September 23, 2018

‘মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’

অধ্যাপক রবীন্দ্র কুমার বক্সী।
রবীন্দ্রনাথের জন্ম বিরাট ধনী এবং সম্ভ্রান্ত জমিদার  পরিবারে। পিতামহ প্রিন্স নামে খ্যাত, পিতামহর্ষী নামে, মায়ের নাম সারদাদেবী, নিজে এশিয়ার মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, স্বল্প কালের জন্য হলেও ইংরেজ সরকারের দেওয়া বেসামরিক সর্বোচ্চ খেতাব নাইট উপাধি ধারী। লোক চক্ষে অভিজাতকুল তিলক। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয়টা যে তাঁর নিজের হাতে গড়া সে কথা কম লোকই অনুধাবন করতে পেরেছেন। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সুরম্য অট্রালিকায় বসে জানালার ফাক দিয়ে কলকাতার বস্তিবাসীর সংগ্রামী জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁদের সুখ-দুঃখ, ব্যথা- বেদনা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। তাই পরবর্তী জীবনে তিনি জোড়াসাঁকোর প্রাসাদ ছেড়ে গ্রাম বাংলার পথে-প্রান্তরে, খাল-বিল- নদী পথে অবিরাম ঘুরেছেন এবং শান্তি নিকেতনে মাটি ও খড়ের ঘরে বাস করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে বাংলাদেশের মানুষের আছে হৃদয়ের গভীর সম্পর্ক। জমীদারী দেখা-শোনা করার জন্য তিনি দীর্ঘ সময় কুষ্ঠিয়ার শিলাইদহ, সাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসরে কৃষকদের সাথে তাঁদেরই একজন হয়ে থেকেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন প্রজাহিতৈষী জমিদার। তাঁর সাথে প্রজাদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ ছিল। খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে রাজ কর্মচারীরদের গরীব প্রজাদের ওপর জোর-জবরদস্তিকে তিনি বিন্দুমাত্র প্রশয় দেন নি। ফসল হানির কারনে বাংলা ১৩১২ সালে এক বছরে তিনি কৃষকদের উদার ভাবে আটান্ন হাজার টাকা খাজনা মাফ করেন। গ্রামের মানুষের সাথে হাতে-হাত মিলিয়ে গ্রামের রাস্তাঘাট সংস্কার করেছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছেন। বিভিন্ন গ্রামে যে স্কুল স্থাপন করেন তার জন্য জমিদারের কোষাগার থেকে বছরে সাড়ে বারোশ টাকা বরাদ্ধ করেন। কৃষকদের দাদন ব্যবসায়ীদের হাত  থেকে রক্ষা করার জন্য পতিসরে ‘কৃষি সমবায়ব্যাংক’ স্থাপন করেন। তিনি নোবেল পুরস্কারের অর্থের বড় একটা অংশ ব্যাংকে দান করেন। কলকাতা থেকে কলের লাঙল এনে কৃষকদের কে আধুনিক চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করেন। কৃষির উন্নতির জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং তাঁর বন্ধু পুত্র সন্তোষ মজুমদার ও জামাতা গগন গাঙ্গুলীকে কৃষির ওপরে পড়াশোনর জন্য আমেরিকায় পাঠান। বাংলদেশে আজকের কৃষি ব্যাংক রবীন্দ্রানথেরই চিন্তার ফসল।

আপাদমস্তক রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। একবার পহেলা বৈশাখে শিলাইদহের ‘কুঠি বাড়িতে’ পুণ্যাহ্ অনুষ্ঠান চলছিল। রবীন্দ্রনাথ নিজের ঘর থেখে বেরিয়ে এসে দেখেন, অনুষ্ঠানে দু’রকমের চাঁদোয়া টানানো হয়েছে। একট চাঁদোয়া উন্নত মানের অপরটি নিন্মমানের। রবীন্দ্রনাথ রাজকর্মচারীকে পার্থক্যের কারন জিজ্ঞাসা করলেন। কর্মচারী বললেন, ‘হিন্দু প্রজারা বসবেন ভালোচাঁদোয়ার নিচে, আর মুসলিম প্রজারা বসবেন অপেক্ষাকৃত নিন্ম মানের চাঁদোয়ার নিচে। রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘জমিদার রবীন্দ্রনাথের কাছে হিন্দু আর মুসলিম প্রজা বলতে কোনো ভিন্নতা নেই। সবাইকে এক চাঁদোয়ার নিচে নিয়ে এসো। রবীন্দ্রনাথ  সবসময় হিন্দু-মুসলমানের মিলন চেয়েছেন। তিনি সর্বদাই হিন্দু -মুসলিম সু সম্পর্ক কামনা করেছেন। প্রজারা জমিদার রবীন্দ্রনাথকে কতটা শ্রদ্ধাকরতেন তার প্রমান মেলে সর্বশেষ কবি যখন পতিসর আসেন এবং বিদায় নেন তখনকার দৃশ্যে। একজন বৃদ্ধ মুসলমান প্রজা অশ্রুসজল কন্ঠে রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, ‘হুজুর আমারা হিন্দুদের মতো জন্ম জন্মান্তর বাদ মানি না- মানলে খোদার কাছে এই প্রার্থনাই জানাতাম, বারবার যেন হুজুরের রাজ্যেই প্রজা হয়ে জন্ম নেই’। সর্বশেষ যখন রবীন্দ্রনাথ পতিসর থেকে কলকাতায় চলেযান, এসব দরিদ্র প্রজারা রবীন্দ্রাথকে আত্রাই স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ  ছিলেন একজন প্রজা বৎসল জমিদার। ১৯১৬ খৃস্টাব্দের ডিস্টিক্ট গেজেটিয়ারে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর রিপোর্ট বর্ণনা করেন, ‘জমিদার মাত্রই যে হৃদয়হীন হন না তার উজ্জল দৃষ্টান্ত বিশিষ্ট কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।

সুশিক্ষা এবং অর্থনৈতিক  মুক্তিতেই মানুষের মনুষ্যত্বের প্রকাশ পাবে এমন বিশ্বাস তিনি লালন করতেন। রবীন্দ্রনাথ বারবার আত্মার পরিশুদ্ধতার বিকাশ লাভের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি বিণয় ও মানবতার শিক্ষায় নিজেদের গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিয়েছেন । তিনি কোনো বিশেষ দল বা মতের অনুসারী ছিলেন না। কিন্তু জাতির প্রয়োজনে  যথার্থ ভূমিকা পালন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবিচ্ছেদের বিরোধিতা করেন। তিনি ছিলেন স্বাদেশী আন্দোলনের প্রথম কাতারের লোক। এই সময়ই তিনি রচনা করেন,.আমার সোনার বাংলার আমি তোমায় ভালবাসি’। বাংলার মাটি বাংলার জল/বাংলার বায়ু বাংলার ফল/পুণ্য হোক…….. আমার সোনার বাংলা গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলী কাব্য গ্রন্থ লিখে সাহিত্যে নোভেল পুরস্কার লাভ করেন। নোভেল পাওয়ার দু’বছর পর ১৯১৫ সালে রাজা প ম জর্জ নিজের জন্ম দিনে রবীন্দ্রনাথকে নাইটহুড উপাধিতে ভূষিতে করেন।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- হানাহানি এবং বিদেশের রাজনীতির ঘটনা সমূহ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, মানুষের সর্বপ্রকার অপমান, দঃখ ও বেদনা রবীন্দ্রনাথের স্পর্শ চেতন চিত্তকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়।

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ এপ্রিল বিকাল ৫ টায় কয়েক হাজার হিন্দু, মুসলিমও শিখ জালিয়ানওয়ালাবাগে ভারতের স্বাধীনতার দাবিতে উপস্থিত হয়ে বক্তৃতা শুনছিলেন। এই জনসভায় বিনা উস্কানিতে বৃটিশ জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে প্রায় দশ মিনিট ধরে গুলি চালায় বৃটিশ সৈন্যরা। মোট ১৬৫০ রাউন্ড গুলি বর্ষিত হয়। এতে নিহত হয় নিরস্ত্র নিরীহ কয়েকশ স্বাধীনতা কামী মানুষ। তিনি  এ নৃশংস হত্যাকন্ডের প্রতিবাদে ইংরেজ  সরকার কর্তৃক দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন।

রবীন্দ্রনাথের  প্রতিভা ছিল আকাশ চুম্বী। কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস, চিত্রশিল্প থেকে শুরু করে বাংলাসাহিত্যের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের হাতের স্পর্শ পড়েনি। শিশু বয়সে ‘জল পড়ে পাতানড়ে’ কবিতা লেখার মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথের  কাব্য সাধনার সূচনা ঘটে। সমবয়সী প্রিয় বড়বৌদি কাদম্বিনী রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, ‘রবি, তুমি বড়জোর বাংলা সাহিত্যের ভোরের পাখি বিহারী লালের মতো হতে পারবে, এর বেশি নয়’। রবীন্দ্রনাথ যে বাংলা সাহিত্যের কতো উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, তা কেবল রবীন্দ্রনাথই বলতে পারবেন। তিনি শুধু নিজেকেই  নিজে অতিক্রম করে গেছেন। অন্য কেউ তাঁর ধারে কাছেও আসতে পারেন নি।   কেবল মৃত্যুই তাঁর লেখনী থামিয়ে দিয়েছিল। যদিও  তিনি পরিনত বয়সে মৃত্যুবরন করেছেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুর মাত্র কিছুক্ষন পূর্বে (১৯৪১ এর ৭ আগস্ট) সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে কবিতা উচ্চারন করেন, ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ন করে, বিচিত্র ছলনা জালে/ হে ছলনাময়ী, মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুন হাতে সরল জীবনে…….।

বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই একমাত্র কবি, যিনি তিনটি দেশের জাতীয় সংগীত রচনা করেছেন। একটি হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি….., দ্বিতীয়টি হলো ভারতের জাতীয় সংগীত, তৃতীয়টি হল শ্রীলংকার জাতীয় সংগীত । কিন্তু যে সংবাদটি আজো বেশির ভাগ লোকের কাছেই আজনা সেটা হলো, শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের প্রথম ও মূল গান খানির কথাও রবীন্দ্রনাথেরই লেখা। শ্রীলঙ্কা থেকে বিশ্ব ভারতীতে রবীন্দ্রনাথের কাছে পড়তে আসা তাঁর ছাত্র আনন্দ সমরকুনের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ শ্রীলঙ্কার জন্যে বাংলায় একটি দেশাত্নবোধক গান রচনা করেছিলেন। পরে ১৯৩৯ -৪০  এর দিকে আনন্দ সেই গান খানি-ই সিংহলী ভাষায় অনুবাদ করেন যা স্বাধীনতার পর শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত হয়। ভাবতে অবাক লাগে, এই তিনটি দেশই স্বাধীনতা অর্জন করেছে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর পরে। রবীন্দ্রনাথের সাথে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের নিবিড় সর্ম্পক। তিনি যেমনি ভালবেসেছিলেন বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল, মাটি ও মানুষকে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের মানুষ ও তাঁকে অন্তর দিয়ে ভালবেসেছিলেন। কালের পরিক্রমায় তিনি অনন্ত লোকে চলে গেছেন। কিন্তু তিনি তাঁর অমর সৃষ্টির মাঝে বেঁচে আছেন। বাঙালি জাতির অস্তিত্বের সাথে তিনি অবিচ্ছেদ্য ভাবে মিশে আছেন ।

পৃথিবীর কোনো অপশক্তি রবীন্দ্রনাথকে বাঙালির হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। তাদের চেষ্টা বার বার পরাজিত হবে। ১৯৬১ সালে আইয়ুব খানের তথ্যমন্ত্রী বাঙালির কূসন্তান মুসলিম লীগের অখ্যাত নেতা শাহাবুদ্দিন নির্দেশ জারি করলেন, ‘পাকিন্তানে রবীন্দ্রনাথের গান- আবৃত্তি প্রভৃতি নিষিদ্ধ’ বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষ ঘৃনাভরে নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করলেন। ঐ বছরই সকল ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে বাঙালি জাতি ঘটা করে রবীন্দ্র জন্ম শত বার্ষিকী পালন করে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের আত্মার-আত্মীয়। দুর্দিনের বন্ধু, পথচলার সাথী, মুক্তি যুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথের গান রনাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে।

রবীন্দ্রনাথ আজীবন মানবতার কথা বলেছেন। তিনি তাঁর রচনায় সাধারন মানুষের জীবন চিত্র নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আধ্যাতিকতা তাঁর রচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তিনি মানুষের চিত্তের বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মানবতার মুক্তির দীক্ষা দিয়েছেন। তাই তো তিনি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বিশ্বকবির। যিনি ছিলেন মানবতার কবি।

অধ্যাপক রবীন্দ্র কুমার বক্সী
সভাপতি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

Related posts