November 21, 2018

ভারতের অনীহায় তিস্তা খাঁ খাঁ!

পানির অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে তিস্তা

প্রতিবেশী দুই দেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ক এক অপরের জন্য পরিপূরক। দুই দেশের মতামত ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে সুসম্পর্ক- বন্ধুত্ব। কিন্তু ভারতের ইচ্ছার উপর যেন নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের নদ-নদীর বাঁছামরা ভূত-ভবিষ্যত। আগ বাড়িয়ে ট্রানজিটসহ নানা সুবিধা ভারতকে দেয়া হলেও তিস্তাচুক্তির মূলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে ভারত তিস্তার উজান থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী অভিন্ন নদীগুলোর পানি প্রাপ্যতা দেখভালের জন্য দুই দেশের সমন্বয়ে যৌথ নদীর কমিশন গঠন করা হয়েছে। অথচ প্রায় ৬ বছর ধরে সে কমিশনের বৈঠক হচ্ছে না। ঢাকা কয়েকবার তাগাদা দেয়ার পরেও দিল্লীর অনিহার কারণে এ বৈঠক বসছে না। এর আগে ২০১০ সালের মার্চ মাসে দু’দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকটি হয়েছিল দিল্লীতে। এরপর তিস্তা থেকে লাখ লাখ কিউসেক পানি উঠিয়ে নিয়েছে ভারত। অথচ পানির অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের নদ-নদী। শুষ্ক মৌসুম শুরু আগেই অনেক নদী শুকিয়ে খাঁখাঁ করছে। তাহলে কি আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্র জয় করা বাংলাদেশ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য ভারতের মর্জির ওপর নির্ভর করে থাকবে? বাংলাদেশের পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। বাংলাদেশের কৃষকদের কৃষি কাজের জন্য তিস্তার পানি অপরিহার্য।

সরকার এই পানির জন্য দিল্লীর প্রতি চাপও দিচ্ছে। এমনকি উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দমোদর মোদীকে একাধিকবার তাগিদ দিয়েছেন জেআরসি বৈঠকের। এছাড়াও যৌথ নদী কমিশনের কারিগরী বৈঠকেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জেআরসি’র মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ নিজেও দু’দেশের মধ্যে জেআরসি’র বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে তাগিদ দিয়ে ভারতীয় পানি সম্পদ মন্ত্রীকে চিঠি দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোন সাড়া মেলেনি। এতে করে আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে পানি নিয়ে ভোগান্তি আরও বাড়বে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে ঢাকা যেন দিল্লীর ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছে। এদিকে, আগামী ১ জানুয়ারি থেকেই শুরু হবে শুষ্ক মৌসুম।

এই শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগে যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে এমন ধারণা দিয়েছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। এতে করে এবারের শুষ্ক মৌসুমেও দেশের নদ-নদীগুলোতে তীব্র নাব্যতা সঙ্কট দেখা দেবে- এমন ধারণা পোষণ করছেন দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ইতোমধ্যেই দেশের নদ-নদীগুলোতে নাব্যতা সঙ্কট শুরু হয়ে গেছে। পানির অভাবে প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলোতে বিশাল বিশাল চর জেগে উঠছে। এতে করে নদী অববাহিকার মানুষগুলো পানি নিয়ে ভোগান্তির কবলে পড়েছেন। আগামী জানুয়ারি থেকে মধ্য মে ২০১৬ পর্যন্ত পানি জন্য এই হাহাকার আরও বাড়বে। সবচেয়ে করুণ অবস্থা বিরাজ করবে তিস্তার পানি নিয়ে। গেল শুষ্ক মৌসুমে গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে ভারত এই নদীর পানি এতটাই নিয়ন্ত্রণ করেছিল যে, তিস্তা অববাহিকার আড়াই কোটি মানুষকে তীব্র পানির কষ্টে ভুগতে হয়েছে। সেচের পানি না পাওয়ায় তিস্তা প্রকল্পের হাজার হাজার একর জমি থেকেছিল অনাবাদি। ওই সময় তিস্তায় পানির নাব্যতা কমে সর্বনিম্ন রেকর্ড দাঁড়িয়েছিল ২৫৪ কিউসেক।

আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও করুণ হবে- এমন আশঙ্কাই করছেন তিস্তা অববাহিকার অধিবাসীরা। জানা যায়, শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই তিস্তা নদী ধুঁ ধুঁ বালু চরে পরিণত হয়েছে। এই নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের সাথে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হলেও এর কোন যৌক্তিক সমাধান আজও হচ্ছে না। বরং ভারত রাজি না হওয়ায় জেআরসি এর ৩৮তম বৈঠকটি এখনও ঝুলে আছে। এই বৈঠক কবে বসবে সে ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতেও পারছেন না। সর্বশেষ, ২০১৩ সালের ১৮-১৯ জুন ঢাকায় জেআরসি’র বৈঠক বসার কথা ছিল। ওই সময় ভারতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় ছিল। প্রস্তুতির প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে নয়াদিল্লীর পক্ষ থেকে বৈঠকটি বাতিল করা হয়। কেন এই বৈঠক বাতিল করা হয়েছিল এর বিশেষ কোনো কারণও বাংলাদেশকে জানানো হয়নি।

পরবর্তীতে নরেন্দ্র মোদী সরকারের নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পরদিনই ভারতের পানিসম্পদ ও নদী উন্নয়ন মন্ত্রী উমা ভারতীকে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানো হয়। চলতি বছর ২৪ জুলাই পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এক চিঠির মাধ্যমে এই আমন্ত্রণ জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পানিসম্পদ ও নদী উন্নয়ন মন্ত্রী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বাংলাদেশকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল আপাতত বৈঠকটিতে অংশ নেয়া সম্ভব নয়। জেআরসি’র বৈঠকের নতুন করে কোন দিনক্ষণ পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর আহমেদ খান বলেন, এখন পর্যন্ত ভারতের কোন সাড়া পাইনি। তিনি বলেন, দু’দেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত। সম্ভবত তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে ভারত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি বিধায় জেআরসি’র বৈঠকের ব্যাপারে তারা কোন সাড়া দিচ্ছে না।

তবে তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের সাথে একটি চুক্তিতে উপণিত হওয়ার ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট আশাবাদী বলে জানান। তার মতে, গেল শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বাংলাদেশের জন্য ন্যায়সঙ্গত পরিমাণ পানি ছাড়ার অনুরোধ করে আমরা ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছিলাম। এরপরও আমরা প্রত্যাশিত পানি পাইনি। আশা করছি, আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভোগান্তির কবলে পড়বে না। ভারতের সাথে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনার জন্য ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে যান। সেখানে দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকের পর যৌথ ইশতেহারে উভয় দেশের পানিসম্পদ মন্ত্রীকে মন্ত্রী পর্যায়ে জেআরসির বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর ২০১০ সালের ১৭ থেকে ২০ মার্চ নয়াদিল্লীতে জেআরসির ৩৭তম বৈঠকে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

জেআরসি’র ৩৭তম বৈঠকে বাংলাদেশ সমতা, ন্যায়ানুগতা ও পারস্পরিক ক্ষতি না করার নীতির ভিত্তিতে ১৫ বছরের জন্য তিস্তা নদীর একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া উপস্থাপন করে। অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকেও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে একটি খসড়া উপস্থাপন করা হয়। পরে ২০১১ সালের ৬ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে যৌথ বিবৃতিতে ন্যায়ানুগতা ও সমতার ভিত্তিতে তিস্তা ও ফেনী নদীর অন্তর্বর্তীকালীন পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনে নীতি ও পদ্ধতি প্রণয়নের অগ্রগতিকে স্বাগত জানানো হয়। উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এই চুক্তি সম্পাদনে কার্যক্রম পরিচালনায় নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্দেশনা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা রাজি না হওয়ায় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি। এর মধ্যে তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য ৩৬৬ কিলোমিটার। ভারতের সিকিম হিমবাহ থেকে উৎপন্ন নদীটির ১১৭ কিলোমিটার বাংলাদেশে বাকি ২৪৯ কিলোমিটার ভারতের সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে বয়ে চলেছে।

পানির অভাবে শুষ্ক মৌসুমে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কবলে পড়ে তিস্তা নদী। ভারত গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে নদীর সব পানি একতরফা প্রত্যাহার করে নেয়ায় এখানকার মানুষের এই করুণ দশা। শুষ্ক মৌসুম এলেই তিস্তার বুকজুড়ে জেগে উঠে ধূঁ ধূঁ বালুর চর। পানি না পেয়ে হাহাকার দেখা দেয় এখানকার বোরো চাষীদের মাঝে। অর্থনৈতিকভাবে প্রতিবছর এই ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে শুধু ফসলেরই ক্ষতি হবে ৭শ’ কোটি টাকার ওপরে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গেল শুষ্ক মৌসুমে শুধুমাত্র তিস্তা প্রকল্প এলাকায় যে ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল; তার তিন ভাগের এক ভাগেরও কম জমিতে সেচ দিতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পরিস্থিতি এতটাই করুণ ছিল যে, লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হয়েছিল। তাও আবার রেশনিং পদ্ধতিতে। বাকি ৪৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সেচ বাবদ কৃষকের কাছ থেকে নেয়া অর্থ ওই সময় পাউবো’কে ফেরত দিতে হয়েছিল।

তিস্তার পানি নিয়ে দেশের বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এটাই বাস্তবতা। তার চেয়েও বড় কথা, তিস্তার পানি নিয়ে এখন পর্যন্ত ভারত কোন চুক্তিতে উপণিত হয়নি। বরং গেল শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার সবটুকু পানিই ভারত প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ওইসময় যেটুকু পানি তিস্তায় পাওয়া গেছে, তা গজলডোবা ব্যারেজ থেকে তিস্তা ব্যারেজের মাঝে যে অন্তর্বর্তী অবস্থান (শত কিলোমিটার) সেখানে উৎপন্ন পানি। তিনি বলেন, এই একতরফা পানি প্রত্যাহারের মধ্যে দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করেই চলেছে। আসন্ন শুষ্ক মৌসুমেও যাতে বাংলাদেশকে এই ভোগান্তির কবলে পড়তে না হয়, এ ব্যাপারে সরকারকে আরও সোচ্চার হতে হবে। ইনকিলাব

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts