November 17, 2018

বিশ্বনাথে বাসিয়ার দু’তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদী পুনঃখনন কাজ অনিশ্চিত

বাসিয়া-নদী-1মোঃ আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ থেকে  :: সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলা সদরে বাসিয়া নদীর দু’তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদী পুনঃখনন কাজ শুরু করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা সদর ও কালিগঞ্জ বাজারে এলাকায় ১৭২টি অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করে নদীর দুই তীরে গড়ে উঠা এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি উচ্ছেদ মামলা করা হয়। পরবর্তিতে দখলদারদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হলে আদালত ৬মাসের জন্য মামলাটি স্থগিত করেন। তবে এসব অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা না হলেও নদী পুনঃখনন কাজ সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম।

জানা যায়, সিলেট সদর উপজেলার মাসুকগঞ্জ বাজার নামক স্থানে ‘সুরমা নদী’ থেকে বাসিয়া নদীর উৎপত্তি হয়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার খাইকা নামক স্থানে ‘কুশিয়ারা নদীতে’ গিয়ে শেষ হয়েছে। বাসিয়া নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪২ কিলোমিটার ও প্রস্থ প্রায় ৩০ মিটার। এই নদীটি এক সময় প্রচন্ড খড়স্রোতা ছিল। কালের বির্বতনে পাহাড়ি ঢল ও পলি মিশ্রিত বন্যার পানিতে ভরাট হতে থাকে বাসিয়ার তলদেশ। এছাড়াও বিশ্বনাথ বাজার এলাকায় নদীতে বর্জ্য ফেলে ভরাট করে দেয়া হয়েছে নদীর স্বাভাবিক গতি পথ। সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দস্যুতা দখল করে নিয়েছে নদীর দুই তীর। গড়ে তুলেছে শত শত অবৈধ স্থাপনা।

২০১৪ সালে ৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যায়ে ৪টি প্রকল্পে সিলেট সদর উপজেলার মাসুকগঞ্জ বাজার থেকে বিশ্বনাথ উপজেলা সদর পর্যন্ত বাসিয়া নদীর ১৮ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ সম্পন্ন করা হলেও অদৃশ্য কারণে বিশ্বনাথ উপজেলা সদর এলাকায় প্রায় ৩শত মিটার নদী খনন না করেই কাজ সম্পন্ন করা হয়। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাষ্ট ফান্ডের অর্থায়নে আরো ৭ কিলোমিটার ‘বাসিয়া নদী পুনঃখনন প্রকল্প’ বাস্তবায়নের কার্যক্রম গ্রহণ করে সিলেটের পানি উন্নয়ন বোর্ড। তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের গেটের সামন থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকায় ৭ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে এই খনন কাজ করার কথা। সিলেটের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস নদীর উত্তর তীর হতে দক্ষিণ তীরে ফিতা দিয়ে মেপে ৩৩মিটার (১শত ৯ফুট) সীমানা নির্ধারণ করেন। সীমানা নির্ধারণ করে অনেক গড়িমশির পর সময় নষ্ট করে গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি কালিগঞ্জবাজার এলাকা থেকে নদী খনন কাজ শুরু করা হয়। কিন্ত ২কিলোমিটার খনন কাজ করার পর বৃষ্টির পানি নদীতে আসায় খনন কাজটি বন্ধ রাখে ঠিকাদারি প্রতিষ্টান। ওই কাজের মেয়াদ ২০১৭সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হলে মেয়াদ বাড়ানোর জন্যে ঢাকায় আবেদন করা হয় এবং মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ শুরুর নির্দেশনা পেলে গত বছর যে স্থান থেকে নদী খননকাজ বন্ধ করা হয়েছিল সেই স্থান থেকেই গত ৭ফেব্রুয়ারি ফের খনন কাজ শুরু করা হয়। কিন্ত এই খনন কাজে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ‘মেশিন দিয়ে খনন কাজের নামে চলছে লোক দেখানো নদী চরের ঘাস ছাটাই কাজ’ স্থানীয়রা এমন অভিযোগ করেছেন। তবে খনন কাজটি সঠিকভাবে চলছে বলে দাবি করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্টানের সত্ত্বাধিকারি মুসলিম মোল্লা।

এদিকে, নদী খনন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার দাবিতে বাঁচাও বাসিয়া নদী ঐক্য পরিষদ বিভিন্ন কর্মসূচি ইতিমধ্যে পালন করেছে। উপজেলা সদর ও কালিগঞ্জ বাজারে বাসিয়া নদীর দুই তীরে গড়ে উঠা ১৭২টি অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করে প্রশাসন। এরপর গড়ে উঠা এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি উচ্ছেদ মামলা করা হয়। পরবর্তিতে দখলদারদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হলে আদালত ৬মাসের জন্য মামলাটি স্থগিত করেন। চলতি মাসে এই ৬মাস পূর্ণ হয় এবং গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সিলেট জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কার্যালয়ে মামলার শুনানী অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্ত দখলদারদের পক্ষ থেকে মামলার শুনানীর জন্য আদালতে সময় চেয়ে প্রার্থনা করা হলে শুনানীটি পিছানো হয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়। তাই শেষ পর্যন্ত উপজেলা সদরের তিনশত মিটার নদীর দুই তীরের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করে নদীর খনন কাজ সম্পন হবে কি না এনিয়ে ধ্রুমজাল দেখা দিয়েছে। তবে বাপাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা না হলেও ভ্রাম্যমান এস্কেভেটর মেশিনের মাধ্যমে নদী যে অবস্থায় রয়েছে ওই অবস্থায়ই উক্ত ৩শত মিটার খনন কাজ সম্পন্ন করা হবে। চলমান মামলা নিস্পত্তির মাধ্যমে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দু’তীরে গড়ে উঠা সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদী পুনঃখনন কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন বাঁচাও বাসিয়া ঐক্য পরিষদের আহবায়ক ফজল খান। তিনি বলেন, গত বছর গড়িমসি করে খনন কাজ শুরু করায় নদীতে পানি এসে যায়। এবছরে আবারো শুকনো মৌসুমের শেষ বেলায় এসে কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্বনাথ উপজেলা সদর এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করে নদী খনন কাজ যদি সম্পন্ন করা হয় তাহলে এই খনন করা অর্থহীন হবে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হবে, তাতে জনগণ কোন উপকার পাবে না।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, নিয়মানুযায়ী নদীর পুনঃখনন কাজ চলতেছে। কাজ শেষে ট্রাস্টফোর্স টিমের সদস্যের পরিদর্শনের পর তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই কাজের বিল তৈরী করা হবে। বিশ্বনাথ উপজেলা সদরের ৩শত মিটার নদী পুনঃখনন কাজ করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা না হলে বর্তমানে যে অবস্থায় নদী রয়েছে এই অবস্থায়ই ভ্রাম্যমান এস্কেভেটর (এসিবিএন) মেশিনের মাধ্যমে উক্ত তিনশত মিটার নদী খনন করা হবে।

Related posts