November 17, 2018

বৃষ্টির রাতের মোহিনী

zz

(সেলিনা জাহান প্রিয়ার গল্প):  রাত এক টা একটু পরে ট্রেন থেকে নামলো ড্যানিয়েল কিশোর গঞ্জ রেল স্টেশন এ ।

চিটাগং মেইল ট্রেন থেকে নেমেই হাত ঘড়ি টা চেয়ে দেখল । অনেক রাত ।চায়ের দোকান থেকে একটা রং চা খেয়ে নিল । হাতের ব্যাগটা কাঁদে নিয়ে আকাশটা টা একবার দেখল। অনেক মেঘ করা । একটা রিক্সা কে বলল-
—– কি ভাই যাবেন
—– স্যার কই যাইবাইন ?
—– জঞ্জল বাড়ি !!
—- স্যার যাইবাম ।
—– কত নিবে ?
—– দেলাইন যে সাব । রাইতের বেলা । রাস্তা টা ভাল না । চোর ডাকাত আছে । তাই বলি সাব সকালে গেলে ভাল হয় ।
—– আরে আমার কাছে পিস্তল আছে ?
—— কন কি সাব ??? মাইরাইলছুইন !!!
—–কেন ?
—– এমন জিনিস থাকলে ভুত পেরত ও ভয় ফাইবো ।
—–আরে তুমি যাব কিনা বল ?
—– স্যার আল্লাহ্‌ রাসুলের নাম নিয়ে উইঠা পরইন ।
ড্যানিয়েল রিক্সা উঠে । পাশের হোটেল থেকে এক বোতল পানি কিনে নেয় ।
দিক্সা চলেতে থাকে । রিক্সা চালকের বয়স পঞ্চাশের উপরে হবে । এক রামপুর পার হবার – একটা বিড়িতে আগুন ধরায় রিক্সা চালক । মনের সুখে একটা গান ধরে । গানটা অনেক পরানো ছবির । ড্যানিয়েল আর কিছু বলে না। মনে হয় কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে । তাই খুব ঠাণ্ডা বাতাস আসছে । আকাশ একদম কালো । ড্যানিয়েল বলল কত সময় লাগবে বলতে পারেন চাচা ?
—– কিতা যে কইন । বিড়ির দম দেয়া শেষ হলে এক ঘণ্টা লাগবো ।
বৃষ্টি শুরু হয় তখন বউলাই বাজার পার হয়ে একদম খোলা ময়দান । চার পাশে শুধু ধানের জমি । মাঝ খান দিয়ে একটা রাস্তা । হালকা বৃষ্টি হচ্ছে রিক্সা টা একটু একটু করে সামনে যাচ্ছে । শিমুল তলার একটু আগে একটা জায়গা । অনেক আগে বাড়ি ছিল এখন আর বাড়ি নাই । কিন্তু ঐ জায়গায় এসে রিক্সার চালক বলল সাব এই বাড়িতে একটু দাড়াই ।
—- আরে এই খানে তো কোন বাড়ি ছিল না।
—- সাব এরা নতুন আইছে । এই বাড়িটা কিনেছে ।
—- ও আচ্ছা ! তাহলে ভাল । বৃষ্টি খুব বেড়েছে । ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি পড়ছে ।
ড্যানিয়েল একটা দৌড় দিয়ে গিয়ে পুকুর পার হয়ে বাড়িটার বারান্দায় দাঁড়ালো ।জানালা খোলা । একটা হারিকেনের আলো জালানো । রিক্সা চালক বলল সাব আমি গাড়ির কাছে যাই । না হয় চোরে নিয়া যাইব । আপনি বৃষ্টি কমলে চলে আইসেন । বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে চলে গেল । ড্যানিয়েল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে । খুব বৃষ্টি হচ্ছে । মাঝে মাঝে বিজলী চমকাচ্ছে । ড্যানিয়েল দাঁড়িয়ে
আছে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভাগ্য ভাল যে জানালা দিয়ে কিছুটা আলো আসছে । না হয় তো সে রিক্সার চালক কে যেতে দিত না। বাতাস শুরু হল । এমন সময় বারান্দার দরজা টা খুলে একজন হাতে হারিকেন নিয়ে বের হল ।
—- ড্যানিয়েল মুখের সামনে হারিকেন ধরল । কে আপনি ?
—-ড্যানিয়েল দেখল একটা অপূর্ব সুন্দর মেয়ে । সাদা লাল সুতির শাড়ি পরা । মাথায় অনেক লম্বা শাড়ির আঁচল টানা । জি আমি ড্যানিয়েল । জঙ্গল বাড়ি যাব । বৃষ্টির জন্য একটু দাঁড়ালাম । বৃষ্টি থামলে চলে যাব ।
—- ও আচ্ছা ঘরে আসুন ।
—- আমি মুসলিম ?
—- তাতে কি আমি হিন্দু বলে কি মানুষ না ?
—- আসলে তা না। অনেক হিন্দু বাড়িতে তো তাদের ঘরে যেতে দেয় না।
—- তা ঠিক কিন্তু আপনি ঘরে আসুন । মেহমান অনেক রাত । ঠাণ্ডা বাতাস । বৃষ্টির
ছিটা ছিটা পানিতে তো আপনার জ্বর চলে আসবে । আর তো বলা চলে
ভুজে গেছেন ।
—- ড্যানিয়েল কিছুটা অবাক হল । এত রাত একটা এত সুন্দর মেয়ে । আর এত
মিষ্টি করে কথা বলছে । তার কথা রাখার জন্য সে ঘরে প্রবেশ করল । অবাক
হয়ে দেখছে সব কিছু খুব পুরাতন আমলের ।এমন কি চেয়ার টা পর্যন্ত । একটা
গোল টেবিল । অনেক কয়টা মোম জলছে ।ড্যানিয়েল বসল একটা চেয়ারে ।
—- কি দেখছেন মিঃ ড্যানিয়েল !
—- বাহির থেকে বুঝা যায় না। বাড়ির ভিতর টা এত সুন্দর । আচ্চা আর কে কে
আছে । এই বাড়িতে ।
—- মেয়েটা একটু হেসে বলল । বাড়িতে অনেক মানুষ তবে এই ঘর টা আমার ।
—- অহ আচ্ছা ! বেশ সুন্দর আপনার ঘর । এই গ্রামে এত সুন্দর বাড়ি আছে আমার
জানা ছিল না।
—- নিল এই কাপড় দিয়ে মাথাটা মুছে নেন । না হয় জ্বর চলে আসবে ।
ড্যানিয়েল খুব ভাল করে মেয়েটা কে দেখছে । খুব অবাক তার পায়ে আলতা দেয়া। সাদা পায়ে আলতা !! বা খুব সুন্দর । মেয়েটার হাতে অনেক চুড়ি আর গলায় অনেক মালা । হাতের আংটি গুলি দেখার মত । এক পাত্র পানি নিয়ে বলল নিন একটু জল পান করে নিল । মনের ক্লান্তি দূর হবে। ড্যানিয়েল পানি টা হাতে নিল । একটু হাতের ছুয়া লাগলো ড্যানিয়েল বুঝতে পারলো একদম শীতল হাতের ছুয়া । মেয়েটা বলল বেশ বৃষ্টি হচ্ছে । এমন বৃষ্টি আমার খুব পছন্দ । আপনার কি পছন্দ ?
—– হ্যাঁ একটু একটু ।।
—- বেশ ভাল । অনেক টা পথ চলে চলে আসছিলেন । আর একটু পরে বৃষ্টি হলে আর দেখা হত না আপনার সাথে । গান শুনবেন ।।
—- গান কি ভাবে বিদ্যুৎ তো নাই ।
—– কলের গান । বিদ্যুৎ লাগে না। একটা হাতে গুরিয়ে দিতে হয় ।
—— ভালই তো বৃষ্টির রাত । একা একটা মেয়ে একা একটা ছেলে । কেউ কাউকে চিনে না।
—— মেয়েটি হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ করে হেসে উঠল । বলল বা চমৎকার করে কথা বলেন ?
—— আচ্ছা আপনার নাম জানা হল না।?
—— আমি মোহিনী রানী পাল ।
—— হ্যাঁ এটার নাম তো পাল পারা ।
—– যাই হউক খুব ভাল মনের মানুষ আপনি মোহিনী ।।
—— আসলে আমি ভাল এই জন্য যে আপনি ভাল ।
—– দাঁড়ান কলের গান বাজাই । খুব সুন্দর কলের গান ।ড্যানিয়েল জীবনে এই
প্রথম এই কলের গান দিয়ে গান শুনছে । কিন্তু অল্প বেজে বন্ধ হয়ে গেল ।
মোহিনী বলল আপানার কপাল ভাল না । মাঝে মাঝে চলে । এবার চলে না। যাই হউক একটু বসুন চা বানিয়ে দেই ।
—- না না এত রাতে চা লাগবে না।
—- আপনার কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না।
—– না ! বৃষ্টি তো বাড়ছে আর বাড়ছে । যাব কি ভাবে ভাবছি ।
—– কেন যেতেই হবে ? কেউ অপেক্ষা করছে কি ? আচ্ছা আপনি কার ছেলে ?
—–আমি কি আপনাকে শুধু মোহিনী ডাকতে পারি ।
—– ঠিক আছে তবে আমি আপনাকে ড্যানিয়েল ডাকব না। আমি আপনাকে রাজ
বলে ডাকতে চাই । আপনি জঙ্গল বাড়ির ছেলে ? তাই
—– আরে আমার ডাক নাম রাজ । ড্যানিয়েল মা মা ডাকে । মা তো অন্য ধর্মের
তাই ।
—– মানে রাজ সাহেব
—– মা খ্রিস্টান ।
—– অহ ! দারুন । জানেন রাজ আমার বৃষ্টি হলে পুকুরে সাতার কাটতে ইচ্ছা হয়।
কিন্তু একা একা যেতে ভয় লাগে ।
—– যাবেন নাকি ।
—– হ্যাঁ যাব । আপনি যদি হারিকেন আর ছাতা নিয়ে দাঁড়ান ।
—– সত্য যাবেন । তাহলে ছাতা নিয়ে আসুন । আপনি আমার এত উপকার করলেন
আমি না হয় একটু করি ।
—–দারুন রাজ সাহেব । আমি ছাতা নিয়ে আসছি ।
মোহিনী ছাতা নিয়ে আর হারিকেন নিয়ে আসে । ড্যানিয়েল তাকে নিয়ে পুকুর পারে যায় । সব গয়না নিয়ে মোহিনী পানিতে নেমে যায় । হালকা আলো । মাঝে মাঝে বিজলী চমকায় । মেয়েটা সারা পুকুরে মনের সুখে সাতার কাটে । একা একা হাসে  পুকুর মাঝ থেকে এটা লাল শাপলা তুলে আনে । বলে এটা আপনার জন্য । চাইলে আপনি নামতে পারেন পুকুরে । তবে ঘরে আপনার পড়ার মত কাপড় নাই । হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ । ড্যানিয়েল বলল ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই । আচ্ছা আপনি হারিকেন নিয়ে ঘরে যান । আমি ভিজা শরীরে আপনার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে পারব না। আপনি আগে ঘরে যান । আমি আসছি পিছনের দরজা খুলা আছে । ঠিক আছে মোহিনী আপনি
আসুন আমি যাই । ড্যানিয়েল এবার ঘরে আসে । কিছু অল্প সময়ে একটা নীল শাড়ি পরে সামনে আসে মোহিনী । বাহ খুব সুন্দর লাগছে
আপনাকে ।
—— আসলে ভাবতে পারি নাই আজ জলে নেমে স্নান করতে পারব ।
—– কেন । একা একা ভয় পান ।
—— দেখুন আমার কোন ভয় নেই । ভয় থাকলে কি আপনাকে ঘরে আসতে
দেই ।
—- টা সত্য বলেছেন । আপনি এত রাতে পুকুরে নামতে পারেন । আমি ভাবতেই পারি
নাই ।
—- আপনি একটু বসুন আমি একটু আসছি ।
—– কোথায় যাবেন ।
—- পাশের ঘরে ।
—- আচ্ছা যান ।
—- আপনার গলায় এটা কি ? মোহিনী ।
—– এটা একটা ফুলের মালা ।
—– এত রাতে ফুলের মালা ।
—– বেলির মালা সন্ধ্যায় গেথে ছিলাম ।
—– মোহিনী আপনাকে এই মালায় নীল শাড়ি খুব সুন্দর লাগছে ।
—— আলতা পড়াতে পারেন পায়ে ।
—– না তো ।
—– আচ্ছা নিয়ে আসছি । একবার দেখালে পারবেন ।
—- ঠিক নিয়ে আসুন দেখি ।
ড্যানিয়েল মোহিনী কে আলতা পড়াতে লাগলো । মোহিনী পা থেকে কাপড় একটু উপরে তুলতে চাইলে ড্যানিয়েল তার চোখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় । বলে কাপড় সরাতে হবে না। আপনার কাপড়ে আলতা লাগবে না। বাহ দারুন করে আলতা দিলেন তো । মনে হয় অব্যাস হয়ে আছে ।
—- না কোন অব্যাস নাই । তবে মোহিনী আপনার ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে ।
—-আপনি অনেক ভাল এই শাপলা ফুল টা ব্যাগে রাখুন । আবার না ভুলে যান ।
—– না ভুলার মত না। জিবনে সব কিছু ভিলা যায় না। আপনি অনেক সুন্দর করে
হাসেন মোহিনী । আপনার হাসির মাঝে একটা মায়া আছে ।
—— আচ্ছা আমি আপনাকে রাজ ডাকলাম কেন জানতে চাইলেন না।
—— আমি খুব অবাক হয়েছিলাম আপনি আমার বাবার নাম ধরে ডেকেছেন ।
—— আপনার বাবা আপনাকে কি এই নামে ডাকে ?
—— হ্যাঁ বাবা আমাকে এই নামে ডাকে । বাবার নাকি এক দাদা ছিল খুব সুন্দর
তাকে সবাই ছোট রাজা ডাকত !! বাবা রাজা না রেখে ! রেখেছে রাজ ।।
—— আপনি সত্য একজন রাজ । আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না ?
—— জানি না । হয়ত বা হতে পারি ?
আমি একটা জিনিস দেখতে চাই যদি আপনি দেখুন । তবে এই টা দেখার পর আপনি আমাকে আর আপনি করে বলবেন না।
—– কি এমন জিনিস আমাকে দেখান তো । যা দেখার পর আমি আর আপনাকে  আপনি না বলে তুমি বলব ? তাহলে দেখান !!!! দেখি ?
মোহিনী একটা হেসে বলল দেখুন বৃষ্টি কিন্তু থামার নাম নাই । তবে আমি আজ যা  দেখাব আপনি কিন্তু আমাকে বলতে পারবেন না। এই সব আমি কোথায় পেলাম । মোহিনী পাশের ঘরে যায় । একটা অনেক বিনের পুরাতন ব্রিফকেস নিয়ে আসে ।  একটা কাপড় দিয়ে উপরের ময়লা গুলো পরিষ্কার করে । এবার ভিতর থেকে কিছু ছবি বের করে ড্যানিয়েল হাতে দেয় ।  ড্যানিয়েল অবাক চোখে চেয়ে দেখে সব গুলো ছবি তার । একটা একটা করে ছবি দেখতে থাকে । এক সময় বলে আরে এই ছবির মানুষ আর আমি তো একেই ব্যক্তি মনে
হচ্ছে । কিন্তু আমি সময় সাদা কালো ছবি তুলি নাই । অবাক না হয়ে পারলাম না। মানুষের সাথে মানুষের এত মিল কি করে হয় । আপনি মোহিনী সত্যি আমাকে অবাক করে দিলেন । মোহিনীর চোখে পানি ঝর ঝর করে পড়ছে । নীল শাড়ীর আঁচলে মোহিনী তার চোখ মুছে যাচ্ছে । ড্যানিয়েল বলে এই গুলো কার ছবি ?
——–মোহিনী বলে আমাকে একবার তুমি করে বল । তখন বলছি এই গুলো কার
ছবি ?
—– রাজ একটু হেসে বলল আচ্ছা তুমি বল তো এই গুলি কার ছবি ।
মোহিনী বলল এই গুলো সব রাজের ছবি । যেই রাজ কে আমি ভালবাসতাম । আমার জীবনের চেয়ে বেশি । আমি আজো রাজ কে ভালবাসি । রাজের জন্য তাই এই আলো জ্বেলে অপেক্ষা করি । আমি জানি কোন এক দিন রাজ এমন বৃষ্টির দিনে আসবে ।  রাজ আমাকে বলে গেছে তাদের বাড়িতে নাকি বর্ষা কালে অনেক রজনীগন্ধা ফুল ফুটে।  আমার জন্য সে সেই রজনী গন্ধা ফুল নিয়ে আসবে । আমরা এমন বৃষ্টির দিনে এই লাল শাপলা পুকুরে এক সাথে সাতার কাটব । আমি জানি রাজ আসবে আমি তাই রাজের জন্য অপেক্ষা করি ।ড্যানিয়েল বলল মোহিনী তুমি কান্না কর না। রাজ যদি তোমাকে ভালবেসে থাকে তবে তাকে আসতে হবেই । এমন করে কোন মেয়ে অপেক্ষা করলে সে না এসে পারবে না।আমি তোমার ভাল বাসা কে অনেক সম্মান করি মোহিনী।
———- আমি তোমাকে রাজ মনে করেছিলাম । ভাবলাম তুমি আমার সাথে অভিনয় করছ । তাই পুকুরে গেলাম । তুমি পুকুরে নামলে না। আমার রাজ হলে
সে আমার সাথে এই পুকুরে নেমে যেত । আমি আর রাজ সারা রাত পুকুরে
সাতার কাটতাম । রাজ খুব সুন্দর করে আমাকে বলত । এই পুকুর তুমি
আর আমি আর ঐ লাল শাপলা যেন একটা উপন্যাস । রাজ বৃষ্টি থেমে গেছে ।
তোমার যাওয়া দরকার । একটু পরে ভোর হবে । আমি চাই ভোর হবার
আগেই তুমি চলে যাও । কেউ যখন দেখে নাই । তাহলে না দেখাই ভাল ।
একটা ছবি আমি তোমাকে দিলাম । দেখ তো এই মানুষটা তুমি কি না।
যদি তুমি হও । আর বৃষ্টি নামে ঝুম ঝুম তবে চলে এসো এই পুকুর পারে
আমি দাঁড়িয়ে থাকব তোমার জন্য ।
—— আচ্ছা মোহিনী ছবিটা দাও। বৃষ্টি নাই । অনেক ভাল লাগলো তোমার সাথে
পরিচয় হয়ে । যদি সময় পাই যাওয়ার সময় দেখা করে যাব ।
—— আচ্ছা তুমি চাইলে ই দেখা হবে ।
মোহিনী একটা হারিকেন বাতি হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয় ড্যানিয়েল কে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসে । ড্যানিয়েল দেখে রিক্সা টা নাই । ভাল করে আস পাশ দেখে ।  মোহিনী বলে হয়ত চলে গেছে । অনেক বৃষ্টি টা ছাড়া একা একা রাস্তায় তাই ।
—– তাই বলে ভাড়া নিবে না।
—– আবার দেখা হলে দিয়ে দিও ।একটা সামনে শিমুল তলা । ৫ মিনিটের পথ ।
তুমি যাও । আমি হারিকেন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি ।
—– মোহিনী তুমি অনেক ভাল । কিন্তু তোমার শাড়ি পড়া চোখের কাজল হাতের
চুড়ি , গলার মালা । পায়ের আলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে ।
—– রাজ এই মোহিনী তোমার জন্য অপেক্ষা করছে , যদি মনে পরে তবে চলে
এসো ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে ।
—- আমি যাই মোহিনী । তুমি ঘরে যাও ।
—– না আমি ঘরে যাব না। যতক্ষণ দেখা যায় আমি তোমাকে দেখব ।
—— এই যাওয়ার সময় তুমি করে বলে আরও মায়া লাগিয়ে দিলে ।
ড্যানিয়েল পাকা রাস্তা ধরে হাটতে থাকে । অনেক দূরে যেয়ে পিছন ফিরে দেখে
আলো টা এখনো আছে । এক সময় আর আলো দেখা যায় না। মসজিদ থেকে আজানের মিষ্টি সুর ভেসে আসে ।  ড্যানিয়েল হাটতে হাটতে নিজ বাড়িতে চলে আসে । ড্যানিয়েল মা দরজা খুলে দেয়।  ড্যানিয়েল একটা লম্বা ঘুম দেয় ।
দুপুরে ড্যানিয়েল মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে । মা আর একটু ঘুমাই ।
—– না আর ঘুমাতে হবে না । কোন গাড়িতে আসছ । এত সকালে তো কোন
গাড়ি থাকার কথা না।
—- মা রাতের ট্রেনে আসছি । রাত একটায় ট্রেন থেকে নামি রিক্সা নেই । পথে অনেক
বৃষ্টি । পরে পাল পারা একটা বাড়িতে যাই । বেটা রিক্সা ওয়ালা আমাকে ঐ
বাড়িতে রেখে চলে যায় । বৃষ্টি থামার পর আর দেখি রিক্সা নাই । হেঁটেই
চলে আসি । ড্যানিয়েল মা অবাক হয়ে বলে- পাল পাড়া তো কোন বাড়ি ঘর নাই ? ঐ খানে কার বাড়িতে উঠলি ।
—— মা কার বাড়ি জানি না । তবে মেয়েটার নাম মোহিনী ।
—– কি যে বলিস কিছুই বুঝি না? পাল পাড়া না কই উঠেছিলি কে না ?
—– মা পাল পাড়ায় উঠেছি ।
—– আচ্ছা যা । এখন কিছু খাবি । হাত মুখ ধুয়ে আয় । ড্যানিয়েল বাবা বলে
পাল পাড়া তো কেউ নাই । সেতু অনেক বছর আগে তারা ভারতে চলে যায় ।
—– আব্বু আমি বিকালে যাব ঐ বাড়িতে । কারন বাড়িটা পাল পাড়া না অন্য
জায়গা দেখে আসব । ড্যানিয়েল বিকেল তার বন্ধু আনোয়ার কে নিয়ে মটর
সাইকেল নিয়ে যায় ঐ জায়গায় । একি দেখছি কোন ঘর বাড়ি নাই ।
—- আনোয়ার বলে তোর কই মাথা নষ্ট হয়েছে । এই জায়গায় আমি জন্মের পর থেকে কোন বাড়ি ঘর দেখি নাই । শুনেছি পাক ভারত ভাগ হবার পরে এরা ভারত চলে যায় । ড্যানিয়েল ভাল করে দেখতে লাগলো ।  গাছ ঠিক আছে । পুকুর ঠিক আছে । লাল শাপলা ঠিক আছে । ড্যানিয়েল বলল আনোয়ার বিশ্বাস কর এই জায়গায় একটা বিশাল বাড়ি আমি দেখেছি ।
—— পাগলের মতো কথা বলিস না !! আমি কোন দিন এই খানে আসি না। সবাই বলে
এই জায়গা টা ভাল না। চল যাই । আনোয়ার ড্যানিয়েল কে নিয়ে চলে আসে।
বাড়িতে এসেই এক দৌড়ে ড্যানিয়েল ঘরে যায় । তার ব্যাগটা খুলে । কি অবাক
করা বিষয় লাল শাপলা তো ব্যাগের মধ্যে । ড্যানিয়েল মা বলে কি রে শাপলা কেন তোর ব্যাগে । ড্যানিয়েল বলে মা এদিকে এসো তো । ড্যানিয়েল ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করে মাকে দেয় ।ড্যানিয়েল মা ছবিটা হাতে নিয়ে বলে এটা তো তোমার ছবি । তা সাদা কালো কেন ? মা আব্বু কোথায় ? দেখ পাশের
ঘরে হয়ত । ড্যানিয়েল তার বাবা কে বলে – বাবা এই ছবিটা কে ?
—- ছবিটা টা হাত নিয়ে ভাল করে দেখে । কোথায় পেলে এই ছবি ? এই টা তো আমার ছোট চাচার ছবি । একদম তোমার মত ছিল দেখতে ।
—–আব্বু আমি ছোট দাদার বিষয় জানতে চাই ।
—– বাবা সেই পুরাতন কথা জেনে কি হবে ?
—– আব্বু আমার জানতে হবে ?
—– আমি সব জানি না বাবা !! তুমি এক কাজ কর তোমার ছোট দাদার এক বন্ধু আছে পাশের গ্রামে । তার কাছে যাও । অনেক বয়স্ক মানুষ এখন মনে হয়
৯০ বছর বয়স । সে সব জানে । একদিন আমাকে বলেছিল তোমার চাচার গল্প
তোমার ছেলে কে বলব ।। ড্যানিয়েল পাশের গ্রামে আসে । খুজে পায় তার ছোট দাদার বন্ধু কে । অনেক বয়স মানুষটার কানে কম শুনে । ড্যানিয়েল তার ছোট দাদার ছবিটা তার হাতে দেয় । ছবিটা দিকে চশমা পরে চায় । ছবিটায় হাত  দিয়ে কাদতে থাকে ।  ড্যানিয়েলের মুখটায় হাত দিয়ে বলে তুমি কে গো ? আমি ড্যানিয়েল জঙ্গল বাড়ি সাহেব বাড়ির ছেলে আমি। বয়স্ক মানুষটি বলে তুমি কি রাজা সাহেবের নাতি ।
——— হ্যাঁ দাদা ।
———- খুব ভাল । তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল রাজা সাহেব এলো বুঝি ।
ঠিক তোমার মত ছিল। আমাকে খুব ভালবাসত রাজা সাহেব । আমার
চেয়ে বয়সে বড় হলেও আমাকে বন্ধুর মত দেখত ।
——— আচ্ছা দাদা আমাকে পাল পাড়া আর রাজা সাহেবের কোন কথা থাকলে
একটু বলবেন ।
——– সে তো অনেক পুরান কথা নাতি । আচ্ছা বস বলছি । রাজা সাহেব খুব ঘোড়া দৌড়াতে পছন্দ করতেন । একদিন ঘোড়া নিয়ে পাল পাড়া যায় । পালদের এক
মেয়ে । খুবেই সুন্দর । রাজা সাহেবের সাথে তার ভাব হয়ে যায় । রাজা সাব প্রায় রাতে ঘোড়া নিয়ে সেই মেয়ের সাথে দেখা করতেন । রাতের রাত সেই মেয়ের সাথে কথা বলে কাঁটিয়ে দিতেন । রাজ সাহেব কলকাতা লিখা পড়া করতেন । বাড়িতে এসেই চলে যেত সেই মেয়ের কাছে । মেয়েটির নাম ছিল মোহিনী । একদিন রাজা সাহেবের বাবা জমিদার দেওয়ান সাহেবের নিকট বিষয় জানাজানি হয়ে যায় । তখন এই তল্লাটে রাজা সাবের বাপের ধমকে বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খেত ।  দেওয়ান সাব কিছুতেই বিষয়টা মেনে নিতে পারে না। রাজা সাহেব কে জুড়করে বিয়ে করান ভাঁটি অঞ্চলের জমিদারের মেয়ে । রাজা মশাই বাসর ঘরে সেই বউ রেখে তার প্রিয় ঘোড়া নিয়ে বেড়িয়ে পরে মোহিনীর সাথে দেখে করতে । মোহিনী পুকুর পারে দাঁড়িয়ে রাজা মসাইর জন্য অপেক্ষা করে । তখন রাত মনে হয় প্ সাহেব তার লাঠিয়াল বাহিনী পাঠায় । রাজা সাহেব কে সেই রাতে ধরে নিয়ে আসে ।  দেওয়ান সাহেব পালদের সব ঘর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় ।  মোহিনীকে দেওয়ান সাহেবের সামনে হাজির করা হয় মোহিনীদের পুকুর পারে । তারপর মোহিনীকে হাত পা বেঁধে সেই পুকুরে ফেলা দেয়া হয় । পাল পাড়া জুরে শুরু হয় কান্না । কিছু দিন পর দেশ ভাগ হয়ে যায় । অন্য সব পালরা তখন ভারত চলে যায় । ঐ বাড়িটা তার পর থেকে খালি পরে আছে আজ পর্যন্ত । আমি আগে যেতাম পুকুর পারে বসতাম । এখন বয়স হয়েছে তাই যাওয়া হয় না। তুমি দেখতে রাজা সাহেবের মত হয়েছ ।
—— রাজা সাহেবের কি হয়েছিল ?
—— রাজা সাহেব একদিন কাউকে না বলে চলে যায় । আজ পর্যন্ত তার কোন খুঁজ নাই । তবে সে পাগল হয়েছিল । শুধু বলত মোহিনী আমি ফিরে আসব । আবার জন্ম নিব । এই কথা গুলো বলত ।  ড্যানিয়েল আর কিছুই বলে না। সোজা বাড়িতে চলে আসে। মাকে জরিয়ে বলে  মা আমি দেখতে কি সেই রাজা দাদার মত হয়েছি । ড্যানিয়েল মা একটু হেসে বলে সবাই তো তাই বলে । সারা রাত ঘুমাতে পারে না। ড্যানিয়েল । কি করবে বুঝতে পারে না। জঙ্গল বাড়ি সামনে বড় পুকুর পারে বসে একা একা ভাবতে থাকে ।  মোহিনী কে আমি চিনতাম । আকাশের দিকে তাকায় অনেক মেঘ । প্রচুর গরম । বাড়িতে আসে দেখে অনেক গন্ধ রাজ ফুল ফুটে আছে । সন্ধ্যা থেকে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে । ড্যানিয়েল বার বার ভাবতে থাকে মোহিনী বলেছে বৃষ্টি পরলে সে আমার জন্য
অপেক্ষা করবে । রাত নয়টা গ্রামের বাড়িতে সবাই এই সময় ঘুমাতে যায় ।
ড্যানিয়েল অনেক গুলো রজনীগন্ধা ফুলের ডাল ছিরে হাতে নেয় । একটা ছাতা নিয়ে হাটতে থাকে আর হাটতে থাকে । ঝুম ঝুম বৃষ্টি পড়ছে আকাশ ভেঙে । রাস্তায় কোন মানুষ নাই । ড্যানিয়েল চলে আসে মোহিনীর সেই পুকুর পারে ।
ড্যানিয়েল চেয়ে দেখে মোহিনী হাতে একটা হারিকেন নিয়ে সেই লাল সাদা পাশ পারের শাড়ি পরে ধীরে ধীরে ড্যানিয়েলর দিকে হেঁটে আসছে । পায়ে নুপুরের শব্দ । হারিকেনের আলোতে পায়ের আলতা দেখা যাচ্ছে । ড্যানিয়েল সামনে এসে বলে  কি আজ মোহিনীকে চিনতে পেরেছ রাজ । রাজ রজনী গন্ধ ফুল গুলো মোহিনীর হাতে দেয় । মোহিনী ফুল গুলো নিয়ে বলে আমি জানি রাজা সাহেব তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে । ড্যানিয়েল বলে মোহিনী আমিই তোমার রাজা সাহেব । আমাকে যে আসতেই হবে শত জন্মের পর জন্মে । আমি এসেছি মোহিনী । রাজা সাহেব দেখ আজ পুকুরে কত লাল শাপলা কত সুন্দর পুক।

দ্যগ্লোবালনিউজ/ পোস্টেট/টিএউচ জাকির

Related posts