December 12, 2018

মতি মাষ্টারের মেয়ে আলো

আলো

কুসুমপুর গ্রামের আদর্শের প্রতীক মতি মাষ্টার। সবার কাছে তিনি এই মতি মাষ্টার নামেই সুপরিচিত। তিনিই ছিলেন একমাত্র কুসুমপুর গ্রামের ঋণমুক্ত ব্যক্তি। মতি মাষ্টারের বড় মেয়ে আলো। আলোর আলোতে যেন আলোকিত পুরো কুসুমপুর গ্রাম। কুসুমপুর গ্রামে তার মত মেয়ে আর দ্বিতীয়টি নেই।

অনেক দিন আগের কথা। আলো তখন ক্লাস ফোর-এ পড়ে। একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় আলো দেখল, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পাশের পাড়ার একটা মেয়ে কাঁদছে। আলো তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, এই মেয়ে তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কি হয়েছে? মায়াবী চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে ঐ মেয়েটি বলল, কাল থেকে আমার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। কিন্তু আমি এখনো ফি জমা দিতে পরিনি। আমার বাবা খুব অসুস্থ আয় রোজগার করতে পারছে না। তাই এখনো ফি দিতে পারিনি। কথাগুলো শুনে ছোট্ট আলো অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। তার টিফিনে খাওয়ার টাকা গুলো সে ঐ মেয়েটির হাতে দিয়ে বলল, আর কেঁদো না। এই টাকা থেকে তুমি পরীক্ষার ফি দিও। এমনিভাবে আলো টিফিনে না খেয়ে টাকা বাঁচিয়ে নানাভাবে অন্যদের উপকার করত।

আলোদের সংসার ছিল অতি সাধারণ। বাবার উপার্জনে কোনো রকম চলে যেত সংসারের চাকা। কিন্তু তাদের সংসারে সুখের কোনো কমতি ছিল না। বাবা মা আর তিন ভাইবোন নিয়ে আলোদের সংসার।

আস্তে আস্তে এক সময় প্রাইমারী-হাইস্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজের বারান্দায় পা রাখল আলো। আলোর ছোট ভাই দুটো ছিল খুবই চঞ্চল। তারা যেটার বায়না ধরত সেটা পূরণ করতেই হতো। তাই আলো নিজের সব চাওয়া ও ইচ্ছাকে কবর দিয়ে তাদের ইচ্ছাটাই পূরণ করেছে। এমন শত ত্যাগের পর আলোর চোখে মুখে ছিল না কোনো হাসি খুশির কমতি। অতি সাধারণ পরিবারের এই অসাধারণ মেয়েটির কষ্টের জায়গাটা কেউ দেখতে পেত না। কারণ আলো সব সময়ই তার সব কষ্ট নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখত। এক সময় আলোর কলেজ জীবন শেষ হলো। তারপর সে ভর্তি হলো অনার্সে।

সবার জীবনে কোনো এক সময় উঁকি দেয় বসন্তের কোকিল, তেমনই আলোর জীবনেও। মনের অজান্তেই আলোর মনে বাসা বাঁধে এক কোকিল কুমার। বসন্তের এই কোকিলা সুর আলোকে অনেক আপন করে নেয়।

আলো তখন অনার্সের ছাত্রী। হঠাৎ একদিন ফোনালাপে আকাশ নামে এক ছেলের সাথে আলোর পরিচয় ঘটে। প্রায়ই আকাশ আলোকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিত। কিন্তু আলো বরাবরই কথা বলতে নারাজ ছিল। তারপরও আকাশের প্রতি কোনো এক জায়গায় যেন আলোর দুর্বলতা ছিল। কারণ একটা সময় আলো জানতে পারে আকাশের মা নেই। সৎ-মায়ের কাছে লালিত পালিত হয়েছে আকাশ। এরপর থেকে আকাশের প্রতি কেন জানি একটু দুর্বলতা কাজ করত আলোর মনে। এমনিভাবে মাস খানিক ফোনালাপ চলতে থাকে আলো আকাশের। মাঝে মধ্যে আকাশ আলোর মায়ের সাথেও কথা বলত।

এক সময় আকাশ আলোকে তার ভাল লাগা-ভালবাসার কথা বলে। আলোকে সে বিয়ের প্রস্তাবও দেয়। আলো তখন আকাশের এই কথাগুলো স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারিনি। তাই আলো চড়াও ভাবে আকাশের সাথে দূর্ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সেদিন আকাশ আলোর সব কথা মনে না নিয়ে মেনে নিয়েছিল। একটা সময় বিষয়টা আলোর পরিবার জানতে পারে। তখন আকাশের সাথে তার পরিবারও অনেক খারাপ ব্যবহার করে। তবুও আলোর পিছু ছাড়েনি আকাশ।

আস্তে আস্তে আলো আকাশের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু তারপরও আকাশ প্রতিনিয়তই আলোকে ফোন করতে থাকে। এক সময় আলো ভাবে- আমার জন্য একটা ছেলে কেন এমন পাগল? আমার মধ্যে সে কি এমন পেয়েছে? তাছাড়া আকাশের দুর্বলতার জায়গাটি আলোকে প্রতিনিয়তই আঘাত করতে থাকে। এমনিভাবে এক সময় আকাশের প্রতি আলোর ভাল লাগা থেকে ভালবাসা সৃষ্টি হয়। এভাবে আলো আকাশের মধ্যে গড়ে ওঠে ভালবাসার এক অপূর্ব বন্ধন।

আলোদের পাশের এক জেলা পরেই আকাশের বাসা। কিন্তু আজও আলো আকাশ কেউ একে অন্যকে দেখেনি।
আকাশের পড়াশুনা শেষ। এখন সে ঢাকায় একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করছে।

হঠাৎ একদিন আকাশ আলোকে বলল, আলো তোমাকে দেখার জন্য আমার মনটা ছটফট করছে। তোমাকে অনেকদিন থেকেই বলছি কিন্তু তুমি কোনো গুরুত্বই দিচ্ছ না। তখন একটু ভেজাকণ্ঠে আলো বলল, সর্বক্ষণ আমারও মনটা ব্যাকুল হয়ে থাকে তোমাকে দেখার জন্য। কিন্তু একটা ভয় যে মনে সব সময়ই কাজ করে। তখন আকাশ বিস্মিত হয়ে বলল, কি এমন ভয় আলো? আমাকে বল? তারপর আলো বলল, জানো আকাশ জগতের নিয়ম আগে চোখে দেখা, তারপর ভাল লাগা ভালবাসা। কিন্তু আমাদেরটা সম্পূর্ণ উল্টো। আমরা কেউ কাউকে না দেখেই ভালবেসেছি। আমার খুব ভয় করে আমাকে দেখে যদি তোমার পছন্দ না হয়!!!

আলোর মুখের এ কথা শেষ না হতেই আকাশ বলে উঠল, আলো তুমি যেমনই হও না কেন, তবুও তুমি আমার কাছে স্বপ্নের রাজকুমারী হয়ে থাকবে। কিন্তু আমাকে তোমার পছন্দ হবে কিনা জানিনা। এরপর আলো বলল, শোনো আকাশ আমি তোমার চেহারাকে নয়, তোমার ঐ নিষ্পাপ মনকে ভালবেসেছি। এজন্য তুমি যেমনই হও না কেন আমি মেনে নিতে পারব। আর তুমি কাল সকালে আমার কলেজ গেটে এসো, সেখানে দেখা হবে।

দিন ফুরিয়ে রাত্রি এলো। রজনীর বুক চিরে বইছে হিমেল হাওয়া। তবুও দু’চোখে ঘুম আসে না আলোর। আলোর শয়নে স্বপনে যেন মিশে আছে শুধুই আকাশ। রাত পোহালেই দেখা হবে তার সেই স্বপ্নের মানুষটির সাথে।

জোনাকির মিটিমিটি আলো আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার গানে রাত পেরিয়ে সকাল হলো। আলো আজ একটু তাড়াতাড়ি কলেজে গেল। কলেজ গেটে যেতেই আলো দেখল এক অপরিচিত ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই আলোর ফোনে কল আসে। কল রিসিভ করার সাথে সাথে আলো বুঝতে পারে ঐ ছেলেটি তার আকাশ। এরপর তারা একে অপরের একটু কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশ অপলোক ভাবে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। আর মনে মনে ভাবছে, আলো তুমি এত সুন্দর যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।

Related posts