September 21, 2018

বীজ নিয়ে প্রতারণা!

464
স্বজন শিকদারঃ  এদেশের মাটিতে সোনা ফলে। এদেশের উন্নতিকল্পে তাই কৃষি তথা কৃষি অর্থনীতি সমুন্নত করার বিকল্প নেই।

পাশাপাশি স্মরণ রাখার বিষয় হচ্ছে যে, এদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করতে তথা কৃষি সেক্টর ধ্বংস করার চেয়ে বড় সুযোগ ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে নেই। ষড়যন্ত্রকারীরা এক্ষেত্রে এদেশের কৃষির ক্ষেত্রে জমিতে ভেজাল ও ক্ষতিকারক সার, ফসলে ক্ষতিকারক কীটনাশকের পর সবচেয়ে বড় যে সুযোগটি নিতে পারে সেটা হলো বীজ। ২০১৪ সালে টমেটোর অতি বাম্পার ফলন হলেও ষড়যন্ত্রকারীদের নিম্নমানের বীজের কারণে গতবার (২০১৪ সালে) টমেটোর তত ভালো ফলন হয়নি।

সম্প্রতি বীজ নিয়ে প্রতারণার হাত থেকে দেশের কৃষকদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।

মূলত, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই কৃষকের কাছে মানহীন বীজ বিক্রি, মেয়াদোত্তর্ঢু বীজ, বীজের চড়া দামসহ নানা প্রতারণামূলক ঘটনা ঘটেই থাকে। এসব কারণে কৃষকদের ভোগান্তি লেগেই আছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করে দেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য। আমাদের দেশে পূর্বে কৃষকরা নিজস্ব পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ করতেন। এর ফলে কৃষকের বীজ কৃষকের হাতে থেকে যেতো।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেশি ফলনের জন্য দেশের কৃষিতে নির্বিচারে ঢুকে পড়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। এর ফলে বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতিও কৃষকের হাতছাড়া হয়। ফলে কৃষক হয়ে পড়ে বীজশূন্য। এখন কৃষককে প্রতি বছর বীজ ক্রয় করতে হয়। আর এ সুযোগে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও বহুজাতিক কোম্পানি বীজের রমরমা ব্যবসার ফাঁদ পেতে বসেছে। এসব বীজ ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছে মানহীন বীজ, মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ বিক্রি করে থাকে। যা প্রতারণাতো বটেই গুরুতর অপরাধও। এমন অপতৎপরতা আমাদের প্রান্তিক চাষীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।

বিভিন্ন মৌসুমে একর-একর ধানক্ষেতে ধান-চিটা হওয়ার যে খবর আমরা পেয়ে থাকি সেটার জন্য মানহীন বীজই অন্যতম কারণ বলে বিশেষজ্ঞ মহল অভিমত দিয়ে থাকেন। তার উপর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বীজ-বাণিজ্য তো রয়েছেই। এসব কোম্পানি কৃষকদের বাগে পেয়ে ইচ্ছেমতো বীজের দাম বাড়িয়ে থাকে এবং কৃষকও বাধ্য হয় অধিক মূল্যে বীজ ক্রয় করতে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে কৃষি রক্ষায় এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরী।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে সিনজেনটা কোম্পানির টমেটো চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিম্নমানের বীজ সরবরাহের অভিযোগ এনে ক্ষতিপূরণের দাবিতে টমেটো চাষীরা রাজপথে আন্দোলন শুরু করে। রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী সিনজেনটা কোম্পানির ভেজাল ও নিম্নমানের টমেটো বীজ সরবরাহের বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডারে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছিলো। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সংসদ সদস্য ও ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের আশ্বস্ত করেছিলো। বলেছিলেন- বীজ ডিলার এসোসিয়েশনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করবে। এখনো কৃষিমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিতেই ঝুলে আছে ক্ষতিগ্রস্ত টমেটো চাষীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি।

এবারও রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষকরা ঝলক, লালতীর ও আলফা অ্যাগ্রো কোম্পানির প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি দামে তারা এসব কোম্পানির টমেটো বীজ কেনেন। কিন্তু এসব বীজ থেকে সৃষ্ট অধিকাংশ গাছ ফুল আসার আগেই মরে যাচ্ছে। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন এ অঞ্চলের প্রায় দুই শতাধিক কৃষক।

কৃষকরা জানান, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে সিনজেনটার প্রতারণার কারণে নিম্নমানের বীজ কিনে ২০১৪ সালে টমেটো চাষে কয়েক কোটি টাকার লোকসান গুনেছেন তারা। এ নিয়ে তারা মামলা, বিক্ষোভ মিছিল এবং সমাবেশও করেছেন। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও প্রতারণার শিকার হলেন তারা।
এনার্জি প্যাক এগ্রো লি.-এর হাইব্রিড ঝলক-১ ধান বীজ চাষ করে গাজীপুর, বরিশাল, শেরপুর, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায়, সিনজেনটা বাংলাদেশের ভুট্টা চাষ করে চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে, মেটাল এগ্রো এর সারথি-১৪ চাষ করে বরিশাল ও নাটোরে, রাজশাহীতে সবল-১ জাতের টমেটো বীজ চাষ করে হাজার হাজার কৃষক অর্থনৈতিকভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, বীজের নিয়ন্ত্রণ গুটিকয়েক বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ায় কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয় ১৯৯৩ সালের ২৫ জানুয়ারি বীজনীতি ঘোষণা করে। এর আগে বাংলাদেশে জাতীয় বীজ অধ্যাদেশ-১৯৭৭, বীজ সংশোধন আইন-১৯৭৭, জাতীয় বীজ বিধিমালা ১৯৯৮ গৃহীত হয়। ২০০৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর উদ্ভিদজাত ও কৃষক অধিকার সংরক্ষণ অধ্যাদেশ-২০০৭ নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। তবে এগুলো বাস্তবে প্রতিফলিত না হওয়ায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নানাভাবে প্রতারণা করার সুযোগ পাচ্ছে। এক্ষেত্রে কৃষকদের বিপর্যয়ের খবর প্রকাশিত হলেও প্রশাসনের নীরবতা খুবই দুঃখজনক। অপরদিকে জাতীয় বীজ বোর্ডের অভিযুক্ত কোম্পানির বীজ বিক্রি বন্ধ করার আইন থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা না নেয়া বড়ই বেদনাদায়ক। তাই প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় বীজ নীতির যেসব ধারা উপধারা কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি তা বাতিল করা, ভেজাল বীজ আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সকল কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা ও ব্যবসায়িক অনুমোদন বাতিল করা।

পাশাপশি বিলুপ্তপ্রায় বীজগুলো সংরক্ষণ করে সেগুলো ‘প্যাটেন্ট’-এর আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সরকারের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এসব ধান চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। আর কৃষিজমি রক্ষায় অপেক্ষাকৃত কম সার এবং কম কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়- এর জন্যও বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন। সর্বোপরি খাদ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বীজ নিরাপত্তার সঠিক ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার যাবতীয় দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts