September 24, 2018

মনে হলো আমি আর বাঁচবো না!

ইমাম মো. শাহিনুর রহমান

চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বীভৎসতা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না ইমাম মো. শাহিনুর রহমান। কোমরে গুলি লাগায় বেঁচে গেলেও তার চোখের সামনেই মারা গেছেন মসজিদের মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শাহিনুরকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়েছে। গতকাল আলাপে বর্ণনা দিয়েছেন সেদিনের বীভৎস ঘটনার। গত ২৬শে নভেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের চককানু (মশামারী) গ্রামের শিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে নামাজরত অবস্থায় তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। গুলিবিদ্ধ হন তিনি। এতে মারা যান মোয়াজ্জেম হোসেন। আহত হন মুসল্লি আফতাব আলী ও তাহের মিস্ত্রি। নিজের আহত হওয়ার পাশাপাশি রক্তাক্ত জখমের বীভৎসতা শাহিনুরকে কিছুটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

পুরো ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মো. শাহিনুর রহমান বলেন প্রতিদিনের মতো ২০-২৫ মুসল্লি নিয়ে আমি মাগরিবের নামাজ শুরু করি। যথারীতি আমি ইমামতি করি। রুকুতে যাই। এমন সময় বিকট শব্দ শুনতে পাই। শরীরে আঘাতের ঝাঁকুনিও অনুভব করি। চেষ্টা করে রুকু থেকে আর উঠতে পারছিলাম না। কেন যেন শক্তি হারিয়ে ফেলছি। ঝাপসা হয়ে আসে চোখের দৃষ্টিও। এরপর পেছনে তাকানোর চেষ্টা করি। দেখি মুয়াজ্জিন রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে ছটফট করছেন। আমার শরীরে গুলি লাগার বিষয়টি তখনও বুঝতে পারিনি। তখন হুঁশ ছিল। গুলাগুলির বিষয়টি বুঝতে পারছি। এমন সময় আত্মরক্ষার জন্য মসজিদের মেহরাবে ঢুকে পড়ি। শুয়ে পড়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। এমন সময় হালকা ব্যথা অনুভব করি। অবচেতনভাবে হাতটা পেছনে যায়। দেখি হাত রক্তে ভিজে গেছে। কাপড়ও ভিজে যাচ্ছে। রক্তে সয়লাব হয়ে গেছে মেঝে। তখনই গুলি লেগে গুরুতর জখমের বিষয়টি বুঝতে পারি।

এ সময় মনে হলো আমি বুঝি আর বাঁচব না। এ বুঝি মারা যাচ্ছি। একপর্যায়ে মনে হলো আমি সত্যিই মারা গেছি। এর দেড়-দুই মিনিট মতো আমার আর কিছুই মনে নেই। পরে একপর্যায়ে মনে হলো গুলির শব্দ থেমেছে। আমি কিছুটা সম্বিৎ ফিরে পেলাম। গলা বাড়িয়ে দেখি আগে যেখানে একজনকে মেঝেতে পড়ে ছটফট করতে দেখছিলাম, সেখানে দুজন কাতরাচ্ছেন। আর মুসল্লিরা তাদের উদ্ধার না করে হুড়োহুড়ি করে আত্মরক্ষার জন্য দরজার দিকে ছুটছেন। আর ধর ধর বলে হামলাকারীদের পেছনে ছুটছে। তারা দেওয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এরপর মুসল্লিরা আমাদের উদ্ধার করেন। আমাকে আর মোয়াজ্জিন চাচাকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে দেয়া হয়। পরে তুলে দেয়া হয় অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি শয্যায়।

যাওয়ার সময় দেখি তার মাথার পেছনে গুলি লেগে চোখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। চোখ দিয়ে রক্ত ঝরে তা কপাল দিয়ে বেয়ে মুখে ঢুকে পড়ছে। দাড়ি, বুক বেয়ে নিচে পড়ছিল। মুখে রক্ত প্রবেশ করায় শ্বাস নিতে গিয়ে গড় গড় শব্দ হচ্ছিল। একপর্যায়ে তার শ্বাস নেয়ার শব্দ থেমে গেছে বলে মনে হলো। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক এই বীভৎসতা দেখতে দেখতে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম। একপর্যায়ে গাড়ি বগুড়ার শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে। সেখানেও প্রথমে দুজনকে পাশাপাশি রাখা হয়। তখন চিকিৎসকরা বলেন, দুজনকে একসঙ্গে রাখা যাবে না। এতে দুজনের ক্ষতি হবে। এর পরই চিকিৎসকরা মুয়াজ্জিন চাচা মারা গেছেন বলে জানান। দুজনকে দুই কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।

শঙ্কা কেটে গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছি। বাঁচিয়ে রাখার মালিকও তিনি। কিন্তু এখন হাসপাতালেও নিরাপত্তাহীন বোধ করছি। বাড়িতে বা মসজিদেও এখন থেকে নিজেকে নিরাপত্তাহীন মনে হবে।
গত মঙ্গলবার বগুড়ার শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে শাহিনুরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। এরপর মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালের সার্জারি ইউনিট ৪-এ তার ক্ষতস্থান ড্রেসিং করা হয়। রাতে স্থানান্তর করা হয় হাসপাতালের ৪৯ নম্বর কেবিনে। বগুড়ায় তার অস্ত্রোপচার হলেও শরীর থেকে বুলেট বের করা হয়নি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও তা সরানো হয়নি।

গত বুধবার তার চিকিৎসা শেষে কথা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ টি এম আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, বগুড়ায় তার বুলেট শরীর থেকে বের করা হয়নি। তা বের করার প্রয়োজন নাও পড়তে পারে। অসুবিধা দেখা দিলে চিকিৎসকরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্ত্রোপচার করে তা বের করা হবে। এখন তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।

এ ঘটনায় আহত মুসল্লি আফতাব আলী বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত অপর মুসল্লি আবু তাহের মিস্ত্রি সুস্থ হয়ে দুদিন আগে শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়েন।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts