November 13, 2018

মধ্যপ্রাচ্যে অ্যামেরিকান হস্তক্ষেপ এর পেছনের কারনঃ তেল,না অন্য কিছু?


মুহাম্মাদ সজল

আন্তর্জাতিক তেল, মধ্যপ্রাচ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া আমাদের মধ্যে প্রচলিত সবচাইতে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটা হল আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ ছাড়া চলতে পারে না, তাই আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো ছলেবলে কৌশলে দখল করে রাখতে হয়। বিষয়টা ঠিক এরকম না।

গ্লোবাল ইকোনমির সাথে কম্প্যারিজনে ইউএস ইকোনমির নেট প্রোডাকশন সত্তরের দশক থেকে আর বাড়ে নাই। আশির দশক থেকে সেটা কমতে কমতে এখন অনেক কম, গোটা পৃথিবীর কনজাম্পশনের সিকিভাগ উৎপাদনের ক্ষমতাও এখন ইউএসএর নাই,এটাই বাস্তব।

ইউএসএ আশির দশক থেকে শুধু ভোগ করে যাচ্ছে। আমি আপনি যা কামাই, সেখান থেকে একটা ভাগ ফেডারেল রিজার্ভে যায়, কিভাবে যায় সেই হিসাব অন্য একদিন হবে।

তাহলে এখানে ম্যানুফ্যাকচারার কে? উত্তর সোজা, ইউরোপ আর জাপান, গত পনেরো বছরে আরেকটা নামকে কাউন্ট করতেই হবে, চীন।

এরমধ্যে চীন আমেরিকার রাইভাল, সে নিজের হিসাব নিকাশ স্বাধীনভাবে করে, মাঝে মধ্যেই দক্ষিণ চীন সাগর বা জাপান সাগরে আড়মোড়া দিয়ে ঘোষণা দেয়, দেখ বাবা আমাকে ডিস্টার্ব করিস না, তাইলে আমিও কিন্তু তোকে শান্তিতে থাকতে দেবো না।

বাকি থাকে ইউরোপ আর জাপান। এখান থেকেই খেলার ভেতরে ঢোকা শুরু করতে হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপিয়ানরা নিজেরা কোপাকুপি করে ঝাঝরা হয়ে যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ হয়ে পড়ে অনেকাংশেই পুরুষশুন্য, মেয়েরা তুলে নেয় ব্যবসা বাণিজ্য আর কল কারখানার দায়িত্ব, গোটা ইউরোপ তখন একটা ডিমিলিটারাইজেশন প্রসেসের ভেতর দিয়ে যায়। এই প্রসেসে হাওয়া দেয় ইউএসএ আর রাশিয়া। বেলিসিমো আইসক্রিমের নদীর এপার দেখবা তুমি আর ওইপার তুমি”র মত ডিমিলিটারাইজড ইউরোপকে দুই ভাগে ভাগ করে নেয় ইউএসএ-রাশিয়া। ওদিকে জাপান আগে থেকেই মার্কিন কব্জাতে।

আশির দশক থেকে মূলত এরাই আমেরিকাকে ফিড করছে, আমেরিকান বেকাররা বসে বসে খেতে পারে কারন ডাইরেক্টলি এরা(জাপান+ইউরোপ) এবং ইনডাইরেক্টলি আমরা তাদের খেতে দেই।

অর্থাৎ,রুটি রুযির জন্য না হলেও আয়েশ করে চলার জন্য ইউএসএর এখন ইউরেশিয়া ছাড়া চলেই না। আমেরিকার ইউরেশিয়ান ভাসাল স্টেট ব্রিটেন,ফ্রান্স,ইতালি এবং জাপান, সাথে জার্মানি তাদের এনার্জি সাপ্লাইয়ের জন্য পুরোপুরি রাশিয়া/মিডল ইস্টের গ্যাস/তেলের ওপর নির্ভরশীল, ইউএসএর নিজের যা তেল লাগে তার জন্য ল্যাটিন অ্যামেরিকানদের শোষণ করে সে যথেষ্ট পায়।

তার মানে,অ্যামেরিকা নিজের জন্য না, জাপান আর ইউরোপের জন্য মিডল ইস্টে মারামারি করে। আসলে ব্যাপারটা এত সিম্পল না। অ্যামেরিকাও এত ভাল মানুষ (স্টেট?) না। যেহেতু ইউরোপ-জাপানের প্রোডাকশন কমলে তার ঘি খাওয়াতে টান পড়বে, সেজন্য অ্যামেরিকা তাদের এনার্জি সাপ্লাইয়ের ব্যাপারটা দেখে।

পাশাপাশি, সে চায় না সারপ্লাস এনার্জি রিজার্ভে থাকা রাশিয়া নিজের তেল গ্যাস নিয়ে সরাসরি এনার্জি মার্কেট ডমিনেট করুক। কিন্তু অ্যামেরিকা চাক বা না চাক বিষয়টা ধীরে ধীরে সেদিকেই যাচ্ছে।

রাশিয়া নিয়ে ইউএসএর এত বেশি চুলকানির বড় একটা কারন হল দুনিয়াতে এরিয়াল অ্যাবিলিটিতে ইউএসএর সাথে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র রাশিয়ারই আছে, তাই তাকে ট্যাকল করতে না পারলে গ্লোবাল পলিটিক্সের নাটাই কোনক্রমেই ইউএসএর হাতে থাকবে না।

তিন নম্বর পয়েন্টটা হল, মিশর থেকে ইরান, তুর্কী থেকে ইয়ামেন এই ল্যাণ্ডস্কেপটুকু যে ডমিনেট করে, জগতের ভুরাজনীতির হর্তাকর্তা তাকেই মানা হয়, গত পাচ হাজার বছর ধরে এটাই নিয়ম। যখন মিশরের ফারাও কন্ট্রোল করতেন তখন তিনিই ছিলেন বিগ বস, তারপর ইরানের শাহানশাহ আসলেন, রোমান কাইজার আসলেন, ইসলামের খলীফারা আসলেন, সেলজুক-মামলুক ও শেষমেষ অটোমানরা আসলেন, তারপর ব্রিটিশ-ফ্রেঞ্চ রুশরা আসলো, সেকেণ্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের পর আসলো ইউএসএ, খেয়াল করে দেখেন জগতে যখন যার শক্তি সবচাইতে বেশি ছিল তখন এই জায়গাটুকু তার হাতেই ছিল। গত পাচ হাজার বছর এভাবেই চলছে, কারণ এইটুকু জায়গা দিয়েই এশিয়া-ইউরোপ-আফ্রিকার সব সামরিক আর বাণিজ্যিক হিসাব চলে।

নিজেকে নাম্বার ওয়ান প্রমাণ করতে এই জায়গা কোনভাবেই অন্যের হাতে ছাড়া যাবে না। ইউএসএ সেটাই করছে।

এরপর, সর্বশেষ ইস্যুতে আসি, কেন ইউএসএ দুই দিন পরপর মিডল ইস্টে গিয়ে হামলে পড়ে সেই বিষয়টা ক্লিয়ার করি।

নাম্বার ওয়ান, ভিয়েতনামে ইউএসএ যে ধোলাইটা খেয়েছিল, তারপর সে নিজের মিলিটারি পলিসি চেইন্জ করে।

নাম্বার টু, গত উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে ইউএসএ নিজের মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি পুরোপুরি টেকনোলজি বেসড করে ফেলে, কানাঘুষা আছে তারা ইতোমধ্যে রোবট ওয়ারিয়র ডিভিশনও বানিয়ে ফেলেছে।

যদিও তাদের মিলিটারির ট্রেনিং খুব হাই লেভেলের, কিন্তু ট্রেনিং করা আর যুদ্ধ করা এক জিনিস না, হিস্টোরিক্যালি ইউএস ল্যাণ্ডফোর্স কোন কাজের জিনিস না, তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য হল নিরস্ত্র রেড ইণ্ডিয়ানদের মেরে ম্যাসাকার করা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা স্থলযুদ্ধে সবসময়েই ব্রিটিশ-ফ্রেঞ্চদের ল্যাণ্ডফোর্সের পেছনে পেছনে ছিল, আর এখন তারা টেকনোলজির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।

কিন্তু রাশানদের ব্যাপারটাই আলাদা।

ওরা আগে থেকেই ভুমিতে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা এবং কোল্ড ওয়ারের পর তাদের মিলিটারিতে যে জন্জাল জমেছিল সেগুলো তারা গত সাত-আট বছরে ঝেড়ে ফেলেছে।

রাশানদের সাথে সরাসরি কমব্যাটে নামার ক্ষমতা আমেরিকার নেই এটা তারাও জানে। কিন্তু সে যে দুনিয়াতে এক নম্বর সুপারপাওয়ার তা তো রাশিয়াকে, এবং চীনসহ অন্যান্য যারা আছে তাদের নিয়মিতভাবে মনে করানো দরকার।

ধরেন আমার ভাল গুলতি আছে,এখন আমি যদি মাঝেমধ্যে পাখি না মারি তাহলে পাশের বাড়ির মন্টুকে আমি কেমনে বুঝাবো যে আমার গুলতি আছে আর নিশানাটাও তাজা??

এইজন্য ইউএসএ নিয়মিত বিরতিতে মুসলিম কান্ট্রিগুলার ওপর টার্গেট প্র্যাকটিস করে। কি দিয়ে?? এয়ারফোর্স দিয়ে।

কারন মুসলিম ওয়ার্ল্ডের কোন কান্ট্রিরই ইফেক্টিভ এয়ারফোর্স নাই। এয়ারফোর্স-মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম না থাকায় এবং ইনটেলিজেন্স-টেকনোলজিক্যালি ভয়ানক দুর্বল এই দেশগুলির ওপর টার্গেট প্র্যাকটিস করা অনেক সহজ, এবং এতে মাটিতে নামার কোন দরকারও পড়ে না।

শেষ পয়েন্ট. ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন অ্যাণ্ড দ্যা গ্র্যাণ্ড চেসবোর্ড বই দুইটা পড়লে বুঝবেন, ক্রুসেড এখনও শেষ হয় নাই। ক্রুসেড চলছে।

সূত্রঃ পাঠচক্র

Related posts