September 21, 2018

ভয়েস অফ আমেরিকার প্রতিবেদন: বাংলাদেশে সাংবাদিক গ্রেপ্তার নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী সজীব ওয়াজেদ জয়কে হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বর্ষীয়ান একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তারা একই মামলায় বাংলাদেশের আরেকটি পত্রিকার সম্পাদককে শ্যোন এরেস্ট দেখিয়েছে । গত শনিবার মাসিক ম্যাগাজিন ‘মৌচাকে ঢিল’-এর সম্পাদক শফিক রেহমান (৮২) কে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বলেছে, তিনি সজীব ওয়াজেদ জয়ের সম্পর্কে গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে এফবিআইয়ের একজন এজেন্টের সঙ্গে গোপন চুক্তি করতে ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি জয়কে অপহরণ ও হত্যা ষড়যন্ত্রে সহায়তা করেছেন। পুলিশ বলেছে, শফিক রেহমানকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল তখন আরেকটি পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে শ্যোন এরেস্ট দেখানো হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা ও অন্যান্য অভিযোগে ২০১৩ সালে তাকে জেল দেয়া হয়েছে। শফিক রেহমান ও মাহমুদুর রহমান দুজনেই সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। তাদের প্রতি সমর্থন রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি)। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার ঢাকায় বলেছেন, বিএনপির সাবেক এক নেতার কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে এফবিআইয়ের এক এজেন্টকে ধরেছে আমেরিকার তদন্তকারীরা। এতে শফিক রেহমান ও মাহমুদুর রহমানের জড়িত থাকার কথা আমেরিকার আদালতে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশের আদালতে নয়।

জয় এখন বাংলাদেশে। শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তারের পর তিনি রোববার ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, আমাকে অপহরণ ও হত্যা ষড়যন্ত্রে শফিক রেহমান সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি উদঘাটন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস। তারা এ প্রমাণ দিয়েছে আমাদের সরকারের কাছে। এ প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সরকার তার স্বৈরাচারী আচরণ প্রকাশ করেছে। খালেদা জিয়া বলেন, শফিক রেহমান তার লেখার মাধ্যমে এ সরকারের সব ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও অন্যায় আচরণ অব্যাহতভাবে প্রকাশ করেছেন। তার বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ এনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারণ, অন্য কোন উপায়ে তার লেখালেখি থামাতে পারছিল না সরকার।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের এক আদালত বাংলাদেশি অভিবাসী রিজভি আহমেদ ওরফে সিজারের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার অভিযোগে এফবিআইয়ের একজন সাবেক এজেন্ট রবার্ট লুসতিয়াকতে ৫ বছরের জেল দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের মতে, বাংলাদেশের সুপরিচিত একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে গোপনীয় তথ্য দেয়া ও অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগকারীদের গোপন নথি অর্থের বিনিময়ে সরবরাহ করার কারণে লুসতিয়িককে জেল দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধী এক ব্যক্তির ব্যবহারের জন্য এসব তথ্য দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিএনপির এক নেতার ছেলে রিজভি আহমেদকে এজন্য ৪২ মাসের জেল দেয়া হয়েছে। তিনি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের জেলে রয়েছেন। গত বছর তাকে জেল দেয়ার পর ঢাকার পুলিশ সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে বিএনপির কিছু নেতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওই মামলায় ঘুষের বিষয়ে অথবা বাংলাদেশের মামলায়ও শফিক রেহমানকে অভিযুক্ত হিসেবে তার নাম আনা হয়নি। পুলিশ বলেছে, তদন্তের ধারায় ওই ষড়যন্ত্রে তাকে জড়িত দেখতে পেয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে ঢাকায় সাংবাদিকের ইউনিয়নের একটি গ্রুপের নেতারা অবিলম্বে শফিক রেহমানের মুক্তি দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, তাকে গ্রেপ্তার মারাত্মক অন্যায়। ওই বিবৃতিতে বলা হয়, গণতন্ত্র ও সুশাসনকে সমর্থন করে লেখালেখির জন্য সুপরিচিত শফিক রেহমান। তাকে গ্রেপ্তার মুক্ত মত প্রকাশের অধিকারের ওপর একটি আঘাত।

অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো বলছে, ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে কঠোর কৌশল ব্যবহার করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার। তারা বলছে, এতে বাংলাদেশে মুক্ত মত প্রকাশ ও মিডিয়া হুমকিতে পড়তে পারে। হংকংভিত্তিক লিগ্যাল রাইটসবিষয়ক এশিয়ান লিগ্যাল রাইটস রিসোর্স সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেছেন, জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট ছাড়া ক্ষমতায় আসার পর এ সরকার এমন কৌশলকে একটি মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আশরাফুজ্জামান বলেন, যেখানে মৌলিক আইনশৃঙ্খবিষয়ক প্রতিষ্ঠান যেমন: আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, অপরাধ তদন্তবিষয়ক এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকে সরকারের হাতের পুতুল হয়ে সেখানে এমনভাবে কঠোর হস্তে কৌশল ব্যবহার করায় বিস্ময়ের কিছু নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, মিডিয়ার কণ্ঠ নীরব করে দিতে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির ফৌজদারি আইন ব্যবহার করছে। কারণ, তারা এদেরকে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে শত্রু ভাবাপন্ন হিসেবে মনে করে থাকে। ফিল রবার্টসন বলেন, সংবাদপত্রের ও ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি অভিযোগ আনার মাধ্যমে বাংলাদেশে মুক্ত প্রেস ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে যা আছে তাতে আঘাত করা হচ্ছেÑ এটা পরিষ্কার।

(১৯শে এপ্রিল অনলাইন ভয়েস অব আমেরিকায় প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

Related posts