September 22, 2018

মাকে দেখার জন্য আকুল জাইবা !

প্রতিদিন শায়ক নদীর তীরে বসে থাকে জাইবা। তার বাড়ি ধূসর পাহাড় ঘেরা থোকমুস গ্রামে। যেখানে দূর থেকেই চোখে পড়ে দীর্ঘ সবুজ ঘন গাছের সারি। প্রকৃত যেন উড়ার করে নিজেকে ঢেলে দিয়েছে এই ক্ষুদ্র গ্রামটিকে। কিন্তু জাইবার মনে সুখ নেই। সে নদীতীরে বসে অঝোরে কাঁদে। ‘আহা, কি ভাগ্যবান এ নদী, যে নেমে এসেছে ঠিক আমার বাবারবাড়ির পাশ দিয়ে। রোজ আমার মায়ের সঙ্গে ওর দেখা হয়। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য আমার, তাকে দেখার সাধ্য নেই আমার!’ তার দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুধারা। সে কেঁদেই চলে,‘ওহ মা, আমি তোমার থেকে কত দূরে চলে এসেছি। আর কোনোদিন তোমায় দেখতে পাব না।’

জাবিয়া তার পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন ১৬ বছর বয়সে, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে। সে সময়েই লাদাখ অঞ্চলের ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা চিওয়াং রিনচেনের নেতৃত্বে লাদাখ উপত্যকা ধরে অগ্রসর হতে শুরু করে এবং পাকিস্তান সীমান্তের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় অনুপ্রবেশ করে। তিনি ক্ষুদ্র একদল সেনা নিয়ে নিয়ন্ত্রণ রেখা (হিমাল অঞ্চলে ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তকে বিভক্তকারী রেখা) অতিক্রম করেন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী তার্তুক, তিয়াকশি, ডোয়ে তাং ও চালুনকা নামের গ্রামগুলো দখল করে নেন। সে দিনের কথা মনে হলে এখনো বেদনায় ভারাক্রান্ত হয় তার তোবড়ানো মুখটি।

ভারতীয় সেনারা ওই চারটি গ্রাম কেন দখল করে নিয়েছিল এর কোনো সরকারি ব্যাখ্যা দেয়নি ভারত বা পাকিস্তান কোনো সরকারই। এরপর ভারতীয় সেনারা আর আগের জায়গায় ফিরে যায়নি। ফিরিয়েও দেয়নি পাকিস্তানের দখলকৃত ওই ভূখণ্ড।

নিয়ন্ত্রণ রেখার নিকটবর্তী আর একটি গ্রাম ফ্রানো। তখন ওই গ্রামের লোকজন একদিন সিদ্ধান্ত নিল তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, পাকিস্তান চলে যাবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একদিন সফর শুরু করল প্রায় ৫শ পরিবারের একটি কাফেলা যে দলে ছিলেন নববিবাহিতা জাইবাও। এ সম্পর্কে স্মৃতিকাতর এই বৃদ্ধা বলেন, ‘আমরা রুক্ষ পাহাড়ি পথে বেয়ে সারা রাত সারা দিন ধরে হাঁটছিলাম। আমাদের গন্তব্য ছিল খাপলু শহর।’ বেপরোয়া কাফেলাটি গিলগিত-বালতিস্তান পাড়ি দিয়ে পাকিস্তান প্রবেশে বদ্ধ পরিকর ছিল। তবে চালুনকা থেকে তিয়াকশি আসার পথে সময় পায়ে আঘাত পান তার বাবা। এরপর তার মা ও ভাইরা বাবাকে নিয়ে ফের নিজেদের গ্রামে ফিরে যান। তবে জাইবা ও তার স্বামী সফর অব্যাহত রাখেন।

তারা সারাদিন হেঁটে অবশেষে পাহাড়ি অঞ্চলের খাপলু শহরে পৌঁছাল। পাকিস্তানের অধিকারে থাকা এই শহরটি এখন ভারতীয়দের দখলে। এটি এখন পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের কয়েকজন তখন খাপলু ছেড়ে থোকমুস গ্রামে আশ্রয় নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের দলে ছিলেন জাইবা ও তার স্বামীও। থোকমুস গ্রামটি ছিল পাকিস্তানের অন্তর্গত।

এখানে আশ্রয় নেয়ার পর আর বাবামায়ের সঙ্গে দেখা হয়নি তার। এরপর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ৪৪ বছর। দীর্ঘদিন বাড়ির জন্য মন কাঁদত তার। প্রিয়জনেরা বেঁচে আছে না মরে গেছেন এ নিয়েও কত না দুশ্চিন্তা। ১৯৭৩ সালে বাড়ি থেকে একখানা একটি চিঠি পাওয়ার পর কিছুটা শান্তি মেলে। চিঠি পড়ে জানতে পারেন তার বাবা-মা ও ভাইয়েরা এখনো বেঁচে আছেন। এখন এটিই তার মাত্র সান্তনা।

থোকমুসে এসে নতুন করে জীবন শুরু করেন জাইবা। চাকলুনকা এলাক ছেড়ে আসার পরই স্বামী তাকে তালাক দেন। এরপর থোকমুসের বাসিন্দা সিকান্দর আলীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। সন্তানরা সবাই বড় হয়ে গেছে- বিয়েশাদিও দিয়েছেন তাদের। জাবিয়ার কোল জুড়ে এখন দাপিয়ে বেড়ায় নাতি নাতনিরা। ৬০ পেরোনো এই বৃদ্ধাকে দেখলে আপাদদৃষ্টিতে সুখি বলেই মনে হয়। তিনি নিজেও স্বাভাবিকভাবেই সংসারের সব দায়িত্ব পালন করে চলছেন। কেবল চালুনকার কথা মনে হলেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না। বাড়ির কথা যে বড় মনে পড়ে তার! তখন পুরনো ক্যাসেটটি ফের চালিয়ে দেন। ভেজা চোখ মুছতে মুছতে মায়ের কথা শুনতে থাকেন। নব্বই দশকের কোনো এক সময়ে এটি তার হাতে এসে পৌঁছেছিল। এরপর কতবার যে এটি শোনা হয়েছে গেছে তার ইয়াত্তা নেই। কাঠের আলমারি থেকে তিনি ফটো অ্যালবামটি বের করে দেখতে থাকেন। ‘এই হল আমার পরিবার।’ একটি গ্রুপ ছবির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন।

গত ৪৪ বছরে ফেলে আসা আপনজনদের স্মৃতি বলতে কয়েকখানা চিঠি ও ছবি আর এই ক্যাসেটখানাই তার সম্বল। . থোকমুস থেকে চালুনকা গ্রামের দূরত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার। কিন্তু অদৃশ্য এক রেখার কারণে অতটুকুন দূরত্ব পেরুতে পারছেন না জাইবা। দেখতে পারছেন না প্রিয় মানুষগুলোকে।

সড়কপথে অবশ্য তিনি যেতে পারেন ছোটবেলার গ্রামে। এজন্য তাকে বাসে করে প্রথমে লাহোর আসতে হবে। এরপর সীমান্ত পেরিয়ে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে যেতে হবে। ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার সময় জম্মু –কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত হয় গিলগিট-বাল্টিস্তান। তখন থেকেই এটি একটি বিতর্কিত এলাকা। এখানকার পাকিস্তানি পাসপোর্টধারী বাসিন্দারা ভারত সফর করতে পারেন না। একইভাবে নিয়ন্ত্রণ রেখার ওইপাড়ের পারভারতীয় পাসপোর্টধারীদের পক্ষেও গিলগিত-বালতিস্তান অতিক্রম করে পাকিস্তান প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

এ কারণেই ২০০৮ সালে তার বড় ভাই আব্বাস আলি লাহোরের নিকটবর্তী ওয়াগন সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে ঢোকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ফলে আদরের বোনের কাছে পৌঁছুতে পারেননি। কিন্তু ২০১৩ সালে ছোট ভাই শের মোহাম্মদ বহু কাঠখড় পুড়িয়ে ভিসা জোগার করে পাকিস্তানে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। ভাইকে পেয়ে জাইবার কি খুশি! তাকে স্বাগত জানাতে ছুটে গিয়েছিলেন থোকমুসের সীমান্তের চেকপয়েন্টে।

শের মোহাম্মদ বোনের জন্য বয়ে এনেছিলেন ক’খানা ছবি আর মায়ের কথাবার্তা রেকর্ড করা ক্যাসেটখানি। থোকুমাস আর চালুনকার মধ্যে কোনো ইন্টারনেট সুবিধাও গড়ে ওঠেনি। তবে জাইবার ভাইপো ইলিয়াস হোসেন থাকেন গিলগিট-বাল্টিস্তানের স্কারদু শহরে। তার মাধ্যমেই বাপের বাড়ির স্বজনদের খবরাখবর পান তিনি। ওই শহরের সঙ্গে থোকুমাসের ইন্টারনেট সংযোগ থাকায় তারা হোয়টসআপের মাধ্যরেম নিয়মিত যোগাযোগ করেন। কদিন আগেই তো তিনি হুসেইন ও তার অন্য ভাতিজা- ভাতিঝিদের সঙ্গে স্কাইপেতে কথা বলেছেন। সম্প্রতি স্কারদু ঘুরে এসছেন জাইবা।

তবে দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে। জীবনে একবার হলেও নিজ পরিবারকে স্বচোখে দেখতে চান জাইবা। ইতিমধ্যে চালুনকা সফরের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। এ কাজে তাকে সহায়তা করেছেন ভাতিজা হুসেইন। সেই তার সমস্ত কাহজপত্র ঠিকঠাক করে দিয়েছেন। দুই সরকারের অনুমতি পেলে যাত্রা শুরু করবেন জাইবা। যদিও তার এ সফর বেশ ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য।

জাইবার বাবা আর বেঁচে নেই-মারা গেছেন ২০০৯ সালে। এখন ৯৬ বছরের পক্ষাঘাতগ্রস্ত মাকে শেষবারের মত দেখতে চান জাইবা। তবে ভারত ও পাকিস্তান সরকারের অনুমতি পাওয়া পর্যন্ত তার অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধা মা বেঁচে থাকবেন কিনা তা নিয়ে ভয়ে আছেন জাইবা। তারপরও ঘোলাটে চোখে মায়ের মুখটি দেখার তৃষ্ণা কমে না। যেই তৃষ্ণা নিয়ে রোজ সকালে শায়ক নদীতে ছুটে যান তিনি। নদীর নোনাজলে হাত রেখে বলেন, ‘ওগো মা, কবে পাব তোমার দেখা?’

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts