March 23, 2019

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়েও আবারও প্রশ্ন ?

দেশের ২৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই গবেষণার জন্য ন্যুনতম কোনো বরাদ্দ নেই। বাকি ৫৩ বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র বরাদ্দ থাকলেও সে অর্থে কার্যকর কোনো গবেষনা হচ্ছে না। এমনকি এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মান নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন নাজুক চিত্র উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে। দুই সপ্তাহ আগে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করে ইউজিসি। প্রতিবেদনটি সংবাদ সম্মেলন করে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইউজিসির এই প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের উচ্চশিক্ষার সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে গবেষনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু ছিল। এর মধ্যে ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ রাখেই না। এ গবেষণা না রাখার পিছনে বেসরকারিগুলোতে অর্থসংক্রান্ত আইনের দুর্বলতাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সার্বিকভাবে ২০১৪ সালে গবেষণা খাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যয় ২০১৩ সালের তুলনায় বেড়েছে। ২০১৩ সালে গবেষণায় যেখানে ব্যয় ছিল ৫৮ কোটি টাকা, তা ২০১৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ একাই ব্যয় করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ৩৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ কে আজাদ চৌধুরী পূর্বপশ্চিমকে বলেন, গবেষণা ছাড়া মান ধরে রাখা খুব কঠিন। কিন্তু গবেষণার জন্য যে টাকা দরকার, সেটা কেউ শোনে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা যদি না শোনে এখানে মঞ্জুরি কমিশনের কী করার আছে?তিনি আরও বলেন, ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয়। তবে দুর্ণীতির মাধ্যমে লাভজনক হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

এ কে আজাদ বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চাপ প্রয়োগ করা যায় না অর্থসংক্রান্ত আইনের কারণে। আর এ নিয়ে সংসদে একটি আইন পাস করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হলে এমপিদের তোপের মুখে কয়েকবার বাদ পড়েছে।’

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৮৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রয়েছে। ২০১৪ সালে চালু ছিল ৮০টি। এর মধ্যে ২৭টি, অর্থাৎ মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দই রাখেনি। ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো গবেষণা প্রকল্পই ছিল না। এ সময়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই কোনো প্রকাশনা বা সাময়িকী প্রকাশ করেনি। এমনকি বিভিন্ন খাতে মোট বরাদ্দের মাত্র অর্ধেক ব্যয় করেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

প্রতিবেদনে মাত্র ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ইউজিসি। এগুলো হলো- ব্র্যাক, ইন্ডিপেনডেন্ট, স্টামফোর্ড, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এআইইউবি) ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস অব বাংলাদেশ (ইউল্যাব)।

গবেষণায় যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বরাদ্দই ছিল না, সেগুলো হলো- সিটি ইউনিভাসিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, রয়েল ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, পিপলস ইউনিভার্সিটি, চট্রগ্রামের বিজিসি ট্রাস্ট, অতীশ দীপঙ্কর, দারুল ইহসান, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জের ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ফেনী ইউনিভার্সিটি, ব্রিটিনিয়া ইউনিভার্সিটি, চিটাগাং ইন্ডিপেনডেন্ট, নটরডেম, টাইমস, নর্থবেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল, রাজশাহীর ইউআইটিএস, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল, রণদা প্রসাদ সাহা ইউনিভার্সিটি, জার্মান ইউনিভার্সিটি, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি এবং সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে (২০১০) প্রতিবছর গবেষণা খাতে ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।। আইনে সনদ পাওয়ার শর্তাবলীতে বলা আছে, ‘সাময়িক অনুমতিপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর একটি হলো (৯ এর ৬ ধারা) বার্ষিক বাজেটের ব্যয় খাতে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত একটি অংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দ রেখে তা ব্যয় করতে হবে।’

প্রতিবেদনে দেখা যায়, এমন অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো গবেষণা খাতে নিজেদের ব্যয় দেখিয়েছে। কিন্তু কোনো গবেষণা প্রকল্প ওই বছর পরিচালিত হয়নি।

এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা মাস্টার্সে যে থিসিস করেন, সেসবকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘গবেষণা’ হিসেবে দেখায়।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মানেই হচ্ছে জ্ঞান সৃষ্টি করা। সেখানে গবেষণা না করে জ্ঞান সৃষ্টি সম্ভব নয়। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথেষ্ট টাকা থাকার পরও গবেষণায় ব্যয় না করা দুঃখজনক।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা নেই বললেই চলে। এসব আমরা আগে থেকেই জানতাম, ইউজিসি বিষয়টা পরিস্কার করল মাত্র। এখন যদি তারা এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে তবেই মঙ্গলজনক কিছু সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘গবেষণা ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় চিন্তাই করা যায় না। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে না পারলে প্রাইমারি, মাধ্যমিক স্কুলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো তফাৎ থাকে না।
দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/মেহেদি/ডেরি

Related posts