September 22, 2018

মমতার দৃষ্টান্ত দিয়ে ঢাকাকে দিল্লির আশ্বাস

ঢাকাকে দিল্লির আশ্বাস

‘দেখুন, এখানে আপনাদের দুশ্চিন্তার কিছুই নেই। তিস্তার ব্যাপারটাই ধরুন না, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি মিলছে না বলে আমরা তিস্তা চুক্তি নিয়ে পর্যন্ত এগোচ্ছি না। তো যেখানে একটা রাজ্য সরকারের ইচ্ছাকেও আমরা মর্যাদা দিচ্ছি, সেখানে আপনারা কীভাবে ভাবছেন বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশকে আমরা অগ্রাহ্য করে যা খুশি তাই করব?’

বক্তার নাম সুশ্রী উমা ভারতী- ভারতের কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রী ও বিজেপির সন্ন্যাসিনী নেত্রী। সোমবার বিকেলে যাকে তিনি এই কথাগুলো বলছিলেন তিনি তার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রকাশ্য সভায় রীতিমতো অনুযোগের সুরে বলেছেন ‘ভারত মুখে এক কথা বললেও কাজের বেলায় সম্পূর্ণ আর এক জিনিস করছে’। তিনি বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ– বিকেলে উমা ভারতীর আশ্বাসের পর যার সুর এক ধাক্কায় অনেকটা নরম হয়ে গেল।

আসলে পররাষ্ট্র বা স্বরাষ্ট্র বাদ দিলে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব সম্ভবত সবচেয়ে বেশি– সেটা এই জল বা পানি সম্পদ। গঙ্গা-তিস্তা-ফেনীসহ দুদেশের মধ্যে দিয়ে যে ৫৪টি অভিন্ন নদী প্রবাহিত হচ্ছে শুধু সে জন্যই নয়, জলের মতো মূল্যবান অথচ অপ্রতুল একটা সম্পদের ব্যবস্থাপনা কীভাবে দুটো দেশ সবচেয়ে ভালভাবে করতে পারে তা অনেকটা নির্ভর করে এই মন্ত্রণালয়ের ওপরেই। আর এই জটিল বিষয় নিয়ে পানি বা জলঘোলার চেষ্টাও কম হয় না।

আর সে কারণেই এ সপ্তাহে যখন দুই দেশের দুই বর্তমান জল বা পানিসম্পদমন্ত্রীর মধ্যে প্রথমবার মুখোমুখি দেখা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হল, তাকে ঘিরে আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। শেখ হাসিনার নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে প্রায় দুবছর। নরেন্দ্র মোদির ক্যাবিনেটের বয়সও দেড় বছর হতে চলল, কিন্তু দুই মন্ত্রীর মধ্যে এটাই ছিল প্রথম বৈঠক।

আসলে ভারতের শীর্ষস্থানীয় বণিকসভা সিআইআই-এর উদ্যোগে জলসম্পদের ব্যবহার নিয়ে এক আলোচনাসভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে, আর সেই একই সভাতে বক্তা হিসেবে আসতে রাজি হয়েছিলেন উমা ভারতীও। দিল্লির সাততারা লীলা হোটেলে সেই আলোচনায় মি. মাহমুদ ও মিস ভারতী অবশ্য আলাদা প্যানেলে বক্তৃতা দেন– কিন্তু বিকেলে অশোকা হোটেলে ভারতীয় মন্ত্রী তার বাংলাদেশি কাউন্টারপার্টকে চা-চক্রে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখতে ভুল করেননি।

তবে সকালের আলোচনাচক্রেই মি. মাহমুদ স্পষ্ট করে দেন, ভারতের কোনও কোনও আচরণ নিয়ে তাদের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভ আছে। তিনি বলেন, ‘ভারত মুখে বলছে ‘শেয়ার্ড ভিশন’ বা অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর কথা– অথচ কাজে আমরা তার কোনও প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না।’ আন্তঃ নদী সংযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান এ ব্যাপারে ভারত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে একতরফাভাবে। আর বাংলাদেশকে সে খবর জানতে হচ্ছে মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে যে আর কোনও অগ্রগতি হচ্ছে না, সেই হতাশাও ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে।

উমা ভারতী আলোচনাচক্রে তার বক্তৃতায় এই সব অভিযোগের কোনও জবাব দেননি। তিনি উত্তরগুলো তুলে রেখেছিলেন বিকেলে মি. মাহমুদের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকের জন্য। অশোকা হোটেলের স্যুইটে বিকেলে চায়ের কাপ নিয়ে দুজনের যখন কথাবার্তা হচ্ছে তখনই মিস ভারতী জানিয়ে দেন, বাংলাদেশের চিন্তিত হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্পে এমন কিছু করা হবে না যাতে বাংলাদেশের এতটুকুও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

আর এই বক্তব্যটা যাতে মাহমুদের কাছে ‘কনভিন্সিং’ শোনায়, সে জন্যই বিজেপিতে ‘দিদি’ বলে পরিচিত উমা ভারতী টেনে আনেন পশ্চিমবঙ্গের ‘দিদি’ মমতা ব্যানার্জির দৃষ্টান্ত। উমা বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের দিকেই তাকান না। একটা রাজ্যের আপত্তি আছে বলে আমরা তিস্তা নিয়ে পর্যন্ত এখনও কিছু করতে পারছি না। আর সেখানে আপনাদের সম্মতি না-নিয়ে আমরা অভিন্ন নদীগুলোর সংযোগ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাব এটা আপনারা ভাবছেন কী করে? আমাদের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সায় না-মিললে তিস্তা নিয়ে যেমন কিছু হবে না, তেমনি প্রতিবেশী বাংলাদেশের সম্মতি ছাড়া নদী-সংযোগও কখনওই সম্ভব নয়!’

এরপর যথারীতি আনিসুল ইসলাম মাহমুদের হেসে ওঠার পালা। উমা ভারতীর সঙ্গে কথা বলে তিনি যে বেশ আশ্বস্ত তা বোঝা গেল যখন চা-চক্র থেকে বেরোনোর সময় তিনি বলে গেলেন, ‘আমাকে উনি কথা দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষতি করে ভারত কিছুই করবে না। আমরা ওনার কথাতে ভরসা রাখছি।’

ওই একই বৈঠকে ঠিক হল– ঢাকায় আগামীতে যে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হবে তাতে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে উমা ভারতী তাতে যোগ দিতে যাবেন। সাড়ে পাঁচ বছর আগে শেষবার হয়েছিল এই বৈঠক। এছাড়া ফরাক্কার উজানে বাংলাদেশ যে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প গড়ে তুলতে চায়– সে ব্যাপারে ভারতের যে সব প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে সেগুলো খতিয়ে দেখতেও দুদেশের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গড়ে তোলা হবে একটি কমিটি।

ফলে সেদিন রাতেই যখন জনাব মাহমুদ দিল্লি থেকে সরাসরি আমেরিকার বিমান ধরে মার্কিন মুলুকে পাড়ি দিচ্ছেন, সকালের আলোচনাচক্রে তার ‘রাগ’ ততক্ষণে গলে একেবারে ‘জল’!
উৎসঃ  বা.ট্রি.
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts