December 14, 2018

বিশ্বনাথে বিলাতি ধনিয়া চাষে নিরব বিপ্লব

IMG_20180920_115112বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি :: বিলাতি ধনিয়া চাষে যেন রীতিমত নিরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন সিলেটের বিশ্বনাথের অসংখ্য চাষী। করেছেন নিজেদের ভাগ্য বদল। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন অনেক বেকারের। শুধু তাই নয়, উচ্চ বাজারমূল্য ও অধিক আয়ের কারণে এ উপজেলায় দিনকে দিন বেড়েই চলেছে ধনিয়া চাষ। বেড়েই চলেছে স্বাবলম্বী মানুষের সংখ্যা। 

এদিকে, সারা দেশে চাহিদা বিদ্যমান থাকা বিলাতি ধনিয়ার স্থানীয় বাজারেও বেশ চাহিদা বেড়েছে। অধিক ফলনের কারণে ক্রেতাদের জন্য ধনিয়ার দাম যেমন সহনশীল, তেমনি চাষীরাও ভালো দাম পাচ্ছেন।

জানা গেছে, মসলার মধ্যে বিলাতি ধনিয়া একটি কিউলিনারী হার্ব। এটিকে বাংলা ধনিয়া এবং সিলেটে একে বনঢুলা বলে। বর্তমানে এই ফসলটি বিশ্বনাথের বিভিন্ন এলাকায় চাষাবাদ হচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলার অলংকারী ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে বিলাতি ধনিয়ার ব্যাপক চাষ হচ্ছে। অলংকারী ইউনিয়নের মুন্সিরগাঁও, মনুকোপা, পালগাঁও, বেতসান্দি ছনখাইড়, পিটাকরা ও ফরহাদপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে প্রায় ৮ একর জায়গাজুড়ে এ ধনিয়া চাষ করে আসছেন চাষীরা। কঠোর পরিশ্রম আর নিবিড় পরিচর্যা চালিয়ে দেখছেন একের পর এক লাভের মুখ। যার ফলে, ভাগ্যবদল হয়েছে অসংখ্য বেকারের। স্বচ্ছলতা ফিরেছে অনেক পরিবারের। এমন ভাগ্যবদল দেখে নতুন করে অনেকেই বিদেশ পাড়ি দেবার চিন্তা বাদ দিয়ে দারিদ্রতা ও বেকারত্ব দূরীকরণে নেমে পড়ছেন বিলেতি ধনিয়া চাষে। যে কারণে এতদঞ্চলে বেড়েই চলেছে ধনিয়ার চাষ ও চাষীর সংখ্যা।

IMG_20180920_115208সরজমিন ওই এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায় ধনিয়ার পরিচর্যা, পাতা আহরণ ও ধনিয়া রোপনকৃত জমি রক্ষণাবেক্ষণে ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেক চাষী। কথা হয় তাদের সাথে। তারা শোনান ভাগ্যবদলের গল্প।

মুন্সিরগাঁও এলাকার চাষী আবুল কালাম বলেন, ‘দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে আর বেশী দূর এগোতে পারিনি। ইচ্ছে ছিল ভাগ্যবদলের জন্যে বিদেশ পাড়ি দেয়ার। পরে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। এলাকায় অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছে দেখে নেমে পড়ি বিলাতি ধনিয়া চাষে। সফলতা এসে ধরা দেয় হাতের মুঠোয়। বর্তমানে প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে ধনিয়া চাষ করেছি। বছরে প্রতি বিঘা জমিতে ধনিয়া চাষে খরচ আসে ৭০হাজার টাকার মত। এগুলো বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে মুনাফা আসে ১ লক্ষ ১০হাজার টাকা প্রায়। তবে, বিলাতি ধনিয়া চাষে পরিশ্রম করতে হয় খুব বেশি। যত পরিশ্রম তত লাভ।’

কথা হয় আরেক চাষী মুজিবুর রহমান চৌধুরী কাওসারের সাথে। ধনিয়া রোপন পদ্ধতি কি রকম জানতে চাইলে এই সফল চাষী জানান, ‘আমাদের এখানে মূলতঃ ফাল্গুন মাসে এর বীজতলা তৈরী করতে হয়। চারা উৎপাদন হলে চৈত্র-বৈশাখ মাসে ধনিয়া রোপন করা হয়। রোপনের ১৫/২০দিন পর হতেই এগুলো বিক্রি শুরু হয়ে যায়। প্রতিদিন ৬হাজার টাকার মত ধনিয়া বিক্রি করা যায়। সালাদ ও তরকারীতে ব্যবহারের জন্যে এগুলোর চাহিদা ব্যাপক। পবিত্র রমজান মাসে ইফতারীর জন্যে ধনিয়ার পাতা ও ফুল দিয়ে চপ তৈরী করা হয়ে থাকে। চাহিদা পূরণে সিলেটের সোবহানী ঘাটে পাইকারী বাজারে এগুলো বিক্রি করে থাকি। প্রতিবছরই ধনিয়া বিক্রি করে আমার দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকার মত আয় হয়।’

তিনি আরও জানান, বিলাতি ধনিয়া চাষ করে শুধু আমরা নিজেরাই স্বাবলম্বী হইনি। এর ফলে কর্মসংস্থান হয়েছে অসংখ্য মানুষের। বিশেষ করে নারীদের আয়-রোজগারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে যেসকল নারীরা পাতা আহরণের কাজ করেন, তারা প্রতি রোজ হিসেবে ৩শ টাকা পেয়ে থাকেন। তাছাড়াও, ১০০আঁটি প্রতি (আঁটি বাঁধার জন্যে) ১০টাকা হারে বাড়তি টাকা রোজগার করে থাকেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমজান আলী সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বনাথের অলংকারী ইউনিয়নের মুন্সিরগাঁও, মনুকোপা, পালগাঁও, বেতসান্দি ছনখাইড়, পিটাকরা ও ফরহাদপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে বিলাতি ধনিয়া চাষ হচ্ছে। এই ধনিয়া চাষ করে পরিবারে স্বচ্ছলতা আনা সম্ভব। ইতিমধ্যে ওই এলাকাগুলোর অনেক বেকার ও শিক্ষার্থীরা বিলাতি ধনিয়া চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই ফসল চাষে খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আঙ্গিনার অব্যবহৃত উঁচু জমিতেও চাষ করা যায়। এ ক্ষেত্রে নারীরাও এই ধনিয়ার চাষ করতে পারেন। আগ্রহী চাষীরা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ সহযোগিতা নিতে পারেন। আমরা তাদের পাশে আছি।

Related posts