September 23, 2018

ভিক্টর হুগো’র ‘লে মিজারেবল’

Captureবিনোদন ডেস্ক ::ফরাসী ভাষায় ‘লে মিজারেবল’ কথাটির শব্দগত অর্থ দীন দুঃখীরা। হ্লেও লেখক উনিশ শতকের ফ্রান্সের সাম্রাজ্যতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের অধীনে সমাজের নিচের তলার সে সব মানুষের জীবনের এক সকরুণ জীবন চিত্র এঁকেছেন। যারা দুঃখ দৈন্যের অভিশাপে বিকৃত।

কাহিনী সংক্ষপ:
উপন্যাসের নায়ক জা ভালজা। এমন বিবর্তনধর্মী চরিত্র বিশ্বসাহিত্যে বিরল। সে তার জীবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন চারটি চরিত্রের সংস্পর্শে আসে যারা তার জীবনের মোড় ফিরিয়ে দেয়। সেই চারটি চরিত্র হল বিশপ মিরিয়েল, ইন্সপেক্টর জেভারত, ফাতিনের মেয়ে কসেত্তে এবং কসেত্তের প্রেমিক যুবক মেরিয়াস।

যে সমাজে চোর ও অপরাধীর জন্যে নির্মম শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু গরিবদের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা নেই, উনিশ বছরের কারাদন্ড শেষে জেল থেকে বেড়িয়ে সে নিষ্ঠুর সমাজের প্রতি চরম ঘৃণা ও বিদ্রোহাত্মক প্রতিক্রিয়ায় ফেটে পড়ে ভালজার সমগ্র আত্মা। তখন বিশপ মিরিয়েল এর অপরিসীম দয়া সমস্ত ঘৃণা নিঃশেষ করে তার মন থেকে। এক মহা জীবনের পথ দেখায় হতাশা আর অন্ধকার থেকে।

এরপর তার জীবনে আসে কর্তব্যপরায়ণ ও নীতিবাদী ইন্সপেক্টর জেভারত। মত্রিউল সুর মের অঞ্চলে বিশাল সম্পদ ও মান সম্মান এর অধিকারী হয়। তখন একদিন জেভারত এসে তাকে বলে শ্যাম্পম্যাথিউ নামে এক লোক জা ভালজা নামে দন্ডিত হচ্ছে। ফলে আবার এক আত্মিক সঙ্কটে পড়ে সে। ভাবতে থাকে এই সম্মান এর জীবন বহন করবে নাকি সত্যটা মেনে নিয়ে শ্যাম্পম্যাথুকে মুক্ত করবে।

অবশেসে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে কারাদণ্ড ভোগ করে সে। এরপর তার জীবনে আসে ফাতিনের মেয়ে কসেত্তে। জাকে আট বছর বয়সে থ্রেনাদিয়েরদের হোটেল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে সে… এই কসেত্তের আভিরবা তার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

আত্মীয় স্বজনহীন জীবনে শিশু কসেত্তে নিয়ে আসে এক আশ্বাস। একাধারে পিতা ও ভ্রাতার সমন্বিত ভালোবাসা দিয়ে এক দুর্ভেদ্য জাল সে কসেত্তের জন্য রচনা করে। যা ছিন্ন করে কেউ তাকে তার কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারবেনা ভাবতে থাকে। তাই যখন সে জানতে পারে কসেত্তে মেরিয়াস নামে এক যুবককে ভালোবাসে আবার সে আত্মিক সঙ্কটে পড়ে। কিন্তু আত্মত্যাগের এক বিরল মহিমায় কসেত্তেকে স্বেচ্ছায় তুলে দেয় মেরিয়াসের হাতে এবং আত্মত্যাগ, আত্ম নিগ্রহ ও স্বেচ্ছা মৃত্যুর দিকে নিজেকে ঠেলে দেয় সে।

এভাবেই সমস্ত কামনা বাসনা কে জয় করে মৃত্যুহীন এক মহাজীবনের আলোকমালা দেখতে পায় এবং মৃত্যুবরণ করে…

এ যেন কোনো উপন্যাস নয়। জীবনের জয়, পরাজয়, উত্থান-পতন, আশা-আকাঙ্খা সম্বলিত এক মহাকাব্য।

লেখক পরিচিতি:
ভিক্টর মারি হুগো ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮০২ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বিশাল সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তার সন্তান ছিলেন তিনি। একাধারে সাহিত্য এবং রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন।

ফ্রান্সে সাম্রাজ্য আইন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তিত হওয়া এবং সেই প্রক্রিয়ার নানান উত্থান-পতনে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্যারিসে বসবাসরত ভিক্টর হুগো তরুণ বয়সেই তার কবিতা, কল্পকাহিনী এবং নাটকের জন্য বিখ্যাত এবং কখনো কুখ্যাতও হয়েছিলেন।

১৮৪৫ সালে, তার বিখ্যাত গ্রন্থ লা মিজারেবল লেখার সময়, রাজা তাকে ফ্রান্সের উচ্চকক্ষের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেন। আইনসভার সর্বোচ্চ দলের সঙ্গে তাকে সম্পৃক্ত করা হয়। তিনি সেখানে সবার জন্য বিনা খরচে লেখাপড়া, সার্বজনীন ভোটাধিকার এবং মৃত্যুদণ্ডের বিলুপ্তির ব্যাপারে কাজ করা শুরু করেন।

১৮৪৮ সালে যখন রাজ্যে উন্নতির জোয়ার স্পষ্টভাবে কড়া নাড়ছিল, তিনি লা মিজারেবল লেখা বন্ধ করে রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু ১৮৫১ সালে যখন দেশের প্রেসিডেন্ট নিজেকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন, হুগোর রাজনৈতিক চেতনার বিরোধিরা তাকে বৃটিশ চ্যানেলের একটি দ্বীপে নির্বাসনে বাধ্য করে। নির্বাসনে থেকেই ১৮৬০ সালে তিনি আবার লা মিজারেবল লেখার কাজে হাত দেন এবং পরের বছর উপন্যাসটি শেষ করেন।

১৮৭০ সালে সম্রাটের পতন হলে হুগো ফ্রান্সে ফেরত আসেন, যেখানে তাকে গণতন্ত্রের মানসপূত্র হিসেবে বিপুলভাবে সম্মানিত করা হয়।

২২ মে ১৮৮৫ সালে ভিক্টর হুগোর মৃত্যুর পরে ফ্রান্সের রাস্তায় তার কফিন বয়ে নেবার সময়ে বিশ লাখ মানুষের ঢল নামে। সেদিন ফ্রান্সের জনগণ যতভাবে সম্মান জানানো সম্ভব, জানিয়ে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।

Related posts