November 16, 2018

বিশ্বনাথে কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে দুই ছাত্রের দাখিল পরীক্ষা দেয়া অনিশ্চিত

তুলকালাম কান্ড ॥ অধ্যক্ষের দায় স্বীকার ॥ অফিস সহকারী বরখাস্ত

DSC_0389মোঃ আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ থেকে :: সিলেটের বিশ্বনাথে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক গাফিলতির কারণে আগামী ১লা ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠেয় দাখিল পরীক্ষায় দুই ছাত্রের অংশ নেয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কামরান আহমদ ও আবদুল গাফ্ফার লিমন নামের এই দুই ছাত্র উপজেলার তেলিকোনা এলাহাবাদ আলিম মাদরাসা থেকে এবারের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেবার কথা ছিল। দু’ছাত্রের পরীক্ষা অনিশ্চিতের খবর এলাকায় চাউর হবার পর মঙ্গলবার (৩০জানুয়ারি) সকালে রীতিমত তুলকালাম কান্ড ঘটে এলাহাবাদ আলিম মাদরাসায়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের হাতে প্রহৃত হন অফিস সহকারী দিলহুর আলম। এসময় খাজাঞ্চী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান’সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আবু তাহির মো. হুসাইন। তাৎক্ষণিক সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে মাদরাসার অফিস সহকারীকে। এছাড়া, ঘটনার তদন্তে মাদরাসার উপাধ্যক্ষকে প্রধান করে ৩সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
জানা যায়, ২০১৮ সালের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেবার জন্যে রেজিস্ট্রেশন করে উপজেলার তেলিকোনা আলিম মাদরাসার ৬২জন শিক্ষার্থী। তারা যথারীতি প্রি-টেস্ট ও টেস্টেও অংশ নেয়। গত ২৯জানুয়ারী সোমবার ৬০জন শিক্ষার্থীর এডমিট কার্ড এলেও সেটা পাননি দাখিল পরীক্ষার্থী উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের হাজী জমশিদ আলীর পুত্র কামরান আহমদ ও সিলেটের খাদিমনগর নোয়াগাঁও গ্রামের আবদুন নুরের পুত্র আবদুল গাফ্ফার লিমন। মঙ্গলবার (৩০জানুয়ারি) সকালে মাদরাসায় এসে তারা এ বিষয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতিতে অফিস সহকারী দিলহুর আলমের কাছে এর কারণ জানতে চান। এসময় তিনি কোনো সদুত্তর না দেয়ায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তার উপর চড়াও হয়। তাতে এসে যোগ দেন তেলিকোনা গ্রামের লোকজন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসার ডেস্ক-বেঞ্চ ভাংচুর করে ও অফিস সহকারীকে মারধর করে। খবর পেয়ে খাজাঞ্চী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তালুকদার গিয়াস উদ্দিন, শিক্ষানুরাগী মাওলানা আবুল বশর মোঃ ফারুক, স্থানীয় ইউপি সদস্য আমির উদ্দিন’সহ স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ পরিস্থিতি উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। এসময় সকলের উপস্থিতিতে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ অফিস সহকারী দিলহুর আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করেন এবং ঘটনাটি তদন্তে মাদরাসার উপাধ্যক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্বশীল মাওলানা মুখলিছুর রহমানকে প্রধান করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। কমিটির অপর দুই সদস্যরা হলেন ইংরেজীর প্রভাষক ফরিদুল ইসলাম ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আমির উদ্দিন। এসময় অধ্যক্ষের কাছে এলাকাবাসীর ক্ষুব্ধ অনেকেই জানতে চান মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা কোথায় এবং কারা এই কমিটিতে আছেন। কিন্ত কোন সদুত্তর দিতে পারেননি অধ্যক্ষ।

এলাকার বিক্ষুব্ধ অনেকেই অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন যাবৎ পকেট কমিটির মাধ্যমে এই মাদ্রাসা পরিচালিত হয়ে আসছে। অধ্যক্ষ দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ থাকায় অফিস সহকারী দিলহুর আলমের মাধ্যমে মাদ্রাসায় বিভিন্ন অনিয়ম হয়ে আসছে। ফলে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারায় আজ দুটি ছাত্রে ছাত্রজীবনের দুটি বৎসর নষ্ট হতে চলেছে।

এব্যাপারে দাখিল পরীক্ষা অনিশ্চিত হওয়া দুই ছাত্র কামরান আহমদ ও আবদুল গাফ্ফার লিমন কান্নাজড়িত কন্ঠে এ প্রতিবেদকে জানান, তারা যথাক্রমে ৩৮০০টাকা ও ৩০০০টাকা দিয়ে দাখিলের রেজিস্ট্রেশন করেন। তবে, সে সময় শুধুমাত্র তাদের ছবি নেয়া হলেও রহস্যজনক কারণে তাদের দস্তখত নেয়া হয়নি। অফিস সহকারী দিলহুর আলম নিজেই সব পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফরমে ডান হাতে বাম হাতে দস্তখত করেন। এছাড়াও, কামরান ও লিমন সব পরীক্ষার্থীর সাথে প্রি-টেস্ট ও টেস্টে অংশ নেন। অথচ, গত সোমবার এডমিট কার্ড এলেও কামরান ও লিমনের এডমিট কার্ড আসেনি। তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তাদের নামে রেজিস্ট্রেশনই হয়নি। এসময় তারা দিলহুর আলমের বিরুদ্ধে বৃত্তির টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ করেন।

অভিযুক্ত অফিস সহকারী দিলহুর আলম তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ৬০জনের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। ৬২জনের ছবি ও টাকা নেয়া হলেও ৬০জনের রেজিস্ট্রেশন কেন কেন্দ্রে পাঠানো হল-এমন প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিতে পারেননি দিলহুর আলম। বিষয়টি মাদরাসার অধ্যক্ষ ও শ্রেণিশিক্ষকরা জানেন বলে তিনি জানান।

মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আবু তাহির মো. হুসাইন ঘটনার দায় স্বীকার করে বলেন, অফিস সহকারীর ভুলের কারণেই এমনটি ঘটেছে। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্থ দুই ছাত্র ও তাদের অভিভাবকদের সাথে আমরা কথা বলে একটা সমাধানের চেষ্টা করছি।

খাজাঞ্চী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তালুকদার গিয়াস উদ্দিন বলেন, দু’ছাত্রের দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হওয়াটা দুঃখজনক। এর দায় মাদরাসা কর্তৃপক্ষের। আমরা বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছি। সকলের সাথে কথা বলেছি। একটা সুষ্ঠু সমাধান হবে ইনশাআল্লাহ।

এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিতাভ পরাগ তালুকদার বলেন, বিষয়টি দেখার জন্যে জন্যে এখনই উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিচ্ছি। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Related posts