April 19, 2019

মধ্যপ্রাচ্যের বাজার জয় করেছে সুজানগরের আতর

শুভংকর কর্মকার ও কল্যাণ প্রসূনঃ উঠানের এক পাশে আগরগাছ ফালি ফালি করে কাটা হচ্ছে, আরেক পাশে চলছে কাটা ফালি বা টুকরাগুলো থেকে পেরেক খোলার কাজ। আর ঘরের বারান্দায় বসে নারীরা ফালি কেটে ছোট্ট ছোট্ট টুকরা করায় ব্যস্ত। খানিক দূরে কারখানায় শ্রমিকেরা সারি সারি যন্ত্রে আগর জ্বাল দিয়ে আতর তৈরি করছেন।

বেঙ্গল পারফিউমারির আবদুল কুদ্দুসের নিজের বাড়ি ও কারখানায় এভাবেই আতর তৈরির কাজ মিলেমিশে একাকার। তিনি জানালেন, মাসে গড়ে ২০০ তোলা (এক তোলায় ১১.৬৬ গ্রাম) আতর হয়। ভালো মানের প্রতি তোলা আতর বিক্রি হয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা দরে। মান একটু খারাপ হলে প্রতি তোলা আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পাওয়া যায়।

আবদুল কুদ্দুসের মতোই মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের বাড়িতে বাড়িতে এমন কারখানা। গুনলে শ তিনেকের মতো হবে। তবে অধিকাংশই ছোট ও মাঝারি আকারের। এখানকার তৈরি আতর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। চাহিদা ভালো থাকায় প্রচুর পরিমাণে আগর কাঠও রপ্তানি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব কাঠ ধূপের মতো জ্বালিয়ে সুগন্ধি তৈরি করে।
সম্প্রতি সুজানগর গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কয়েক শ বছর ধরেই সেখানকার লোকজন আগর-আতর ব্যবসায়ে আছেন। গত কয়েক বছরে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পটির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন অনেকে। পাশের জুড়ি উপজেলায়ও ছড়িয়ে পড়েছে এই সুঘ্রাণ, অর্থাৎ গড়ে উঠছে নতুন নতুন কারখানা।

কয়েকজন ব্যবসায়ী বললেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আতর উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে গাছ কাটা থেকে শুরু করে গ্যাস-সংযোগ ও রপ্তানির জন্য সাইটিস (কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জারড অব ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা) সনদ পাওয়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। এসব সমাধান করা গেলে রপ্তানি বাড়বে। তা ছাড়া সুজানগরের সম্ভাবনাময় আগর-আতরশিল্পকে ঘিরে বড় সুগন্ধি কারখানাও হতে পারে। এ জন্য অবশ্য বড় বিনিয়োগ দরকার।

আগর থেকে সুগন্ধি আতর: মৌলভীবাজার সদর থেকে যেতে সুজানগরের আগেই জুড়ি উপজেলা। সেখানেই আতর তৈরির কারখানা করেছেন সোহাগ মিয়া। ‘আলীফ আগর-আতর’ নামে তাঁর ছোট কারখানাটি ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে আগর থেকে আতর তৈরির খুঁটিনাটি বললেন তিনি। তাঁর সঙ্গে প্রস্তাবিত জুড়ি আগর-আতর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ইমরুল ইসলামও ছিলেন।
আগরগাছ লাগানোর পর ছয়-সাত বছর বয়স হলেই পুরো গাছে এক ইঞ্চি পরপর পেরেক মারা হয়। তখন গাছ থেকে একধরনের রস বের হয়।

পেরেকের চারপাশে সেই রস জমে কালো রং ধারণ করে। এভাবেই তিন থেকে পাঁচ বছর রাখা হয়। এরপর গাছ কাটা হয়। ছোট ফালি করে কাটার পর পেরেক খোলা হয়। তখন গাছের কালো ও সাদা অংশ আলাদা করা হয়। সেই কাঠ কারখানার হাউস কিংবা প্লাস্টিকের ড্রামে রাখা পানিতে ভেজানো হয়। এভাবে ফেলে রাখা হয় এক থেকে দেড় মাস। তারপর সেগুলো স্টিলের ডেকচির মধ্যে দিয়ে অনবরত জ্বাল দেওয়া হয়। তখন পাতন পদ্ধতিতে ফোঁটায় ফোঁটায় আতর নির্দিষ্ট পাত্রে জমা হয়।

সোহাগ মিয়া বললেন, আগরগাছের কালো অংশ দিয়েই ভালো মানের আতর হয়। তবে সাদা অংশ দিয়েও হয়, তবে সেটি একটু নিম্নমানের আতর। এ ছাড়া আতর তৈরির প্রক্রিয়া শেষে ব্যবহৃত কাঠ গুঁড়ো করে বিক্রি হয়। এক কেজি ৫০ টাকা। এগুলো মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৭ হাজার মার্কিন ডলারের আগর কাঠ রপ্তানি হয়। একই সময়ে আতর রপ্তানি হয় মাত্র ৩৪৮ ডলারের। সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬২ হাজার ডলারের আগর কাঠ রপ্তানি হয়। তবে কোনো আতর রপ্তানি হয়নি। যদিও প্রবাসীদের মাধ্যমে প্রতিদিনই মধ্যপ্রাচ্যে আতর যাচ্ছে বলে জানালেন সুজানগরের ব্যবসায়ীরা।

আতরের আঁতুড়ঘর সুজানগরে: মহাসড়ক থেকে সুজানগরে সরু রাস্তায় ঢুকতেই চোখে পড়ল সারি সারি আগরগাছ। পিচঢালা সড়ক। ঘরবাড়ির চেহারায় সচ্ছলতার ছাপ। মোটামুটি শহুরে গ্রাম। প্রায় বাড়িতেই কারখানা। গ্রামের পথ ধরে হাঁটলেই নাকে আসবে আগর-আতরের সুঘ্রাণ।
সুজানগরে বড় আতর কারখানার একটি বেঙ্গল পারফিউমারি। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আবদুল কুদ্দুস জানালেন, তাঁর কারখানার ১৬ মেশিনে মাসে প্রায় ২০০–২৫০ তোলা আতর তৈরি হয়। তাঁদের আতরের বড় ক্রেতা মধ্যপ্রাচ্যের সুগন্ধি ও আতরের ব্র্যান্ড আল হারামাইন ও মোবারক।
বেঙ্গল পারফিউমারি থেকে আমরা যাই আরেক বড় কারখানা সাদিয়া এন্টারপ্রাইজে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আনছারুল হক। তিনি বাংলাদেশ আগর-আতর উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি। তিনি জানালেন, ঋণপত্র খুলে ৫ লিটার আতর পাঠাতে যে খরচ হয়, ১০ তোলা পাঠাতেও একই খরচ। তবে কারখানাগুলো এত ছোট যে তাদের পক্ষে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে রপ্তানি সম্ভব নয়।

কথা প্রসঙ্গে আনছারুল আমাদের নিয়ে যান বদরুল ইসলামের কারখানায়। বাড়ির একটি ছোট্ট কক্ষে বদরুল এক বছর আগে কারখানাটি গড়েছেন। বিনিয়োগ সাড়ে তিন লাখ টাকা। তাঁর কারখানার একটি ডেকচিতে মাসে ১২ তোলার মতো আতর হয়। এতে আয় হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।
জানতে চাইলে বদরুল ইসলাম বলেন, ‘তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমার সংসার। আতর উৎপাদন করেই মোটামুটি ভালোই চলে যাচ্ছে।’ তাঁর কথা, সহজ শর্তে ঋণ পেলে কারখানা বড় করতে পারতেন।

আলাপকালে আনছারুল হক অভিযোগ করলেন, দেড় থেকে দুই ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের জায়গায় চার ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের গ্যাসের লাইন দরকার। কিন্তু পাচ্ছেন না। আগরগাছ কেটে বাগান থেকে কারখানায় আনতে প্রায়ই মালিকেরা ঝামেলায় পড়ছেন। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অর্থ না দিলে কম সময়ে সাইটিস সনদ মেলে না। এসব সমস্যার সমাধান দরকার। এ ছাড়া আগর-আতর রপ্তানিকারকদের নগদ সহায়তা প্রয়োজন।
‘এক জেলা এক পণ্য’ কর্মসূচির আওতায় ২০১০ সাল থেকে আগর-আতর ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নয়নে কাজ করছে ইপিবি। সংস্থাটির পরিচালক আবদুর রউফ সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কাজ করছি। আগের চেয়ে অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আতরের বিভিন্ন গ্রেডিং করার বিষয়ে আমরা গবেষণার কাজ শুরু করেছি। এটি হলে উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। ভালো দাম পাবেন।’
সম্ভাবনার হাতছানি: বেঙ্গল পারফিউমারির আবদুল কুদ্দুস বললেন, ‘আমার কাছ থেকে ইউরোপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আতর নেয়। তারা বিভিন্ন ফুলের ফ্লেভার দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি তৈরি করে। সে হিসেবে সুজানগরের আগর-আতরশিল্পকে ঘিরে সুগন্ধি কারখানা করা সম্ভব। এটি করা গেলে মূল্য সংযোজন বাড়বে।’

এদিকে ওমেন’স ওয়ার্ল্ড কসমেটিকস সম্প্রতি এনএইচ সিক্সটিনাইন নামে একটি পারফিউম বা সুগন্ধি বাজারে এনেছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহাদ আলম বলেন, দেশে সুগন্ধির নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজার তৈরিই আছে, বরং দিন দিন বড় হচ্ছে। তাই দেশে পারফিউমের কারখানা হলে দেশ-বিদেশি দুই বাজারের সম্ভাবনাই কাজে লাগানো যাবে। এ ক্ষেত্রে মৌলভীবাজারের আগর-আতরের কারখানাগুলো সুগন্ধি তৈরির কাঁচামালের একটি বড় অংশ জোগান দিতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুগন্ধির বিশ্ববাজারের সম্ভাবনার কথাটি জানা গেল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যানালিস্টিস এক প্রতিবেদনেও। এতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বিশ্বে সুগন্ধির বাজার দাঁড়াবে চার হাজার কোটি ডলারের। দেশীয় মুদ্রায় যা কিনা ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার সমান।
আগরগাছ থেকে আতর তৈরির প্রক্রিয়া

আগরগাছে পেরেক মারা হয়। তখন গাছের রস পেরেকের চারপাশে জমে। এভাবে ৩–৫ বছর রাখা হয়

কারখানায় এনে আগরগাছ থেকে পেরেক আলাদা করে ছোট ছোট টুকরা করা হয়

গাছের ছোট টুকরা হাউসে কিংবা ড্রামের পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় এক–দেড় মাস

টুকরাগুলোকে স্টিলের পাত্রে রেখে গ্যাস দিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়

বাস্প হয়ে একটি পাত্রে ফেঁাটায় ফেঁাটায় আতর জমা হচ্ছে

সুজানগরের বোতলজাত আতর

Related posts