November 16, 2018

ভারতীয় আগ্রাসী চরিত্র উন্মোচন করলেন পঙ্কজ শরণ

বাংলাদেশে এখন যে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে তা প্রকাশ্যত সরকার ও জনগণের মধ্যে হলেও বেদনা শুরু হয়েছে ভারতীয়দের। সঙ্কটের সূত্রপাত ২০১৪ সালের যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই নির্বাচন মূলত ভারতীয়দের প্রত্যক্ষ মদদে হয়েছিল। বর্তমান সরকার যে তাদেরই সৃষ্ট সেকথাই প্রকারান্তরে স্বীকার করলেন ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনার পঙ্কজ শরন। ঐ নির্বাচনের অন্যতম আর্কিটেক্ট মি. শরন বলেছেন, বাংলাদেশে সংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন জরুরি ছিল। তার মতে, ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বাংলাদেশের ব্যাপারে দেশটির নীতিতে কোন পরিবর্তন আসেনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, সরকারের সাথে সব সময়ে ডিল করে ভারত। তার ভাষায়, যখন যে সরকার থাকে তার সাথেই আমরা ডিল করি। এটাই আমাদের পলিসি। সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক বর্তমান সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করে বলেছেন, দুই দেশের নদীগুলোর পানির ভাগাভাগি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এই সমস্যা সমাধানে সংলাপ প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে অবশ্যই মাঠ পর্যায়ে বাস্তব পরিস্থিতি অনুভব করতে হবে। …উভয় দেশই পানিস্বল্পতায় ভুগছে। বাংলাদেশের চলমান সঙ্কটের একমাত্র সমাধান হলো একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে সবদলের অংশগ্রহণভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিতকরণ। এই সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির কথিত নির্বাচন নিয়ে। এই নির্বাচনকে পঙ্কজ শরন যখন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বলে উল্লেখ করছেন তখন যুক্তরাজ্য সরকার-প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বিতর্কিত এবং এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের বয়কট করা ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই ক্ষমতায় বসে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের কথা বলা হলেও বিশেষজ্ঞের মতে, বড় ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর ভিত্তি করে এটি হয়নি এবং এ কারণে প্রকৃত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এটি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ব্যারোনেস ওয়ার্সি বলেছেন, এটা হতাশাব্যঞ্জক যে, অর্ধেকেরও বেশি আসনের ভোটাররা ব্যালট বাক্সে তাদের মত প্রকাশ করতে পারেনি। অন্যান্য আসনে ভোটাদের অংশগ্রহণের পরিমাণও ছিল সামান্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশ বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণে পুনরায় একটি নির্বাচনের আয়োজন করতে সরকারে প্রতি আহ্বান জানায়। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠেছে সে সমসময়ে খুব কাছাকাছি ব্যবধানে ভারতীয় হাইকমিশনার যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যময়, গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের জ্বলন্ত ইস্যু ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিগত বিষয়ে ভারত ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এক অর্থে ব্যাপারটি নতুন নয়। ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের পর বিষয়টি প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বিষয়টি খোলসা হয়ে গেল। ভারতীয় হাইকমিশনারের বাধ্যবাধকতার তত্ত্ব ও সরকারের বক্তব্য অভিন্ন। এখানে গণতন্ত্রের বাধ্যবাধকতা আর কথিত বাধ্যবাধকতার মধ্যে যে ফারাক সৃষ্টি হয়েছে তার সাথেই যুক্ত রয়েছে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার প্রসঙ্গ। যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের সক্ষতার বিষয়টি কেবলমাত্র একটি নির্বাচনকে নিয়েই করা হয়নি বরং ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পরবর্তী উপজেলা, পৌর ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়েও করা হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, যুক্তরাজ্যের রিপোর্টে দেশের বৃহত্তর জনগণের মনের কথাই বলা হয়েছে। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দসহ সচেতন সবমহলই একমত যে, এই নির্বাচন কমিশন কার্যত সরকারের আজ্ঞাবহে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে কমিশনের ভূমিকা আরো বেশি হাস্যকর হয়েছে। নির্বাচন নিশ্চিত করতে ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট থাকা এবং ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে কোন ভূমিকাই কমিশন গ্রহণ করেনি বা করতে পারেনি। কমিশন ছিল নির্বিকার। যথাযথভাবে নির্বাচন হয়েছে সেটা প্রমাণ করাই যেন তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়েও যখন কথা উঠছে তখন কমিশন থেকে যা কিছু বলা হচ্ছে তা যে প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন নিরপেক্ষ করা বা নির্বাচনের জন্য সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হচ্ছে সে ধরনের প্রমাণ এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। এসব ঘটনা কার্যত প্রমাণ করছে যে, সরকারকে ক্ষমতায় রেখে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
এ কথাই একদিকে যেমনি আন্তর্জাতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে তেমনি দেশের গণতন্ত্রপন্থী দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মনোনয়ন নিয়ে সরকার যত কথাই বলুক তার কর্মকা- প্রমাণ করছে, এই মনোনয়নের পিছনে এমন কোন মহল ছিল যার নির্দেশনা রূপ দেয়াই হয়তো বর্তমান কমিশনের কাজ। একটি আজ্ঞাবহ প্যানেল তৈরির মধ্য দিয়ে কার্যত নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। এটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্যই ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকালে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয়তা যে কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিক নির্বাচনের জন্যই নয় বরং তারচেয়েও আরো বেশি কিছু, সে কথাই চলমান সঙ্কটে প্রকট হয়ে উঠেছে। নির্বাচন পরিচালনার ব্যাপারটি সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা গেলে তার ইতিবাচক ফল দেশের অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে পড়তে বাধ্য। নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে যে যাই বলুক না কেন, আন্তর্জাতিক মহলে তার কোন ভিত্তি থাকে না। এর ফলে আস্থার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়।

বর্তমান বাংলাদেশে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ার দ্বিমুখী প্রভাব রয়েছে। একদিকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আস্থার সঙ্কটে ভুগছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের এই দুর্বলতার সুযোগ ব্যবহার করছে ভারত। প্রকাশ্যত তারা সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে কার্যত তারা বাংলাদেশেকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়ে নিজেদের বাজারে পরিণত করার সবটুকু সুবিধা গ্রহণ করছে। একথার প্রতিধ্বনি ভারতীয় হাইকমিশনারে কথাতেও রয়েছে। তিনি দু’দেশের সম্পর্ককে সর্বোচ্চ পর্যায়ভুক্ত করেছন। অন্যদিকে বাংলাদেশের জীবন-মরণ সমস্যা পানি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এমন একটা ভাব করেছেন যেন ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানেন না। মনে হতে পারে, সাদা মন নিয়েই তিনি আলোচনার কথা বলেছেন। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে তো দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছিল। সমাধান হয়েছে তাতো বলা যাবে না। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যাসহ দু’দেশের যৌথ নদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতীয়দের কোন আগ্রহ রয়েছে এ যাবৎকালে তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের জীবন-মরণ সমস্যা সমাধানে আগ্রহ নেই, অথচ সহযোগিতার সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, একথার অর্থ হচ্ছে ভারত কেবল নিচ্ছে এবং নেবার সহযোগিতার সম্পর্কই সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই যে নেয়ার প্রবণতা এটা কোন সুসম্পর্কের বিষয় নয় বরং আগ্রাসী নীতির অংশ।

ভারতীয় অনৈতিক সমর্থনের জের কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে বা পরিণতি কি হতে পারে তার আভাস বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বলেছেন। তার সাথে আরো বলেছেন, শুধু ভালো নীতি অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য যথেষ্ট নয়। নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী তদারক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটানো দরকার। বিনিয়োগের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও প্রক্রিয়া সহজীকরণ জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। একইসঙ্গে ব্যবসায় নৈতিক মূল্যবোধ থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ অন্যান্য অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি বলে অভিমত প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হলে অর্থ বসে থাকবে না। এ পরিস্থিতিতে অর্থ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলে যাবে। এক দেশের মূলধন অন্য দেশে চলে যাবে। তার বক্তব্যের মধ্যে এক ধরনের হুঁশিয়ারি রয়েছে। প্রকারান্তরে তিনি না বললেও এ কথাই ঠিক যে, বাংলাদেশে অচলাবস্থা বহাল থাকলে তার প্রায় পুরো সুাবধাই ভারত গ্রহণ করবে। এই বাস্তবতাতেই ভারতীয় হাইকমিশনার তথাকথিত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। একদিকে ব্যাংকে অলস পড়ে অছে ১ লাখ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে ৭৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কোন কোন প্রকল্প নিয়ে গালভরা বুলি থাকলেও কার্যত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নেই। অনেক প্রকল্প কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সামগ্রীকভাবে একটি অনিশ্চিত ও অস্থিরতা গেড়ে বসার কারণে দেশে বড় ধরনের কোন ব্যবসা দাঁড়াচ্ছে না।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি সম্প্রতি অর্থ পাচারে যে তথ্য পরিবেশন করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, পাচার হওয়া এই অর্থ বাংলাদেশের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, পল্লী উন্নয়ন, শিল্প ও ভৌত অবকাঠামো খাতের মোট বাজেটের সমান। যে দিক থেকেই দেখা যাক না কেন সত্যি এটাই যে, দেশে বিনিয়োগ বাস্তবতা না থাকার কারণেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। কেন বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছে না বা নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তা নিয়েও নানামাত্রিক আলোচনা রয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এত উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ সম্ভব নয়। ব্যাংকগুলো থেকে প্রকাশ্যে বলা না হলেও এটাই সত্যি যে, সরকারের বিভিন্ন কর্মকা-ে বৈধ-অবৈধ পথে ব্যাংকগুলো থেকে এত পরিমাণ অর্থ চলে যাচ্ছে যা সামাল দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। সে জন্য সুদের হার কমছে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ একটি বড় সমস্যা। অর্থ পাচার হওয়ার বিষয়টিও রীতিমতো উদ্বেগের। এ থেকেও সহজেই অনুমেয়, লোপাটকারীরা দেশে অর্থ রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না। চলমান অবস্থা আঁচ করতে এ কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বহু গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রধান এই খাতটির অবস্থা কার্যত নাজুক। বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যাদের কার্যতই গভীর ভাবনা রয়েছে তাদের সাথে ভারতীয় ভাবনায় যে পার্থক্য রয়েছে সে কথা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের রাজনীতি বিষয়ক পরবর্তী আন্ডার সেক্রেটারি শ্যাননের আলোচনাতেও উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, নিজ দেশেও গণতন্ত্রের যাত্রাপথের কোন শেষ নেই। এ ক্ষেত্রে সবসময় উন্নয়নের সুযোগ থাকে। আমাদের নিজের দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনে সবার অংশ নেয়া উচিত। লোকজনদের মধ্যে এই উপলব্ধি সৃষ্টির জন্য আমাদের বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। যখন আমরা অন্য দেশের গণতন্ত্রের কথা বলি, তখন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এ প্রসঙ্গ তুলি।

কোন নির্দেশ দিই না। …গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাজের সকল শ্রেণীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে খোলামেলা পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সব সুযোগ কাজে লাগানোর দিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমাদের তাগিদ অব্যাহত থাকবে। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম থালেদা জিয়ার সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানেও অনুরূপ আলোচনাই হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিশ্বের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া এবং ভারতীয় বক্তব্য এক তো নয়ই বরং সাংঘর্ষিক। এ থেকে এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান যে, ভারত তার নিজ দেশে গণতন্ত্রের অভ্যাস ঠিক রাখলেও বাইরে বা প্রতিবেশীর সাথে সে সম্পর্ক রাখছে বা রাখা সংগত মনে করছে না, প্রতিবেশীর সাথে যা করছে তা আগ্রাসী প্রবণতারই সাক্ষ্য বহন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রকৃতি বিশ্লেষণে প্রতিবেশী ভারত ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের সুস্পষ্ট পার্থক্য গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় শঙ্কা থাকলেও পুরোপুরি হতাশ হবার কোন কারণ নেই। সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিমালা। সংবিধান মোতাবেক বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্রের মালিক-মোক্তার জনগণ। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের ইচ্ছার এবং অংশগ্রহণের মাধ্যমেই জনগণের অংশিদারিত্ব নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। সে বিবেচনাতে গণতন্ত্রকেই সরকার পরিচালনায় জনগণের অংশিদারিত্ব বলে ধরে নেয়া হয়। গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হয় তারাই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। সংসদই হচ্ছে মত প্রকাশের সর্বোচ্চ ফোরাম। সেই সংসদের নির্বাচনের কোন গ্রহণযোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ভারত তাকে সমর্থন দিয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণ তাদের কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। কার্যত এটাই সত্যি যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের সাবেক কংগ্রেস সরকারের সমর্থনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনার সরকারি পর্যায়ের সম্পর্কের যে কথা বলেছেন সেটিও ভারতের চলমান আচরণে ধোপে টেকে না। ব্যাপারটি যদি এমনই হবে তাহলে নেপালে সঙ্কট কেন? নেপালে সরকার সর্বসম্মতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রনয়নের পর সেখানে ভারতের অঘোষিত অবরোধ কেন? নেপালে ভারতীয় অবরোধের শেষ পরিণতি কোথায় দাঁড়াবে তা নিয়ে নানা শঙ্কা রয়েছে। একথা সবারই জানা, বড় ধরনের ভূমিকম্পের ধকল সামলিয়ে উঠতে পারার আগেই নেপালকে অবরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। এটা অমানবিকও বটে। ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য ধোপে টেকে না এ কারণে যে, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা বলেছেন, হিমালয়ের পাদদেশে বসবাসকারী নেপালী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে উন্নয়নের সব পরিকল্পনা ভারতীয় নিষেধাজ্ঞায় ভেঙে যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, নেপালীদের একটি উন্নত জাতি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা এখন মেঘাচ্ছন্ন। বিদায়ী ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী সম্পর্ক যদি সরকারের সাথে হবে তাহলে বিরোধীদের স্বার্থে ভারত কেন নেপালে অবরোধ করেছে। পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটা নাকি চলবে। সরকারি পর্যায়ে সম্পর্ক থাকলে পাকিস্তানের সাথেও সম্পর্ক ভালো থাকার কথা ছিল। বাস্তবে তাতো নেই। বাংলাদেশেও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভারতীয় সমর্থনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে জনগণকেই অসম্মান করা হয়েছে।

জনগণকে অসম্মান করে কি দেশের সংবিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন সম্ভব? সে বিবেচনায় ভারতীয় হাইকমিশনারের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার বক্তব্য জনগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয় বরং জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। তার এই বক্তব্যের প্রকাশ্য বিরোধিতা খুব বড় করে না হলেও করা হয়েছে। তারচেয়ে বড় কথা, তার এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের জনগণের ঘৃণাই কুড়িয়েছেন। এটাও ঠিক যে, তিনি বা তারা একথা বলতে পারছেন সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণেই।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম /মেহেদি/ডেরি

Related posts