামতে কি এটাই বুঝাতে চেয়েছেন? তাহলে তো ভয়াবহ অবস্থা আসন্ন বাংলাদেশ এবং তার চারপাশে!

তবে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র এমন কোন ইঙ্গিত এখনো দেন নি যে,তারা সরকার পরবর্তন দেখতে আগ্রহী।তারা বলছেন বাংলাদেশে ভিন্নমতামতের প্রতি সম্মান দেয়া হউক এবং জনগণের গণতান্ত্রিক মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় রাজনীতি পরিচালনা করা হউক,যাতে বহুজাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ঘাঁটি গাঁড়তে না পারে।

প্রসংগটা হচ্ছে,সন্ত্রাস নিয়ে।বাংলাদেশ সরকারের লাভ হচ্ছে দায় তার প্রতিপক্ষ জামাত-বিএনপির ঘাঁড়ে চাপাতে পারলে।ভারতের লাভ সন্ত্রাসের দায় বাংলাদেশী মুসলমান গোষ্ঠীর উপর চড়াতে পারলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা।এই স্থিতিশীলতা না পেলে যুক্তরাষ্ট্র তার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছতে বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে।অবশ্য শিতিশীলতা বাংলাদেশের জন্যেও জরুরী।বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারত ভারতের স্বার্থ রক্ষায়ও জরুরী।

যাহোক,মার্কিণ গোয়েন্দা প্রধান দাবী করছেন,বাংলাদেশের সরকারের আচরণে বিরোধী দলীয় জোট বিএনপি-জামাতের যে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা,গণতন্ত্রহীনতা।তার সুযোগ নিতে পারে বহুজাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী,যা ইতিমধ্যে বিদেশী হত্যা,ব্লগার হত্যা এবং লেখক- সম্পাদক হত্যার মাধ্যমে আভাস দিয়েছে এবং কেহ কেহ তার দায় স্বীকার করেছে।

(আবু জাফর মাহমুদঃবাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ,কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

Related posts