September 25, 2018

ভালবাসার অপরাধে কিশোর-কিশোরীকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন (ভিডিও সহ)

Global Pic

শরীয়তপুর প্রতিনিধি: বিদ্যালয়ের মাঠে এক কিশোর-কিশোরীকে নির্যাতন করার একটি ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপার শুরু হয়েছে। তাদের দড়ি দিয়ে হাত বেধে গলায় জুতার মালা পড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপরে তাদের জুতা দিয়ে পেটানো হয়। তিনজন ব্যক্তি তাদের পেটায়। ছয় মিনিট ৪২ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউব ও ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওর দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের ছিডারচর এলাকার কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিক কান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে। এই ঘটনায় সালিসকারক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিকে আটক করে থানায় নিয়ে এসেছে পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিক কান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীর সাথে তার প্রতিবেশি এক কিশোরের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত ৬ ফেব্রুয়ারী তারা দুজন বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামের শেষ প্রান্তে নদীর ঘাট থেকে তাদের আটক করে কয়েকজন যুবক। আটক করে তাদের আনা হয় কুন্ডেরচর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিকের বাড়িতে। লিয়াকত মল্লিকের নির্দেশে বাড়ির উঠানে শিকল দিয়ে বেধে তাদের রাতভর নির্যাতন চালানো হয়। পরদিন তাদের নেওয়া হয় কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিক কান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে তাদের দড়ি দিয়ে বাধা হয়, এরপরে তাদের গলায় জুতার মালা পড়িয়ে দেওয়া হয়। কুন্ডেরচর ইউপির তিন নম্বর ওয়ার্ড সদস্য কামাল মল্লিক, স্থানীয় আমীর হোসেন মল্লিক ও সুজন মল্লিক কিশোর- কিশোরিকে জুতা দিয়ে পেটাতে থাকে। তাদের হাত বেধে বিদ্যালয়ের মাঠে ফেলে রেখে যায়। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে। এ ঘটনাটি কাউকে না জানানোর জন্য তাদের পরিবারকে হুমকি দেয় কামাল মল্লিক। এমনকি তাদের চিকিৎসার জন্য গ্রামের বাইরে না নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্যাতিত কিশোরীর ভাই বলেন, আমার বোন ছোট মানুষ। জীবন সম্পর্কে বোঝার মত বয়স ওর হয়নি। সে কোন অন্যায় কাজ করলে আমাদের জানাতে পারত। আমাদের না জানিয়ে লিয়াকত মল্লিক ও কামাল মল্লিকের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে ওদের নির্যাতন করেছে। এমনকি তারা দুজন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসার জন্য গ্রামের বাইরে নিতে দেয়নি। কিশোরের বাবা বলেন, আমরা গরিব মানুষ, ছেলে কৃষি শ্রমিকের কাজ করে। সে কোন অন্যায় করলে আমরা রয়েছি। দেশে আইন আছে। কামাল মল্লিকের সাথে আমাদের এলাকার বিরোধ রয়েছে। এ কারণে সে এভাবে আমার ছেলেকে নির্যাতন করেছে। আমি ঘটনাটি জাজিরা থানায় জানিয়েছিলাম। পুলিশ বলেছে ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু পুলিশ আর আসেনি। তাদের নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও প্রচার হওয়ার পর পুলিশ এসেছে। কান্নাজরিত কণ্ঠে মেয়েটি বলেন, আমাকে বেদম নির্যাতন করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠে আমাকে নির্যাতন চালানোর সময় আমাকে বাচাতে কোন শিক্ষক ও সহপাঠিরাও এগিয়ে আসেনি। আমি চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছি। সবাই দাড়িয়ে মজা দেখেছে। আমিতো কোন অন্যায় করিনি। একটি ছেলেকে ভালোবেসেছি। তাকে নিয়ে সাংসার করতে চেয়েছিলাম। এখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। ছেলেটি  জানায়, আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের পায়ে ধরেছি, তাতেও তারা আমাদের নির্যাতন করা বন্ধ করেনি। এদিকে পুলিশ ও গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে কামাল মল্লিক, আমীর হোসেন মল্লিক ও সুজন মল্লিক গ্রাম থেকে পালিয়ে গেছে। তাদের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এ বিষয়ে কুন্ডেরচর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিক বলেন, এ দুর্গম চরে প্রশাসনের লোক আসে না। আমাকেই সামাজিক বিভিন্ন অন্যায়ের বিচার করতে হয়। ওই ছেলে-মেয়ের বিরুদ্ধে অসামাজিক কাজ করার অভিযোগ ছিল। এ ঘটনাটির বিচারও আমি করেছি। ছেলে-মেয়ের অভিবাবককে খবর দেওয়া হয়েছিল তারা উপস্থিত না হওয়াতে তাদের ছাড়াই বিচার করা হয়েছে। স্কুল মাঠে কারা তাদের জুতাপেটা করেছে তা আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, কিশোর-কিশোরীকে নির্যাতনের ভিডিওটি থানায় আসার পরে পুলিশ ওই চরে গিয়েছিল। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিককে আটক করা হয়েছে।

Related posts