September 21, 2018

মধ্যবর্তী নির্বাচন এড়াতে কৌশলী সরকার

নির্বাচন

মধ্যবর্তী নির্বাচন এড়াতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে দুর্বল করা, বিএনপির পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া ভণ্ডুল, তৃণমূল আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করাসহ শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনের বাইরে রাখা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধী জোটকে ব্যস্ত রাখাসহ বিভিন্ন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এসব কৌশল বাস্তবায়ন হলে আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ এড়ানো যাবে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। সে জন্য বিরোধী জোটের বারবার দাবির পরও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা স্পষ্ট করেই নাকচ করে দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর থেকেই আরেকটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর দেশী-বিদেশী চাপ বাড়তে থাকে। কিন্তু সরকারের দমননীতির কারণে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট অনেকটাই ব্যাকফুটে চলে যাওয়ায় সরকারে স্বস্তি আসে। সম্প্রতি আবারো আগাম নির্বাচনের দাবিতে তৎপর হয়ে উঠেছে বিএনপি জোট। সেই লক্ষ্যে দল গোছানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বিএনপিতে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে শিগগিরই দেশে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দিচ্ছেন দলের চেয়ারপারসনসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা। বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকেরাও। সে জন্য বিএনপি জোট যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে সে ব্যাপারে বিভিন্নভাবে তৎপর রয়েছেন তারা।
২০ দলকে দুর্বল করা : আগাম নির্বাচন এড়াতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে দুর্বল করতে তৎপর রয়েছে সরকার। জোটে ভাঙন ধরানো এবং মহাজোটের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভিন্নভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে তারা। সেই লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে বলে এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে। তবে গত রোববার রাতে অনুষ্ঠিত ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে ঐক্য অটুট থাকবে বলে ঘোষণা দেন জোটপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া। এর আগে ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে এসে এনপিপির শেখ শওকত হোসেন নীলুর নেতৃত্বে একটি অংশ ১০ দলীয় আলাদা জোট গঠন করে। এতে বিরোধী জোট থেকে ভেগে আসা অন্তত পাঁচটি দল (আংশিক) রয়েছে।
বিএনপির পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া ভণ্ডুল : মধ্যবর্তী নির্বাচন আদায়ে দল পুনর্গঠনের ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই সারা দেশে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতাকর্মীদের আবারো গ্রেফতার ও ধরপাকড় শুরু হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১০ দিনে সারা দেশে বিএনপি-জামায়াতের ২০০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূলত নাশকতার অভিযোগ ও পুরনো মামলায় গ্রেফতার হচ্ছেন বিরোধী নেতাকর্মীরা। কোথাও কোথাও সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই চলছে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান। গ্রেফতারের ভয়ে বাড়ি থাকতে পারছেন না নেতাকর্মীরা। ফেরারি হয়ে বেড়াচ্ছেন এখানে-সেখানে। সব মামলায় জামিন পাওয়ার পরও জেলগেট থেকে গ্রেফতার হচ্ছেন কেউ কেউ। আদালতে আত্মসমর্পণের পরও পাঠানো হচ্ছে কারাগারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানকে দল পুনর্গঠনে বড় বাধা বলে মনে করছে বিরোধী জোট। এ ছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামিন নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। এটিকেও বড় ধরনের বাধা হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে আন্দোলন চলাকালে দেশজুড়ে বিএনপি জোটের ২০ হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।
তৃণমূল আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করা : বিএনপি জোটকে চাপে রাখার পাশাপাশি নিজ দলকে আরো সুসংহত করতে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে ক্ষমতাসীনেরা। সেই লক্ষ্যে তিন মাসের টার্গেট নিয়ে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে আবারো তৃণমূলের সম্মেলন শুরু করতে যাচ্ছে দলটি। ওই দিন নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর পৌরসভার সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগ সম্মেলনের কাজ আবারো শুরু হচ্ছে। রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশ, রোজা, ঈদ ও শোকের মাস আগস্ট উপলে ৪০ দিনের কর্মসূচি থাকায় সাংগঠনিক জেলা ও তৃণমূল সম্মেলনের কাজ বন্ধ রাখে দলটি। সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে নভেম্বরের মধ্যে বাকি জেলা ও তৃণমূল সম্মেলন শেষ করা হবে বলে জানান কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর কেন্দ্রীয় সম্মেলন হবে ডিসেম্বরে।
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, সাতটি বিভাগের মধ্যে রাজশাহী বিভাগের তৃণমূল সম্মেলন এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি বিভাগগুলোর মধ্যে ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, সুনামগঞ্জ ও চাঁদপুরসহ ১৮টি জেলার সম্মেলন এখনো বাকি রয়েছে। এ ছাড়াও কিছু জেলার থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড সম্মেলন শেষ করা সম্ভব হয়নি। এ পর্যায়ে এগুলোও শেষ করা হবে।
শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে অযোগ্য হতে পারেন : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ সব নেতার নামেই রয়েছে মামলা। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই এসব মামলার রায় ঘোষণা করা হতে পারে। এতে বেগম খালেদা জিয়াসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতার সাজা হতে পারে। একইভাবে দলের দ্বিতীয় প্রধান প্রভাবশালী নেতা তারেক রহমান একাধিক মামলার আসামি। সম্পূরক চার্জশিটে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায়ও আসামি তিনি। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাজা ঘোষণা হতে পারে। এ ছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নির্বাচনে জিততে পারে এমন শতাধিক শীর্ষ ও কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগে দায়ের করা মামলা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এসব মামলায় সাজা হলে তারা নির্বাচনের অযোগ্য হতে পারেন। দলের সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে বিএনপি আর মধ্যবর্তী নির্বাচন চাইতে পারবে না বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন : মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি থেকে বিএনপি জোটকে সরাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে আনার কৌশল নিয়েছে সরকার। সেই লক্ষ্যে আগামী ডিসেম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে মেয়াদোত্তীর্ণ পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ সময় বিএনপি জোট মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি থেকে সরে স্থানীয় নির্বাচনে মনোনিবেশ করবে বলে মনে করছেন সরকারের শীর্ষ মহল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৯ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। আমরা বিশ্বাস করি বিএনপি টিকে থাকতে হলে সেই নির্বাচনে আসবে। আর ৫ জানুয়ারির মতো বর্জন করলে তারা আবারো আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।
দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। জনগণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেছে। তারা এ দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করার স্বপ্ন দেখছেন। তাই বিএনপি যেসব অজুহাত তুলছে, তা শুধু নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্যই।

Related posts