November 20, 2018

বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে ভয়াবহ কেলেঙ্কারি

বেসরকারি হাইস্কুল, কলেজ, মাদরাসা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ বাছাইয়ে ভয়াবহ কেলেঙ্কারি হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, অসংখ্য একক প্রার্থী চার-পাঁচটি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য মনোনীত হয়েছেন। এমনকি ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মনোনীত হয়েছেন এমন একক প্রার্থীর সংখ্যাও অনেক। ময়নসিংহের গফরগাঁও থানায় হাইস্কুল পর্যায়ে ৭৪টি পদের বিপরীতে মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে ৬৭ জনই একাধিক স্কুলের জন্য মনোনীত হয়েছেন। এ নিয়ে সারা দেশে নিবন্ধনধারী লাখ লাখ প্রার্থীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশা বিরাজ করছে।

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ বা এনটিআরএসসিএ সারা দেশের স্কুল কলেজে ১৫ হাজার শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য নিবন্ধনধারী প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করে। গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়। আবেদনে বলা হয়, একজন প্রার্থী যত খুশি স্কুল/কলেজ/মাদরাসায় আবেদন করতে পারবেন। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ১৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন। অপর দিকে আরেকজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ৭০টি প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে আবেদন করেছেন। এতে তার ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতি আবেদনের খরচ ১৮০ টাকা। ৭০টি স্কুলে আবেদন করেও তিনি কোনো স্কুলেই নিয়োগের জন্য মনোনীত হননি। আবার অসংখ্য প্রার্থী ১০-১২টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য মনোনীত হয়েছেন। ৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও নিয়োগ না পাওয়া এ প্রার্থী ক্ষোভের সাথে জানান, যদি সঠিকভাবে বাছাই করা হতো তাহলে অবশ্যই তিনি কোনো-না-কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতেন। তার মতে, বাছাই প্রক্রিয়ায় মহাঘাপলা রয়েছে। আমাদের সাথে মহাপ্রতারণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকার এনটিআরএসসিএকে দায়িত্ব দেয়। সে অনুযায়ী এনটিআরএসসিএ আবেদন গ্রহণ, বাছাই, ফলাফল তৈরি সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য টেলিটকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। গত ৯ অক্টোবর এনটিআরএসসিএ ওয়েবসাইটে ফলাফল প্রকাশ করে। এতে সারা দেশে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগের জন্য মনোনীত প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত ফল দেখে প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে অল্প সময়ে চোখ বুলিয়ে ফলাফলে যে নৈরাজ্য ধরা পড়েছে তা এক কথায় ভয়াবহ। মঙ্গলবার তাতে দেখা যায়, অসংখ্য একক প্রার্থীর নাম চার থেকে পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূন্য পদের বিপরীতে মনোনীত করা হয়েছে। সাত থেকে ১০টি পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অসংখ্য এক শিক্ষক।

চট্টগ্রাম বিভাগের ফলাফলে দেখা যায়, মহসিন আলী নামে একজন প্রার্থী ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছেন। এগুলো হলো আসগর বৌদ্ধ আনাথলি হাইস্কুল, হযরত ইয়াসিন শাহ পাবলিক হাইস্কুল, দাবুয়া হাইস্কুল, হলদিয়া হাইস্কুল, কোতোয়ালি ঘোনা আদর্শ হাইস্কুল, চিকদাইর শাহাদত ফজল যুব হাইস্কুল, উত্তর গুজরা বাইতুল উলুম দাখিল মাদরাসা, ইস্ট গোজরা মোহাম্মদিয়া সিনিয়র মাদরাসা, হজরত রুস্তম শাহ দাখিল মাদরাসা, মোহাম্মদিয়া আদর্শ দাখিল মাদরাসা। ময়মনিসংহের গফরগাঁও থানায় মীম নামে একজন প্রার্থী আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণিত শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ হয়েছেন। এগুলো হলো বখুরা দাখিল মাদরাসা, তালালি হাইস্কুল, সাদুয়া মালেকা দাখিল মাদরসা, পাচুয়া রাবেয়া হাইস্কুল, পাগলা গার্লস হাইস্কুল, হাতেম তাই হাইস্কুল, দিঘিরপাড় জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল, খুরশিদ মহল জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল। এ থানায় কামরুল হাসান নামে আরেকজন প্রার্থী ছয়টি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য মনোনীত হয়েছেন। এগুলো হলো পাগলা আসকর আকন্দ দাখিল মাদরাসা, বখুরা দাখিল মাদরাসা, বারইহাট আঙ্গুরি হুরমতুল্লাহ ফাজিল মাদরাসা, পাচুয়া রাবেয়া হাইস্কুল, শহীদ লে, আতিকুর রহমান হাইস্কুল, ভয়েবপুর দারুল উলুম ফাজিল মাদরাসা।

গফরগাঁও থানার ৭৪ জনের মধ্যে মাত্র সাত জন প্রার্থী একটি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেয়েছেন। বাকি ৬৭ জনের সবাই একাধিক প্রতিষ্ঠানে এমনকি একেকজন চার-পাঁচটি করে প্রতিষ্ঠানের জন্য মনোনীত হয়েছেন। এ ধরনের নৈরাজ্য প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঘটেছে।

বরিশালে বনানী বাড়ই নামে এক প্রার্থী তিনটিতে, নিমেশ বিশ্বাস চারটিতে, তপন চন্দ্র মণ্ডল চারটিতে, মেহেদী হাসান চারটিতে, ইয়াকুব আলী সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মনোনীত হয়েছেন। ঢাকা উত্তর এবং দণি সিটি করপোরেশনের অধীনে ওয়াহিদুল ইসলাম এবং রাসেল হোসেন নামে দুইজন প্রার্থীকে সাতটি করে ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে শিক্ষক হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। এভাবে সব জেলার ফলাফলের তালিকায় দেখা যায় একটু পরপরই একই নাম বারবার আসছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে।

নিয়োগবিধিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট থানার প্রার্থী অগ্রাধিকার পাবেন। যদি আবেদন না পাওয়া যায় তাহলে জেলার যেকোনো থানা থেকে নিয়োগ পাবেন। এভাবে প্রার্থী না থাকার শর্তে বিভাগ এবং জাতীয় পর্যায় থেকে শূন্য পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাই করা হবে।

এনটিআরএসসিএর অধীনে এ পর্যন্ত ১২টি নিবন্ধন পরীক্ষা হয়েছে এবং তাতে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৯৪ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং তারা নিবন্ধনধারী। তাদের মধ্য থেকে আড়াই লাখ প্রার্থী আবেদন করেন।

প্রার্থীরা তীব্র ক্ষোভের সাথে জানান, একজন প্রার্থী যত খুশি আবেদন করতে পারবেন এমন নিয়ম চালু করে এনটিআরএসসিএ বেকার যুবকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রায় সব প্রার্থী ডজনকে ডজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন। প্রতি আবেদনের জন্য তাদের ১৮০ টাকা করে খরচ হয়েছে। এভাবে এনটিআরএসসিএ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ছাড়া নিবন্ধন পরীক্ষার মাধ্যমেও তারা কোটি কোটি টাকা আয় করে চলছে বেকার যুবকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ অনিয়ম দূর করা এবং পরিচালনা পরিষদের ক্ষমতা খর্ব করার জন্য বছর দুই আগে সরকার পিএসসির আদলে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করে সারা দেশে শিক্ষক নিয়োগ করার ঘোষণা দেয়। সে আলোকে সরকার প্রথমবারের মতো এনটিআরএসসিএর মাধ্যমে নিবন্ধনধারীদের মধ্য থেকে শিক্ষক বাছাইয়ের উদ্যোগ নেয়। এনটিআরএসসিএর নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৪ হাজার ৬৬৯টি শূন্য পদের বিপরীতে চাহিদা পাঠানো হয় এনটিআরএসসিএর কাছে। গত জুন মাসে সার্কুলার জারির পর নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে সারা দেশে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৫০২ জন প্রার্থী আবেদন করেন। যত খুশি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার সুযোগ রাখার ফলে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ১৮৭টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাইয়ের পর গত ৯ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ১২ হাজার ৬১৯ জন শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেন।

হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি আবেদনে ১৮০ টাকা করে ফি হিসেবে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ১৮৭টি আবেদনে এনটিআরএসসিএ ২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আদায় করেছে। প্রকাশিত ফলাফলের অনিয়ম দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়া অনেক প্রার্থী জানান, বেকার যুবকদের কাছ থেকে এভাবে টাকা আদায় করা একটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিবার নিবন্ধন পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এনটিআরএসসিএ এভাবে টাকা আদায় করে; কিন্তু নিয়োগের কোনো বালাই নেই। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নিয়োগ বাছাইয়ের জন্যও তারা এভাবে টাকা আদায় করল এবং যে ফল প্রকাশ করল তা খুবই দুঃখজনক।

এ দিকে বিভিন্ন অনিয়ম বিষয়ে জানার জন্য এনটিআরএসসিএ চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যের কাছে বারবার ফোন করা হলেও কেউ ফোন ধরেননি।

Related posts