November 15, 2018

মাতৃভাষা আল্লাহর সেরা দান

hমহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ সূরা ইব্রাহিম : ৪

ভাষা মহান আল্লাহর অপার দান। প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের নিজ নিজ ভাষা যেমন মূল্যবান, তেমনি আমাদের কাছে আমাদের মাতৃভাষা (মায়ের ভাষায় কথা বলা বা ভাব প্রকাশ করার নাম হলো মাতৃভাষা) বাংলা মূল্যবান। কবি ফররুখ আহমদ বলেছেন-
‘ও আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা
খোদার সেরা দান
বিশ্বভাষার সবই তোমার
রূপ যে অণির্বান’
মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা মানুষের অস্তিত্বের তিনটি প্রধান অবলম্বন। মানুষের জীবন হচ্ছে তার মাতৃভাষা, দেশের ভাষা, জাতির ভাষা। মানুষের যতগুলো জন্মগত অধিকার আছে, সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে মাতৃভাষার অধিকার। নিজের মতো করে কথা বলার অধিকার। স্বতঃস্ফূর্ত চেতনায় স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার। এ অধিকার মহান আল্লাহই মানুষকে দিয়েছেন।
মনের ভাব প্রকাশে সুন্দর এ পৃথিবীতে রয়েছে হাজারো ভাষার ব্যবহার। প্রত্যেক জাতি বা গোষ্ঠী নিজ নিজ ভাষায় ভাব প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মূলত এর মাঝেই রয়েছে মহান আল্লাহর মহান হিকমত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। অবশ্যই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।’ (সূরা রুম : ২২)। এ আয়াতে দেখা যায়, মানুষের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতা আল্লাহর সুনিপুণ সৃষ্টিকৌশলের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ। ভাষা ও বর্ণের এই বিভিন্নতা সুপরিকল্পিত, যার পশ্চাতে পরিকল্পনাকারীর অস্তিত্ব বিদ্যমান। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সেই পরিকল্পনাকারীরই সৃষ্টি। ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতার সূত্র ধরেই বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে চলছে। মানবতার সূচনালগ্নে একটি মাত্র ভাষার প্রচলন থাকলেও মানবসভ্যতার বিকাশ এবং বিভিন্ন স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে বিভিন্ন ভাষার উদ্ভব হতে থাকে।
মাতৃভাষার গুরুত্ব শুধু ভৌগলিক বা ঐতিহাসিক কারণ অবধি সীমিত নয়; ধর্মীয়ভাবেও মাতৃভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মহান আল্লাহ পথভোলা মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য যুগে যুগে যে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককেই প্রেরণ করেছেন প্রত্যেক ভাষাভাষীর নিকট তাদের নিজ নিজ ভাষায়। কেননা মাতৃভাষাই স্বজাতির হৃদয় স্পর্শ করতে পারে, এর চেয়ে উত্তম ভাষা আর হয় না। সেহেতু তারা আল্লাহর দেয়া নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনে মাতৃভাষাকেই বাহন হিসেবে নিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ (সূরা ইব্রাহিম : ৪)। বস্তুত প্রত্যেক নবী-রাসূলই ছিলেন তাদের নিজ নিজ ভাষায় পারদর্শী। তাই দেখা যায়, হজরত মুসা আ:-এর সম্প্রদায়ের ভাষা ইবরানি ছিল বিধায় তাওরাত নাজিল হয়েছিল সেই ভাষায়, হজরত দাউদ আ:-এর ভাষা ইউনানি ছিল বিধায় জাবুর নাজিল হয়েছিল ইউনানি ভাষায়, হজরত ঈসা আ:-এর গোত্রের ভাষা সুরিয়ানি ছিল বিধায় ইনজিল কিতাব নাজিল হয়েছিল সুরিয়ানি ভাষায়, মহানবী সা:-এর ভাষা আরবি ছিল বলে কুরআন নাজিল হয়েছিল আরবি ভাষায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি (আল্লাহ) প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ (সূরা ইব্রাহিম : ৫)। তাই দেখা যায়, মহানবী সা:ও স্বজাতির নিকট দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতে মাতৃভাষাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং এর মাধ্যমেই জগৎ আলোকিত করেছেন। মহানবী সা:-এর মাতৃভাষায় কুরআন অবতীর্ণ করে মহান আল্লাহ মূলত মাতৃভাষার গুরুত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছেন। মহানবী সা:-কে সম্বোধন করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে ওরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা দুখান : ৫৮)।
বর্তমানে পৃথিবীতে ঠিক কতগুলো ভাষা রয়েছে তা অনুমান করা খুব কঠিন। তবে ধারণা করা হয়, এর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার থেকে আট হাজার হবে। ইথনোলোগ (ঊঃযহড়ষড়মঁব) নামের ভাষা বিশ্বকোষের ২০০৯ প্রকাশিত ১৬তম সংস্করণের হিসাব মতে, জীবিত ভাষার সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার ৯০৯। উকিপিডিয়ার তথ্য মতে, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত সাত হাজার ৩৩০টি ভাষার সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এতগুলো ভাষার মধ্যে প্রত্যেক জাতির কাছেই নিজ মাতৃভাষা অতুলনীয়। মূলত পৃথিবীর সব ভাষাই মহান আল্লাহর দান। মানুষকে তিনি বাকশক্তি দান করেছেন। তাই ভাষার সাহায্যে মানুষ তার ভাব, কল্পনা, ইচ্ছা, স্বাধ, কথা বলা ও লেখা প্রকাশ করতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘করুণাময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাষা’ (সূরা আর রহমান : ১-৪)। মাতৃভাষার গুরুত্ব সব জাতির কাছেই অত্যধিক। মাতৃভাষার প্রতি আবেগই অন্যরকম। মাতৃভাষায় যেভাবে মানুষ মনের কথা তুলে ধরতে পারে, অন্য ভাষায় তা পারে না। মাতৃভাষার মাধ্যমে আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, আশা-হতাশার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা সম্ভব। তাই পৃথিবীর প্রত্যেক জাত-বর্ণের লোক মায়ের মতোই ভালোবাসে তার মাতৃভাষাকে।
মাতৃভাষাকে শুদ্ধভাবে জানা এবং চর্চা করা প্রতিটি দায়িত্বসচেতন নাগরিকের কর্তব্য। মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী মুবাল্লিগ বা দ্বীন প্রচারক আলেমদের জন্য শুদ্ধভাবে মাতৃভাষায় দ্বীন প্রচারের গুরুত্ব অপরিসীম। মহানবী সা:-কে নিজ মাতৃভাষা আরবি শুদ্ধরূপে আয়ত্ত করার জন্য তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী বেদুইন পরিবারের ধাত্রী বিবি হালিমা রা:-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তিনি সারা জীবনে মাতৃভাষায় একটি অশুদ্ধ ভাষাও উচ্চারণ করেননি; বরং অন্যদের মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমে জ্ঞানের পথ উন্মুক্ত করেছেন। আবার কখনো কখনো তিনি যুদ্ধবন্দীদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সন্তান-সন্ততির জন্য নিছক ভাষার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ভাষা শিক্ষা প্রদানের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্তও করে দিয়েছেন (তাবাকাতে ইবন সাদ)। সুন্দর ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন ও উত্তম বাচনভঙ্গিতে কথা বলতে অপারগতার কারণেই হজরত মুসা আ: দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার সময় সুন্দর ভাষা ও হৃদয়গ্রাহী কথাবার্তায় পারঙ্গম স্বীয় ভাই হারুন আ:-কে নিজের সঙ্গী করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। কুরআনের ভাষায়, ‘আমার ভাই হারুন আমার অপেক্ষা অধিক প্রাঞ্জলভাষী, অতএব তাকে আমার সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন, যাতে সে আমাকে (দাওয়াতের ক্ষেত্রে তার প্রাঞ্জল ভাষা দ্বারা) সত্যায়িত করে। কেননা আমি আশঙ্কা করছি (আমার বক্তব্য সত্য হওয়া সত্ত্বেও) তারা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করবে।’ (সূরা কাসাস : ৩৪)। এভাবেই প্রত্যেক নবী-রাসূল দ্বীনের দাওয়াত দিতে যেয়ে মাতৃভাষাকে প্রধান্য দিয়েছিলেন।
তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত, মহান আল্লাহর অন্যান্য নেয়ামতের সাথে সাথে ভাষার নেয়ামতেরও যথার্থ মূল্যায়ন করা। ভাষার নেয়ামতের মূল্যায়ন করার অর্থ হচ্ছে অশুদ্ধ শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ না করা, মিথ্যা বাক্য ব্যবহার না করা, শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা, সৎ কাজে উৎসাহ দেয়া এবং অসৎ কাজ হতে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়া, সর্বোপরি ভাষার অপপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা।

Related posts