November 19, 2018

‘ভাড়া বাড়ল, সেবার মান তো বাড়েনি?’

556
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের আপত্তির মধ্যেই ট্রেন যাত্রায় বর্ধিত ভাড়া কার্যকর করেছে রেল কর্তৃপক্ষ; তাতে যাত্রী না কমলেও তাদের মুখে শোনা গেছে সেবার মান নিয়ে সেই বহু পুরনো অভিযোগ।

বর্ধিত ভাড়ায় টিকেট বিক্রি শুরুর পর শনিবার সকালে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে কথা হয় নেত্রকোণাগামী হাওড় এক্সপ্রেসের টিকেট কিনতে আসা মাসুদুর রহমানের সঙ্গে।

তিনি বলেন, “ভাড়া তো বাড়ল, সেবার মান তো একফোটা বাড়েনি।”

সেবার মান বলতে মাসুদের চাওয়া ট্রেনের টিকেট পাওয়া যাবে ভোগান্তি ছাড়াই। ট্রেন স্টেশন ছাড়বে এবং গন্তব্যে পৌঁছাবে ঠিক সময়ে। কোনো টিকিট কালোবাজারে যাবে না। ট্রেনের ভেতরের পরিবেশও যাত্রীদের চলাচলের উপযোগী থাকবে।

এর কোনোটিই ‘নিশ্চিত না করে’ রেলের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক বলে মানতে পারছেন না তিনি।

কিশোরগঞ্জের ট্রেন ধরতে সকালে পরিবার নিয়ে কমলাপুরে এসেছিলেন বেঙ্গল সিরামিকসের কর্মকর্তা তুহিন।

তিনি বলেন, “সার্ভিস না বাড়িয়ে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। আমার ট্রেন ১০টায় আসার কথা থাকলেও সময় মতো আসেনি।”

যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধির কথা বলে এর আগে ২০১২ সালে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল কিলোমিটারে গড়ে ৩৬ পয়সা।

আর এবার গড়ে ভাড়া বেড়েছে ৭.২৩ শতাংশ। গন্তব্য অনুযায়ী বর্ধিত ভাড়ার তালিকা আগেই সব স্টেশনে টানিয়ে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

নতুন হারে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে শোভন শ্রেণির ভাড়া ২৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ২৮৫ টাকা, শোভন চেয়ার ৩২০ থেকে ৩৪৫, এসি চেয়ার ৬১০ থেকে ৬৫৬, এসি সিট ৭৩১ থেকে ৭৮৮ ও এসি বার্থ ১০৯৩ থেকে ১১৮৯ টাকা হবে।

ঢাকা-খুলনা রুটে শোভন শ্রেণির ভাড়া ৩৯০ টাকা থেকে বেড়ে হবে ৪২০ টাকা, শোভন চেয়ার ৪৬৫ থেকে ৫০৫, এসি চেয়ার ৮৯১ থেকে ৯৬১, এসি সিট ১০৭০ থেকে ১১৫৬ ও এসি বার্থ ১৫৯৯ থেকে বেড়ে হবে ১৭৩১ টাকা।

ঢাকা-সিলেট রুটে শোভন শ্রেণির ভাড়া হবে ২৬৫ টাকা, শোভন চেয়ার ৩২০, এসি চেয়ার ৬১০, এসি সিট ৭৩৬ ও এসি বার্থ ১০৯৯ টাকা। ঢাকা-রাজশাহী রুটে এসব শ্রেণির ভাড়া হবে ৮৫, ৩৪০, ৬৫৬, ৭৮২ ও ১০৬৮ টাকা।

অন্যান্য রুটেও প্রায় একই হারে বাড়ছে যাত্রী ভাড়া।

এই হারে ভাড়া বৃদ্ধিকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ বলেছেন যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

তিনি বলেন, “যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর অঙ্গীকার করে ২০১২ সালেও ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেবার মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে রেলে লোকসান হয়, আর এখন যাত্রীদের ওপর তার ভার চাপাচ্ছে।”

মোজাম্মেল হক জানান, সম্প্রতি রেলপথে নিয়মিত ভ্রমণকারী প্রায় তিনশ’ যাত্রীর ওপর একটি জরিপ চালিয়েছেন তারা, যাতে ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা ভাড়া বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক’ বলেছেন। সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রামের পথে চলাচলকারী অন্যতম বিলাশবহুল ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসের যাত্রীদের মধ্যে ওই জরিপ চালানো হয়।

“পুরো ট্রেনের বিভিন্ন কোচে ভাঙা আসন, ছারপোকা ও তেলাপোকার উপদ্রুপ দেখা গেছে। পাশাপাশি টিকিটবিহীন যাত্রী ওঠানামাসহ নানা অনিয়ম দেখেছে জরিপকারী দল।”

জরিপ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, যাত্রীসেবার মান, রেল স্টেশনের সার্বিক পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা- ইত্যাদি বিষয়ে ‘সন্তুষ্ট নন’ বলে জানিয়েছেন ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা রেলের সেবার মান ‘সন্তোষজনক’ বলেছেন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়,৭০ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিত কালোবাজারির কাছ থেকে টিকিট কিনে ভ্রমণ করতে বাধ্য হওয়ার কথা বলেছেন। তিন শতাংশ বলেছেন, তারা ঊর্ধ্বতন রেল কর্মকর্তা-কর্মচারী, রেলপুলিশ, আমলা, এমপি-মন্ত্রীর তদবিরের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করেন।

বুকিং সহকারী, অনুসন্ধান কর্মকর্তা, স্টেশান মাস্টার, স্টেশান ম্যানেজার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে অসন্তুষ্টির কথা বলেছেন জরিপের ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা।

ওই জরিপেরই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল শনিবার সকালে কমলাপুর স্টেশনে আসা যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে।

মো. হাসেম আলী নামের এক যাত্রী জানালেন, একটি আন্তঃনগর ট্রেনের আসন বিহীন টিকিট কেটে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুরে এসেছেন তিনি। বাসে আসতে যানজটে পড়তে হয় বলে এভাবেই তিনি মতিঝিলে এসে অফিস করেন।

“অন্য সময়ে ৩৫ টাকায় চলে আসি। শনিবার ৪৫ টাকা নিলো। কিন্তু সার্ভিস তো আগের মতই। কেনো বাড়তি সুবিধা নিশ্চিত না করে কেবল ভাড়াটাই চাপিয়ে দিল সরকার।”

একতা এক্সপ্রেসের যাত্রী সিরাজগঞ্জের শরীফ বলেন, “ট্রেন ১১টায় ছাড়ার কথা, কিন্তু দেরি হচ্ছে। এ সমস্যা তো নিয়মিত হয়।”

কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলছেন, তাদের আন্তরিকতার কোনো ‘অভাব নেই’। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে তারা ‘সব সময়ই সচেষ্ট’।

বর্ধিত ভাড়া ও সেবার মান নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “যাত্রীদের মধ্যে তো কোনো অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে না। তারা অসন্তুষ্ট- এমন কোনো অভিযোগও তো পাইনি।”

এই রেল কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা থেকে প্রতিদিন ১৩০টি ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করে। এর মধ্যে ‘দুই-একটা ট্রেন’ সময়মতো ছাড়া সম্ভব হয় না।

“অন্য ট্রেনগুলো তো সময় মতই ছাড়ে। এটাকেতো আর শিডিউল বিপর্যয় বলা যায় না।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts