September 19, 2018

ভাড়া খাটছে জগন্নাথ খেলার মাঠ!

564

স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সুস্থ-সুন্দর দেহ-মন গঠনের সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো খেলাধুলা। কিন্তু সুস্থ-সবল দেহ আর পরিশীলিত মন গঠনের সুযোগ পাচ্ছে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। খেলার বিশাল মাঠ থাকলেও দীর্ঘ দিন থেকেই শিক্ষার্থীরা এই মাঠে নামতে পারেন না। কারণ, মাঠটি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়েছে হল প্রশাসন। তবে বিকাল চারটার পর এবং বিসিবি‘র খেলা না থাকলে শিক্ষার্থীরা খেলতে পারেন বলে দাবি করেছেন হলের প্রাধ্যক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত এই মাঠে খেলত। অনেক খেলোয়াড়ই এখানে খেলে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু মাঠটি ভাড়া দিয়ে রেখে খেলোয়াড় উঠে আসার প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দিয়েছে হল কর্তৃপক্ষ। হলের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সামান্য কিছু টাকার জন্য খেলার মাঠটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে দীর্ঘ দিন ধরে।

ফলে খেলাধুলার ইচ্ছে থাকলেও তারা খেলতে পারছেন না। মাসের প্রত্যেকটি দিনই মাঠে বিসিবি বা করপোরেট লিগের কোনো না কোনো খেলা থাকে। তাদের খেলা শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এজন্য মাঠে নেমে খেলাধুলা নয়, মাঠের বাইরে থেকে দর্শক হিসেবে খেলা দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এ বিষয়ে কোনো শিক্ষার্থী কিছু বললে হল প্রশাসন হয়রানি করে বলেও অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিষ্ঠান ভেদে ২৫ খেকে ৪০ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয় জগন্নাথ হলের খেলার মাঠটি। সোমবার বেলা দুইটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে বিসিবির অধীনে খেলা চলছে। বয়সভিত্তিক অনূর্ধ্ব ১৮-এর যমুনা-৩ ও যমুনা-৪ দলের মাঝে খেলা হচ্ছিল। হলের শিক্ষার্থী ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সপ্তাহের সাত দিনই বিসিবি আর বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকে জগন্নাথ হলের এই মাঠ। শুক্রবার ও শনিবার এই মাঠে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান পরিচালিত ‘করপোরেট লিগ’-এর খেলা হয়। করপোরেট লিগের খেলা হয় মূলত: ২০ ওভারের এবং দিনে তারা দু’টি করে ম্যাচ খেলে। ২০ ওভারের দুটি ম্যাচ যখন শেষ হয় ততোক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে যায়। আর সপ্তাহের বাকি পাঁচদিন এই মাঠটি থাকে বিসিবির দখলে। বিসিবির অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট ছাড়াও বিভাগ (ডিভিশন) ভিত্তিক টুর্নামেন্টের খেলা অনুষ্ঠিত হয় এই মাঠে। বিসিবির পরিচালিত প্রায় সবগুলো খেলা হয় ৫০ ওভারের, সকাল থেকে শুরু করলেও এক ম্যাচ শেষ হতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।

ফলে সপ্তাহের কোনো দিনই হলের শিক্ষার্থী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খেলার জন্য মাঠে নামতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ কিন্তু খেলতে মানা শিক্ষার্থীদের। খেলছেন বহিরাগতরা। ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ৩২ বছর ধরে জগন্নাথ হলের মাঠটি পরিচর্যা করে আসছিল শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত খেলাধুলা করত। ভালো খেলোয়াড় উঠে আসত। কিন্তু এখন সেই সুযোগ বন্ধ। মাঠটি সারাবছর ভাড়া দিয়ে রেখেছে হল কর্তৃপক্ষ। ‘এখন খেলোয়াড় উঠে আসা তো দূরে থাক, খেলারই তো সুযোগ পায় না শিক্ষার্থীরা’ -এমনটাই জানান শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা। এ বিষয়ে হলের সন্তোস চন্দ্র ভট্টাচার্য ভবনের শিক্ষার্থী সুদ্বীপ কুমার প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘হলের মাঠ ভাড়া দেওয়ার কারণে আমরা এখন আর খেলাধুলা করার কোনো সুযোগ পাচ্ছি না। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সবসময়ই বহিরাগত খেলোয়াড়দের আনাগোনা থাকার কারণে হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সচারাচর খেলার মাঠের দিকে আসে না বললেই চলে।’ তিনি আরো জানান, আগে যখন হলের মাঠ ভাড়া দেওয়া থাকত না তখন হলের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও ক্যাম্পাসের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা মাঠে এসে খেলাধুলা করত।

কেউবা আবার গ্যালারিতে বসে খেলা দেখত আবার অনেকে জমিয়ে আড্ডা দিত। কিন্তু এখন মাঠে দিকে কেউ যায় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘হলের প্রভোস্ট সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য আমাদের খেলাধুলার অধিকারকে করপোরেটদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। খেলাধুলার সুযোগ না পেয়ে কিছু ছাত্র অলস সময় পার করতে করতে এক সময় বিড়ি-সিগারেটসহ অন্যান্য মোহজাগানিয়া জিনিসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এনিয়ে কিছু বলাও যায় না। বললে উল্টো ঝামেলায় পড়তে হয়। হল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।’ মাঠে খেলোয়াড় নয়, দর্শক হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। ছবি: প্রিয় ক্যাম্পাস খেলাধুলা করার জায়গা হারিয়েছে হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোমলমতি ছেলেমেয়েরাও। সানি নামের এক শিশু বলে, ‘আগে যখন হলের ‘দাদারা’ খেলত তখন মাঠের একপাশে আমরাও খেলছি। কেউ কিছু বলত না কিন্তু এখন ওই দিকে যাওয়া নিষেধ। গেলে বকা দেয়।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জগন্নাথ হলের খেলার মাঠের তত্ত্বাবধানে থাকা এক কর্মচারী কে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের খেলার জন্য যেখানে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, সেখানে হল প্রশাসন কোন যুক্তিতে এই মাঠ ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কে জানে।

’ এ ব্যাপারে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. অসীম সরকারের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, হলের অভ্যন্তরীণ খরচ মেটাতে মাঝে-মধ্যে খেলার মাঠটি ভাড়া দেওয়া হয়। হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেখানে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না, সেখানে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে কেন মাঠ ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। অসীম সরকার জানান, হলের শিক্ষার্থীরা খেলতে পারছে না এমন অভিযোগ অযৌক্তিক। সকাল ৯ টার আগে এবং বিকাল ৪ টার পরে হলের শিক্ষার্থীরা মাঠে খেলাধুলা করে। জগন্নাথ হলের খেলার মাঠ ভাড়া দেওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘হলের মাঠ বা হল বিষয়ক সকল বিষয় দেখভাল করে হল কর্তৃপক্ষ’। তবে কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাঝেমাঝে কিছু প্রতিষ্ঠানকে খেলার সুযোগ দেয় বলে তিনি জানান। শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, খেলতে পারছে না- এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের খেলার সুযোগ সবার আগে নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts