September 23, 2018

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা একজন মহাকবির গল্প

মধুসূদন দত্ত

দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে; তিষ্ঠ ক্ষণকাল। এ সমাধিস্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত্ত
দত্ত-কুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসুদন।
যশোরে সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমী, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী।
প্রাথমিক পরিচিতি:
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ঊনবিংশ মতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও নাট্যকার তথা বংলার সাহিত্যে নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা। তিন ঊনবিংশ শতাব্দীতে (২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪) অবিভক্ত বাংলার যশোহর জেলার কপোতক্ষ নদের তীরে অবস্থিত সাগরদাড়ি গ্রামে এক বিখ্যাত বিত্তশালী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম রাজনারায়ন দত্ত ও মায়ের নাম জাহ্নবী দেবী। মধুসূদন ছিলেন তাদের একমাত্র সন্তান। মধুসূদনের বাবা রাজনারায়ন দত্ত ছিলেন কোলকাতার সদর দেওয়ানী আদালতের একজন খ্যতনামা উকিল। মধুসূদন সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ বংশে জন্মগ্রহণ করলেও যৌবনে তিনি খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রতি তার ছিল দূর্নিবার আকর্ষণ। যার ফলে সাহিত্যিক জীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্য রচনায় আগ্রোহী হয়ে ওঠেন এবং ইংরেজীতে সাহত্য রচনা শুরু করেন। পরবর্তিতে তিনি জীবনের ঘটনাচক্রে আবার বাংলায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার প্রবর্তক। তিনি বাংলায় প্রথম মহাকাব্য রচয়িতা। তিনি বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনা করেছেন ও বাংলায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক।
শৈশব এবং শিক্ষা: মধুসূদনের শিক্ষা আরম্ভ হয় তার মা জাহ্নবী দেবীর তত্ত্বাবধানে। সাগরদাড়ির পাশের গ্রাম শেখপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। বিদ্বান ইমামের কাছে তিনি বাংলা, ফারসী ও আরবি পড়েছেন। সাগরদাঁড়িতেই মধুসূদনের বাল্যকাল অতিবাহিত হয়। পরে সাত বছর বয়সে তিনি কলকাতা যান এবং খিদিরপুর স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে দু’বছর পড়ার পর ১৮৩৭ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের সময়েই মধুসূদন কাব্যচর্চা শুরু করেন। তখন তাঁর কবিতা জ্ঞানান্বেষণ, Bengal Spectator, Literary Gleamer, Calcutta Library Gazette, Literary Blossom, Comet প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। ১৮৩৪ সালে তিনি কলেজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ইংরেজি ‘নাট্য-বিষয়ক প্রস্তাব’ আবৃত্তি করে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি কাড়েন।
১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী কবি মধুসূদন খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। এই সময় তিনি হিন্দু কলেজ পরিত্যাগ করে শিবপুরস্থ বিশপস কলেজে ভর্তি হন এবং চার বছর সেখানে অধ্যয়ন করেন। এখানে অধ্যয়নকালে তিনি গ্রীক, ল্যাটিন, ফরাসী, হিব্রু প্রভৃতি ভাষা আয়ত্ব করেন।
মধুসূদনের কর্ম-জীবন ও ঘটনাপ্রবাহ:
বিশপস কলেজে ভর্তি হবার পর থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন বিলেত যাবার। তাঁর ধারণা ছিল বিলেতে যেতে পারলেই বড় কবি হওয়া যাবে। কিন্তু তার বাবা তার বিয়ে ঠিক করেন। তাই তিনি ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তখন থেকেই তাঁর নামের পূর্বে ‘মাইকেল’ শব্দটি যুক্ত হয়। তাঁর এই ধর্মান্তর সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রাজনারায়ণ দত্ত তাঁর বিধর্মী পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। এ সময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তাঁর আত্মীয়স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফলে মধুসূদন ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। প্রথমে মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে (১৮৪৮-১৮৫২) এবং পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা (১৮৫২-১৮৫৬) করেন। কিন্তু শিক্ষকতা করে প্রাপ্ত অর্থে নিজের খরচ সংকুলান করতে পারতেন না। এসময়ে মাদ্রাজে তিনি সাংবদিকতা শুরু করেন এবং পরিচিত লাভ করেন। এখানে তিনি Hindu Chronicle, Madraz Circulator and General Chronicle এবং Eastern Guardian পত্রিকার সম্পাদকের দায়ীত্ব পালন করেন। কিন্তু তাতেও তার নিদারুন অর্থ কষ্টে দিন অতিবাহিত হতে থাকে। মাদ্রাজে অবস্থানকালে পঁচিশ বছর বয়সে নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যেই তিনি ‘Timothy Penpoem’ ছদ্মনামে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ (The Captive Ladie) এবং পরে দ্বিতীয় গ্রন্থ Visions of the Past রচনা করেন।
মাদ্রাজে আসার কিছুকাল পরেই মধুসূদন রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ মেয়েকে বিয়ে করেন। কিন্তু তাদের দাম্পত্যজীবন সাত বছর স্থায়ী হয়েছিল। রেবেকার গর্ভে মধুসূদনের দুই পুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়। রেবেকার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের অল্পকাল পরে মধুসূদন এমিলিয়া আঁরিয়েতা সোফিয়া নামে এক ফরাসি তরুণীকে বিয়ে করেন। আঁরিয়েতা মধুসূদনের সারাজীবনের সঙ্গিনী ছিলেন। এদিকে মাইকেল তাঁর এক কপি দ্য ক্যাপটিভ লেডি বন্ধু গৌরদাস বসাককে উপহার পাঠালে, গৌরদাস সেটিকে জে ই ডি বেথুনের কাছে উপহার হিসেবে পাঠান। উক্ত গ্রন্থ পাঠ করে অভিভূত বেথুন মাইকেলকে চিঠি লিখে দেশে ফিরে আসতে এবং বাংলায় কাব্য রচনা করতে পরামর্শ দেন। এর ভিতর কবির মা-বাবা দুজনেই মারা যান। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে ১৮৫৬ সালে মধুসূদন কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৮৫৮ সালে রামনারায়ন তর্করত্নের রত্নাবলী নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করার সময় তিনি বাংলয় নাটক লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এমন একটি পরিস্থিতিতে তিনি মহাভারতের দেবযানী-যযাতি কাহিনী অবলম্বনে ১৮৫৯ সালে পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন শর্মিষ্ঠা নাটক। মুলত এটিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক নাটক এবং তিনিই প্রথম নাট্যকার।

কলকাতায় ফিরে এসে তিনি প্রথমে পুলিশ কোর্টের কেরানীর কাজ নেন। পরে দোভাষী হিসেবে কাজ করেন।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণের জন্য কবি ইংল্যান্ডে আইন বিষয়ে লেখাপড়া করতে যান। কিন্তু বর্ণবাদের কারণে তিনি সেখানে টিকে থাকতে পারেননি। পরে তিনি চলে যান ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে। কবি সেখানেও নিদারুন অর্থকষ্টে ভোগেন। সেখানে পড়ালেখা করার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাকে সাহয্য করেছেন। কিন্তু পড়াশুনা শেষে কোলকাতায় ফিরে এসে কবি কখনই তার সে জ্ঞান কাজে লাগাননি।

সাহিত্য কর্ম:
মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে আধুনিক ভাবধারার প্রবর্তক। তিনি বহু নাটক, কাব্য ও প্রহসন রচনা করেছেন। কবি তার জীবনে ইংরেজ কবি লর্ড বায়রনের সাহিত্য কর্ম দ্বারা অনুপ্রাণীত হয়েছিলেন। বহু বছর পরিশ্রমের ফলে হোমেরিক স্টাইলের প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি তার মহাকাব্য মেঘনদ বধ কাব্য প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এক সময় নিজেকে বলেছিলেন:”আমি এক সকালে উঠে নিজেকে সফল হিসেবে পাইনি, এই কাব্যের সফলতা বহু বছরের কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।”
নাট্যকার হিসেবে মধুসূদন দত্তের সাহিত্য অঙ্গনে পদার্পণ হয়েছে। ১৮৫৯ সালে তিনি রচনা করেন শর্মিষ্ঠা নাটক। ১৮৬০ সালে তিনি রচনা করেন দুটি প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ এবং রচনা করেন একটি পূর্নাঙ্গ নাটক পদ্মাবতী। পদ্মাবতীতে তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন। এরপর তিলোত্তমাসম্ভব, মেঘনাদ বধ কাব্য মহাকাব্য ব্রজঙ্গনা কাব্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক, বীরঙ্গনা কাব্য, চতুর্দশপদী কবিতা বঙ্গভূমি প্রভৃতি লেখেন। ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ প্রহসনে তিনি ইংরেজি শিক্ষিত ইয়ং বেঙ্গলদের মাদকাসক্তি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনাচারকে কটাক্ষ করেন এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’-তে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের আচারসর্বস্ব ও নীতিভ্রষ্ট সমাজপতিদের গোপন লাম্পট্য তুলে ধরেন। এছাড়া্ও কবি অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। তার লেখা চতুর্দশপদী কবিতার হাত ধরেই বংলায় সনেটের যাত্রা শুরু।

বঙ্গভূমি
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;–
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি!
অনিদ্রায়, অনাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;–
কেলিনু শৈবালে, ভুলি কমল-কানন!

স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে, —
“ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যারে ফিরি ঘরে।”
পালিলাম আজ্ঞা সুখে’ পাইলাম কালে
মাতৃভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে‍‍‍‍‍‍‍‍‍‌‌‌।।
উপরোক্ত কবিতাটি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা সনেট। এই কবিতার মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যে সনেটের যাত্রা শুরু হয়।

সাহিত্যের বৈশিষ্ট:
রামায়ণে বর্ণিত অধর্মাচারী, অত্যাচারী ও পাপী রাবণকে একজন দেশপ্রেমিক, বীর যোদ্ধা ও বিশাল শক্তির আধাররূপে চিত্রিত করে মধুসূদন উনিশ শতকের বাঙালির নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদা লাভ করেন। এক্ষেত্রে তিনি ভারতবাসীর চিরাচরিত বিশ্বাসের মূলে আঘাত হেনে প্রকৃত সত্য সন্ধান ও দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বাংলা সাহিত্যে তা তুলনাহীন।

মধুসূদনের কাব্যে এক ধরনের নারীবিদ্রোহের সুর লক্ষ করা যায়। তাঁর কাব্যের নায়িকাদের মধ্য দিয়ে যেন যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত, অবহেলিত, আত্ম সুখ-দুঃখ প্রকাশে অনভ্যস্ত ও ভীত ভারতীয় নারীরা হঠাৎ আত্মসচেতন হয়ে জেগে ওঠে। তারা পুরুষের নিকট নিজেদের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ এবং কামনা-বাসনা প্রকাশে হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। তাঁর বীরাঙ্গনা (১৮৬২) পত্রকাব্যের নায়িকাদের দিকে তাকালে এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে।

মধুসূদনের এ সময়কার অপর দুটি রচনা হলো কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১) ও ব্রজাঙ্গনা (১৮৬১)। প্রথমটি রাজপুত উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত একটি বিয়োগান্তক নাটক এবং দ্বিতীয়টি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য।

ভার্সাইতে অবস্থানকালে তাঁর জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এখানে বসেই তিনি ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুকরণে বাংলায় সনেট লিখতে শুরু করেন। বাংলা ভাষায় এটিও এক বিস্ময়কর নতুন সৃষ্টি।

মধুসূদন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের যুগপ্রবর্তক কবি। তিনি তাঁর কাব্যের বিষয় সংগ্রহ করেছিলেন প্রধানত সংস্কৃত কাব্য থেকে। কিন্তু পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ অনুযায়ী সমকালীন ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির জীবনদর্শন ও রুচির উপযোগী করে তিনি তা কাব্যে রূপায়িত করেন এবং তার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা হয়।

শেষ জীবন:
বাংলার এই মহান কবির শেষজীবন অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্রের মধ্যে কেটেছে। ঋণের দায়, অর্থাভাব, অসুস্থতা, চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদি কারণে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। শেষজীবনে তিনি উত্তরপাড়ার জমিদারদের লাইব্রেরি ঘরে বসবাস করতেন। স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুর তিনদিন পরে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন বাংলার এই মহা কবি কপর্দকহীন অবস্থায় জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

Related posts