November 17, 2018

বীভৎস সেইদিন কলংকিত শীতলক্ষ্যা


রফিকুল ইসলাম রফিক,নারায়ণগঞ্জঃ  নারায়ণগঞ্জের গত কয়েক বছরের ইতিহাসে সাত খুনের ঘটনাটি সবচেয়ে বেশী আলোচিত। সাতজনকে একসঙ্গে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যা নদীতে। ২০১৪ সালের ৩০এপ্রিল বন্দরের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে উঠে ছিল র‌্যাব কর্তৃক অপহৃত হওয়া সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার সহ ৬ জনের লাশ। পরদিন ১মে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে আরও একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

৩০ এপ্রিল বিকেলে যখন একের পর এক লাশ উদ্ধার হয় তখনই সবাই নিশ্চিত হয় অপহরণের ৭জনের লাশগুলোই এগুলো। মুহূর্তের মধ্যে শীতলক্ষ্যার পাড়ে জড়ো হতে থাকে লোকজন। কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতে পরিবারের লোকজন। সেই বীভৎস দিনের কথা স্মরণ করে এখনো আতকে উঠে লোকজন।

জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন ২৮ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান করে মামলায় আসামি করা হয় ৬জনকে।

৩০ এপ্রিল প্যানেল মেয়র নজরুলের ভাই আব্দুস সালাম ও স্ত্রী সেলিনা ইসলাম নজরুলের লাশ শনাক্ত করেন। এছাড়া নজরুলের সঙ্গেই অপহৃত মনিরুজ্জামান স্বপনের লাশ তার ছোট ভাই রিপন এবং তাজুল ইসলামের লাশ তার বোন শিরীন আক্তার শনাক্ত করেন। আরেকটি লাশ অপহৃত আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের বলে শানাক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ হাসপাতালের মর্গে অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের লাশের পরিচয় শর্নাক্ত করেন তারা ছেয়ে সেতু সরকার ও মিতু সরকার।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাশ ৬টি এক কিলোমিটারের মধ্যে পায়ে ২৪টি করে ইট বোঝাই সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ছিল নদীতে ডোবানো ছিল। পা ছিল দড়ি দিয়ে বাঁধা। হাত পেছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। মুখমন্ডল ডাবল পলিথিন দিয়ে গলার কাছে বাঁধা ছিল। পেট ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোজাসুজি ফাড়া ছিল।

প্যানেল মেয়র নজরুলের লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। তার সমর্থকেরা সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে যান বাহনের ব্যাপক ভাঙচুর চালায়, বিক্ষুদ্ধ জনতা ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের মৌচাক এলাকায় অবস্থিত সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও অপহরণ মামলার ২নং আসামী হাজী ইয়াসিন মিয়ার মালিকানাধীন সামস ফিলিং স্টেশন নামের একটি পেট্রোল পাম্পে ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নি সংযোগ করে। এ সময় তারা পেট্রোল পাম্পের ভেতরে থাকা একটি ট্রাক ও বাসে অগ্নি সংযোগ করা হয়।

এদিকে লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাইনবোর্ড থেকে কাচঁপুর ব্রীজ পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষ। সর্বত্র জ্বলে উঠে ক্ষোভে আগুন। তাদের দেওয়া আগুনে পুরো এলাকা জুড়ে বিরাজ করে পোড়া গন্ধ।

সাতজনের অপহরণের এর আগে নূর হোসেন অত্যাচারের ভয়ে কেউ মুখ না খুললেও সিটি করপোরেশনের ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল সহ আরোও ৭জনের লাশ উদ্ধারের পর লাঠিসেটা নিয়ে নিয়ে নেমে আসে ঢাকা-চট্রগ্রাম ও ঢাকা সিলেট মহাসড়কে। টানা ৪ দিন চলে অবরোধ ও অগ্নি সংযোগ। ৩০ এপ্রিল নজরুল ইসলাম সহ বাকিদের লাশ উদ্ধারের পর সেই বিস্ফোরণ অগ্নিগিরির মত ছড়িয়ে পড়ে। উত্তাল হয়ে উঠে সিদ্ধিরগঞ্জ জ্বলতে থাকে মহাসড়ক সহ নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা- আদমজী সড়ক। ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও নজরুল হত্যা মামলার ২নং আসামী হাজী ইয়াসিন মিয়ার মালিকানাধীন শ্যামস ফিলিং স্টেশন।

আলোচিত চা ল্যকর সেভেন মার্ডারের ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় আদালতে চার্জশীট জমা দেওয়া হয়েছে গত বছরের ৮এপ্রিল। এতে গ্রেপ্তারকৃত নূর হোসেন সহ র‌্যাবের চাকুরীচ্যুত তিনজন আলোচিত কর্মকর্তা সহ ৩৫জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এজাহারভুক্ত ৫ আসামীকে।

এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় র‌্যাব-১১ এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের পরিবারের সদস্যরা। প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্বশুর অভিযোগ করেন, ৬কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাবকে দিয়ে ওই সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন নূর হোসেন। এ অভিযোগের পর র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, সাবেক অধিনায়ক মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে চাকরিচ্যুত করা হয় গত ৬ মে। ১৭ মে দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঢাকার সেনানিবাস এলাকা থেকে মিলিটারী পুলিশ ও ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ এবং নৌ বাহিনীর গোয়েন্দারা এমএম রানাকে আটক করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের কাছে তুলে দেয়। পরে এ তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/৩০ এপ্রিল ২০১৬

Related posts