January 16, 2019

বিশ্বনাথে পুলিশের ভয়ে পুরুষ শুন্য মনোকুপা গ্রাম : আতংকে নারীরা

a1b633003ef63a5540d23e5fe2db7203-MYMENSINGH-1-900x450মো. আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি :: সিলেটের বিশ্বনাথে স্বামীর পরিবার কর্তৃক গৃহবধূ ও তার সন্তানকে ঘরে তালাবদ্ধ করে নির্যাতনের অভিযোগ পেয়ে ভিকটিম উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের উপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রবিবার (১৮ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলার অলংকারী ইউনিয়নের মনোকুপা গ্রামের আব্দুর রউফের বাড়িতে এঘটনা ঘটে। এসময় গৃহবধু ও তার সন্তানকে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের উপর হামলা, পুলিশের কাজে বাঁধা, ও পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগে ২৭জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০জনকে অজ্ঞাতনা আসামি করে এসল্ট মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। গত রবিবার রাতে বিশ্বনাথ থানার এসআই সুলতান উদ্দিন বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরে পর ওই রাতেই পুলিশ এজাহার নামীয় এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে। সে উপজেলার মনোকুপা গ্রামের মৃত আলকাছ মিয়ার ছেলে জালাল হোসেন।

এদিকে, আজ সোমবার সন্ধ্যায় এসল্ট মামলার আসামী গ্রেফতার করতে পুলিশ মনোকুপা গ্রামের অভিযান চালায়। গ্রেফতার এড়াতে গ্রামের পুরুষ সদস্যরা বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ফলে পুরুষ শূণ্য হয়ে পড়েছে মনোকুপা গ্রাম। এতে গ্রামের অবস্থানরত নারীরা রয়েছেন আতংকে।

অন্যদিকে, মিথ্যা অভিযোগ এনে পুলিশের দায়েরকৃত এসল্ট মামলায় এলাকার নিরীহ লোকজনকে আসামী করে হয়রানী করা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মনোকুপা গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি ঘরে তল্লাশী করে এবং পুরুষ শূন্য ঘরের নারীদের উপর লাঠিচার্জ ও ঘরে থাকা আসবাবপত্র পুলিশ ভাংচুর করেছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন নারী।

গত রোববার রাত ৮টায় সরেজমিন মনোকুপা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, প্রায় দুই বছর পূর্বে উপজেলার অলংকারী ইউনিয়নের মনোকোপা গ্রামের আবদুর রউফের ছেলে ওমান প্রবাসী আলী হোসেন সঙ্গে একই উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের শাখারিকোনা গ্রামের আব্দুর রউফরে মেয়ে ফারহানা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের ৩মাস পর আলী হোসেন প্রবাসে চলে গেলে তার স্ত্রী ফারহানা বেগম পিত্রালয়ে চলে যান। বিয়ের পর থেকে তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে তাদের ঘরে একটি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহন করে। গত মাস খানেক পূর্বে প্রবাস থেকে ফের দেশে আসেন আলী হোসেন। তিনি দেশে আসার পর তার স্ত্রীকে পিত্রালয় থেকে বাড়িতে নিয়ে আসলেও তাদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছিল। এমতাবস্থায় গত রোববার সকালে আলী হোসেন তার আত্মীয়দের সাথে বেড়াতে (পিকনিক) যেতে চাইলে এনিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তার ঝড়গা হয়। একপর্যায়ে সকাল ৮টায় স্ত্রীকে ঘরে রেখে আলী হোসেন পিকনিকে চলে যান। পরে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার বিষয়টি ফারহানা বেগম মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার পিত্রালয়ে অবহিত করেন। এরপর সকাল ১১টায় লামাকাজী ইউপির স্থানীয় ওয়ার্ডের মেম্বার চমক আলী ও বিশ্বনাথ থানার এসআই সুলতান উদ্দিনকে সাথে নিয়ে আলী হোসেনের বাড়িতে যান ফারহানা বেগমের ভাই জয়নাল উদ্দিন। এসময় আলী হোসেনের পরিবারের সদস্যসের সঙ্গে ইউপি সদস্য চমক আলীর বাকবিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এসময় থানার এসআই সুলতান উদ্দিন বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে তিনিও লাঞ্চিত হন বলে জানা গেছে।

bbbbbbতবে, দায়েরকৃত মামলার এজাহার সূত্রে জানাগেছে, গত রবিবার দুপুরে স্বামীর পরিবার কর্তৃক ফারহানা বেগম ও তার আট মাস বয়সি শিশুপুত্র আলী আনহারকে শ্বশুড় বাড়ির লোকজন বাড়িতে তালাবদ্ধ করে মারপিট করে। এমন অভিযোগ এনে ওই দিন সকালে ফারহানা বেগমের ভাই জয়নাল উদ্দিন বাদী হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে থানার এসআই সুলতান উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। এসময় পুলিশের সঙ্গে ছিলেন লামাকাজী ইউপি সদস্য চকম আলী ও ফারহানা বেগমের ভাই জয়নাল উদ্দিন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ভিকটিম ফারহানা বেগম ও তাহার শিশু পুত্র আলী আনহারকে উদ্ধার করে তার ভাইদের কাছে দেয়। এসময় ভিকটিম ও তার শিশুপুত্রকে নিয়ে আসার পথে বাড়ীর রাস্তার মুখে স্বামীর বাড়ির পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় লোকজন চিৎকার চেচামেচি করে লোকজনের সমাগম ঘটায় ও লাঠিসোটা হাতে নিয়ে পুলিশের পথরোধ করে এবং পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা প্রদান করেন। এরই মধ্যে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ফারহানা বেগমের স্বামীর পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় লোকজন পরিস্থিতি গুলাটে করার লক্ষ্যে উদ্দেশ্য প্রনোধিত ভাবে পুলিশের উপর আক্রমন করে। এতে তাৎক্ষনিক পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। এসময় স্থানীয়রা চমক আলী মেম্বারকে মারধর করে তাকে অন্য এক বাড়ীতে লুকিয়ে রাখেন এবং পুলিশের সঙ্গে থাকা অটোরিকশা (সিএনজি নং-মৌলভীবাজার-থ-১১-৪৪৮৬) এর সামনের হেড লাইট এবং ডান পাশের সিগন্যাল লাইটসহ হেডলাইটের সাথে বাম্পার ভাঙ্গিয়া অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে চমক আলী মেম্বারকে অভিযুক্ত ছিদ্দেক আলীর বসত বাড়ী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এজাহারে উল্লেখ করা হয়- অভিযুক্তদের আক্রমনে থানার এসআই সুলতানউদ্দিন ও এএসআই পরিমল চন্দ্র শীল, কনস্টেবল রাজু, স্থানীয় ইউপি সদস্য চমক আলী, অটোরিকশা চালক বদরুল ইসলাম আহত হয়েছেন। পরে থানা পুলিশের অফিসার ফোর্সের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে এবং ঘটনায় আহত সকলেই বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

এব্যাপারে আলী হোসেনের বড় বোন পারভীন বেগম সাংবাদিকদের জানান-বিয়ের পর থেকে আমার ভাই আলী হোসেনের সাথে তার স্ত্রী ফারহানা বেগমের বিভিন্ন সময়ে অশালীন আচরণ করে আসছিল। এবিষয়টি তার ফারহানার পিতার পরিবারকে অবহিত করা হয়। সম্প্রতি আলী হোসেন দেশে এসে তার স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে আসে। রোববার সকালে তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। এরপর আলী হোসেন বাড়ি থেকে বাহিরে চলে যাওয়ার পর ফারহানা বেগমের ভাই পুলিশকে সাথে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে ফারহানা বেগম ও তার সন্তানকে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সঙ্গে আসার চমক আলী মেম্বার অশ্লিল ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। এসময় তার সঙ্গে আমার পিতার ধস্তাধস্তি হয়। পরে আমার ভাইয়ের ঘরে থাকা নগদ টাকা, পাসপোর্ট ও স্বর্ণালংকার সহ মালামাল তারা নিয়ে যায়। তিনি আরো জানান- রোববার বিকেলে হঠাৎ কয়েকজন পুলিশ আমাদের বাড়িতে এসে কোন কিছু না বলেই লাঠিচার্জ করে। এসময় পুলিশের লাঠিচার্জে আমার চাচাতো বোন ও এক আত্মীয় আহত হন। আজ (সোমবার) সন্ধ্যায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ গ্রামের প্রবেশ করে বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশী চালায়। একপর্যায়ে আমাদের বাড়িতে এসে লাঠিচার্জ করে আসবাবপত্র ভাংচুর করে ও বাড়িতে পুরুষ না পেয়ে মহিলাদেরকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়ে চলে যায়। ফলে আমরা আতংকে রয়েছি।

এছাড়া কয়েকজন অভিযুক্ত জানান, আমাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো সঠিক নয়। মিথ্যা অভিযোগে এনে পুলিশ এলাকার নিরীহ লোকজনকে হয়রানী করার জন্য তাদের আসামি করে মামলা করেছে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে তারা দাবি জানান।

মামলা দায়েরের সত্যতা স্বীকার করে বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) শামসুদ্দোহা পিপিএম বলেন- মামলার এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার অপর আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা বলে তিনি দাবি করেন।

Related posts