October 20, 2018

বিশ্বনাথে কিশোরী হত‌্যার রহস‌্য উদঘাটন : গ্রেফতার ৪

প্রেমের ফাঁদে ফেলে টাঙ্গাইল থেকে কিশোরীকে এনে সিলেটের বিশ্বনাথে হত্যা, সু্ন্দরী মেয়েদের সাথে প্রেমের অভিনয় করে ধর্ষনের পর হত্যাই তার নেশা

IMG_20180919_180829মো. আবুুুল কাশেম, বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি :: সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের পাঠাকইন গ্রামের জনৈক তবারক আলীর বাড়ির রাস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত কিশোরীর লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতের নাম রুমি আক্তার (১৬)। সে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার আউতপাড়া গ্রামের আতাউর রহমানের মেয়ে। এঘটনায় পুলিশ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের মৃত ওয়াব উল্লাহ’র পুত্র শফিক মিয়া (৩২), শফিক মিয়ার স্ত্রী সোনালী আক্তার হিরা (২৪), তার দুই ভাবী দিপা বেগম (৩২) ও লাভলী বেগম (২৫)। এঘটনায় শফিককে বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তাকারী ও সন্দেহভাজন হিসাবে মোট ১৪জনকে পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

অন্যদিকে শফিক যে রুমীর হাত-পা বেঁধে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে খুন করেছে ও ঘরের ভিতরে আসার পর মুখ-হাত বেঁধে রুমীকে নির্যাতন করেছে তার (শফিক) দুই ভাবী দেখেও (দিপা ও লাভলী) শফিককে কোন প্রকারের বাঁধা দেননি, এমনকি কাউকে কিছু না বলেই বিষয়টি গোপন করে গেছেন। শফিক’সহ তারা (দিপা ও লাভলী) এঘটনায় অন্য কাউকে ফাঁসিয়ে দিয়ে শফিককে বাঁচানোর চেষ্ঠা করছিলেন।

এদিকে বোন হাসপাতাল থেকে হারিয়ে গেছে মর্মে ১০ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় কিশোরী রুমী আক্তারের ভাই শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরী দায়ের করে। ডায়েরী নং ৪০১ (তাং ১০.০৯.১৮ইং)।

এরই মধ্যে বিয়ে করেছেন চারটি। কিন্তু নিজের অপকর্ম করছিলেন প্রেম করে। সুন্দরী তরুণীদের সাথে প্রেমের অভিনয় করে তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। এরপর ডেকে এনে ধর্ষণের পর হত্যা করা ছিল তার নেশা।

IMG_20180920_143327গ্রেপ্তারকৃত শফিক মিয়া পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরী রুমি আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বুধবার দুপুরে সিলেট পুলিশ সুপার হল রুমে পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান পিপিএম ও বেলা ২টায় বিশ্বনাথ থানায় প্রেস কনফারেন্সে ওসি শামসুদ্দোহা পিপিএম এমন তথ্য জানান।

তাদেরকে গ্রেফতারের শফিক মিয়া টাঙ্গাইল জেলায় মির্জাপুর থানার সোহাগপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে নাছির গ্লাস ফেক্টরিতে চাকুরী করে আসছিলো। সে গত ৪সেপ্টেম্বর মির্জাপুরস্থ কুমুদিনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার শাশুড়ীকে দেখতে যায়। এসময় হাসপাতালে শাশুড়ীর পাশের বেডে থাকা চিকিৎসাধীন থেলাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত রুমি আক্তারের সঙ্গে পরিচয় হয় সফিক মিয়ার। একপর্যায়ে সফিকের প্রেমের ফাঁদে পড়েন রুমি আক্তার এবং গত ১০ সেপ্টেম্বর ভোরে রুমিকে নিয়ে বিশ্বনাথ উপজেলার রামচন্দ্রপুর নিজ বাড়িতে পালিয়ে আসে সফিক। এরপর রুমিকে ধর্ষণ করে ওই দিন বিকেলে বাড়ির পিছনের খালে হাত পা বেধে হত‌্যা করে পানিতে ডুবিয়ে রাখে সফিক এবং সন্ধ‌্যার পর রুমির মরদেহটি স্থানীয় তবারক আলীর বাড়ির রাস্তায় রেখে সে পালিয়ে যায় সুনামগঞ্জ তার বোনের বাড়িতে। পরদিন সে ফের টাঙ্গাইল চলে যায়।

IMG_20180919_160405তদন্ত চলাকালে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানার কুমুদিনী হাসপাতাল হতে চিকিৎসাধীন একটি মেয়ে নিখোঁজ আছে জানতে পেরে নিখোঁজ পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়। যোগাযোগের একপর্যায়ে পরিধেয় কাপড় চোপড় ও পেটের পুরাতন অপারেশন পর্যালোচনায় ঐ নিখোঁজ মেয়েই অত্র থানাধীন পাঠাকইন গ্রামে পাওয়া অজ্ঞাতনামা মেয়ের লাশ বিশ্বনাথ থানা পুলিশ নিশ্চিত হয়।

IMG-20180911-WA0006গত ১০ জুলাই রাত প্রায় ১২টায় সিআইডির ক্রাইমসি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আলামত সংগ্রহ শেষে লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতের সময় লাশের শরীরে পুরাতন একটি বড় অপারেশনের চিহ্ন দেখা যায়। এছাড়া সাদা গেঞ্জির চিকন টুকরা কাপড় দ্বারা উক্ত লাশটির দুই হাত পিছন দিকে পিঠের উপরে বাধা ও উপুর অবস্থায় লাশটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। লাশের গলায় পেচানো ওড়নার দুই পাশের দুই মাথায় পলিথিন দ্বারা মোড়ানো সাদা কাগজে লেখা দুইটি একই নম্বরের মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়।

ঐ নাম্বারের সূত্রধরে তদন্তের একপর্যায়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর একটি বাংলালিংক নম্বর হতে লাশের সাথে পাওয়া নম্বরের ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলে সকল তথ্য উদঘাটিত হবে বলে বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইনচার্জকে জানালে তাৎক্ষণিক বাংলালিংকের ঐ নম্বর সনাক্ত করে প্রযুক্তিগত সহায়তায় ঐ ব্যক্তির অবস্থান সনাক্ত করা হয়। আসামী গ্রেফতারের জন্য অনুরোধ করা বাংলালিংকের নম্বর পর্যালোচনায় দেখা যায় উক্ত নম্বরে সাথে বিশ্বনাথের আশুগঞ্জ বাজারের জনৈক ইমরান আহমেদ রিয়াদ কয়েক দফায় যোগাযোগ করে এবং বাংলালিংকের উক্ত নম্বরটি বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইনচার্জের সাথে যোগাযোগ করে। ফলে এতে প্রমাণিত হয় যে, অত্র থানাধীন স্থানীয় রামচন্দ্রপুর সাকিনের ইমরান আহমেদ রিয়াদের সাথে বাংলালিংকের গ্রাহকের কোন না কোনভাবে পরিচয় আছে। ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যথারীতি থানায় আনা হলে প্রাপ্ত নাম্বারসমূহ বিশ্লেষণে পুলিশ জানতে পারে বাংলালিংক নাম্বারসহ নিহত রুমী আক্তারের সাথে যোগাযোগকারী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিটি অত্র থানাধীন রামচন্দ্রপুর সাকিনের জনৈক শফিক মিয়া।

IMG_20180919_175928সে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানাধীন নাছির গ্লাস ফ্যাক্টরীতে চাকুরী করে এবং ওই ফ্যাক্টরীর কর্মরত এক মহিলার সাথেও সে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে। উক্ত মহিলার শরনাপন্ন হলে তার দেওয়া তথ্যমতে শফিক মিয়াকে ১৮ সেপ্টেম্বর ভোর ৬ টায় নাছির গ্লাস ফ্যাক্টরী হতে গ্রেফতার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত তার মোবাইল ফোনের সন্ধান দেয়। পরবর্ততে শফিক মিয়ার দেওয়া তথ‌্যমতে ওসি’কে ফোন করে হত‌্যাকান্ডেকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকায় সফিক মিয়ার স্ত্রী সোনালী আক্তার হিরা’কে মঙ্গলবার সন্ধ‌্যা ৭টায় গাজীপুর জেলার চৌরাস্তা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ওসি আরো জানান, গ্রেফতারকৃত শফিক মিয়া একজন নারী পিপাসু ও লম্পট প্রকৃতির লোক। সে মোট ৮টি বিয়ে করেছে। বর্তমানে সে ৪জন স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছে। একটি গণধর্ণন মামলার প্রলাতক আসামী হয়ে সে দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্নগোপনে থেকে সবার অগোচরে নিরীহ মেয়েদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে একের পর এক হত‌্যা ও ধর্ষণ করে বেড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায় রুমি আক্তার তার প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে প্রাণ হারায়।

IMG-20180911-WA0008উল্লেখ‌্য, ২০১৭ সালে ২২ এপ্রিল একই স্থানে আনুমানিক ২৮ বছর বয়সী অজ্ঞাতনামা এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ওই নারীর বুকের কাপড়ের নিচে ভ‌্যানিটি ব‌্যাগের ভিতরে একইভাবে পলিথিন দ্বারা মোড়ানো দুই ব‌্যক্তির ছবি পাওয়া গিয়েছিল।

এদিকে, গতকাল বুধবার বিকেলে গ্রেফতারকৃত শফিক মিয়াকে নিয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় এলাকার শত শত জনতা ঘাতক শফিকের ফাঁসির দাবি জানান।

Related posts