September 23, 2018

‘মনোবৈজ্ঞানিক কাউন্সেলিং’ সেবা দেবে সরকার

মানসুরা হোসাইন: জনগণের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘জাতীয় মনোসামাজিক কাউন্সেলিং নীতিমালা (২০১৬)’ নামে একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সমাজে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জনসাধারণের মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক সুস্থতা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে তৈরি এই খসড়া নিয়ে এ পর্যন্ত একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা খসড়ার বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করে দেখছেন। জনসাধারণের মতামত জানতে খসড়াটি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। এ সেবা সমন্বয় করবে ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার।

খসড়ায় মনোসামাজিক কাউন্সেলিং বলতে মানসিক ও সামাজিক উপাদানের সমন্বয়ে একটি সেবামূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় মনোবৈজ্ঞানিক নীতি প্রয়োগ করে ব্যক্তির মানসিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে সহায়তা করা হবে। ব্যক্তির ইতিবাচক মনোভাব গঠনের জন্যও এই সেবার প্রয়োজন বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়।

খসড়ায় বলা হয়েছে, শিশুর মানসিক বিকাশ, সন্তান লালন-পালনে মা-বাবার দক্ষতা বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মনোসামাজিক কাউন্সেলিং। এ ছাড়া ক্রোধ ও চাপ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক যোগাযোগে দক্ষতা বাড়ানো, অপরাধ ও নেতিবাচক আচরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠী এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার পরে ব্যক্তির মানসিক আঘাত কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন। খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, মূল্যবোধের অবক্ষয়, সন্তানকে যথাযথভাবে প্রতিপালনে ঘাটতি, অপ্রাপ্তি, মানসিক ও যৌন হয়রানি, সহিংসতা, পরকীয়া, দাম্পত্য কলহ এবং ক্যানসার, বিভিন্ন রোগসহ নানা কারণে জনগণের মধ্যে মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

কোথায় কোথায় থাকবে সেবার ব্যবস্থা: কাউন্সেলিং সেবা দেবেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী, পরামর্শক মনোবিজ্ঞানী এবং এ বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। প্রতিটি কমিউনিটিতে বিবাহপূর্ব কাউন্সেলিং দেবেন বিবাহ নিবন্ধনকারীরা। তাঁদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে একজন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিকেও দাম্পত্যবিষয়ক কাউন্সেলিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিবাহবিচ্ছেদের আগে-পরেও কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা থাকবে। পরিবারের কোনো সদস্যের দুরারোগ্য অসুখ বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সমস্যা থাকলে তার পরিচর্যাকারীকেও কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হবে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতাদের শোক প্রশমনবিষয়ক কাউন্সেলিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকাল ও তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক, নারীর সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে ও পরে, সন্তান প্রতিপালন, গৃহপরিচারিকার সঙ্গে আচরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময় পরপর অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। সব বিদ্যালয়, বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দক্ষ মনোসামাজিক কাউন্সেলর নিয়োগ করা হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুজন শিক্ষককেও দেওয়া হবে এ ধরনের প্রশিক্ষণ।

মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দেশে হানাহানি, মারামারি ও অস্থিরতা চলছে। কিন্তু জনগণকে কাউন্সেলিং দেওয়ার মতো জনবলের অভাব আছে। তাই এ বিষয়ে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরাই প্রাথমিক পর্যায়ের সেবা দিতে পারবেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, পরিবার ও ব্যক্তিজীবনে নানা উত্থান-পতনে আবেগজনিত পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ভাবা হয়। অথচ এ ধরনের পরিস্থিতিতে মনোসামাজিক কাউন্সেলিং জরুরি। এতে করে উন্নত মানসিক স্বাস্থ্য গঠন হয়, যা ব্যক্তিকে যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে।#প্রথম_আলো

Related posts