September 19, 2018

বিপন্ন বুড়িগঙ্গা বিপন্ন ঢাকা!

এ কে এম জাকারিয়াঃ  নগর সৃষ্টির পেছনে নদীর ভূমিকা ঐতিহ্য ধরে। আজ থেকে ৫শ বছর আগে কিংবা এরও বহু বছর আগে আমাদের বাংলাদেশের রাজধানী নগর হিসেবে ঢাকার পত্তন হয়েছিল ঢক্কা নামের বৃক্ষবহুল এই বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে।

এরপর বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে বহু পানি প্রবাহিত হয়েছে। ১৭৬৫ ঈসায়ী সালে যে ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ৯ হাজার, কালের সাক্ষী বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের সেই ঢাকার লোকসংখ্যা এখন প্রায় ২ কোটির মতো। আর আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২৯ বর্গকিলোমিটার। সময়, আয়তন, ক্রমবর্ধমান লোকসংখ্যা, অপরিকল্পিত নগরায়ন আর মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকান্ডের দরুন বুড়িগঙ্গার অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। সচল সজীব আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতীক বুড়িগঙ্গা এখন শ্রীহীন, মৃতপ্রায় বিষাক্ত এক ভান্ডার।

বুড়িগঙ্গা নদীর এই করুণ পরিণতির জন্য দায়ী মূলত অবৈধ দখলদারদের অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসন আর দূষণকারী একশ্রেণীর অবিবেচক নাগরিক। অবৈধভাবে নদীর দুই তীরে গড়ে উঠা অসংখ্য শিল্প-কারখানা, বহুতল মার্কেট, ইট-পাথর-সিমেন্টের মহাল, কাঁচামালের আড়ত, নদী ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির কারণে ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে নদীর প্রস্থ। সেই সঙ্গে একশ্রেণীর বিবেকহীন মানুষের যথেচ্ছ অপব্যবহারে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দূষণ অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছে। শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, স্যুয়ারেজের মলমূত্র, দূষিত পানি, গৃহস্থালি, বাণিজ্যিক ও মেডিকেল বর্জ্য, মৃত জীবজন্তু নিক্ষেপ, নৌযানের তেল, মবিল, গ্রিজসহ সব ধরনের তরল ও কঠিন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। বুড়িগঙ্গা নদীতে জানুয়ারি থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কোনো প্রবাহ থাকে না।

স্রোত না থাকায় বিষাক্ত বর্জ্য, মরা জীবজন্তু, ময়লা-আবর্জনা, মানুষের মলমূত্র ইত্যাদি পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এসব বর্জ্য নদীর তলদেশও ভরাট করে দিচ্ছে। পলিথিনসহ কঠিন বর্জ্য জমে নদীর তলদেশ ৩ থেকে ৪ মিটার উপরের দিকে উঠে গেছে। বিরামহীন অসংখ্য নৌযান চলাচলের কারণে রাসায়নিক বর্জ্য, তেল, আবর্জনা, মলমূত্র আর কাদা মিলেমিশে নদীর পানি ভিন্ন প্রকৃতির এক তরল পদার্থে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত বর্জ্যরেভারে ক্লেদাক্ত বুড়িগঙ্গার নোংরা ও কুৎসিৎ পানি এখন বিপক্ত। এককালের জীবনদায়িনী সৌন্দর্যময়ী স্রোতস্বিনী বুড়িগঙ্গা এখন রাজধানী ঢাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বুড়িগঙ্গার পানিতে প্রতিদিন মিশছে রাজধানীর প্রায় অর্ধকোটি মানুষের মলমূত্র, আবর্জনা এবং হাজারীবাগের ট্যানারিসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত বর্জ্য। প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যরে ৪৯ শতাংশই ফেলা হচ্ছে এই নদীতে। নিক্ষিপ্ত বর্জ্যরে ৭৮ শতাংশ মানুষের মলমূত্র গৃহস্থালি-ব্যবসায়িক ও মেডিকেল বর্জ্য। আর ট্যানারি ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য ২২ শতাংশ। ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশনের আওতায় আছে ঢাকার মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষ। বাকি ৮২ শতাংশ মানুষের মলমূত্র মিশছে বুড়িগঙ্গায়। এছাড়া ঢাকার কয়েকটি খাল এবং ২০-২৫টি নালা এসে পড়েছে বুড়িগঙ্গায়। ঢাকার আশপাশের নদী ও খালগুলোর অবস্থাও করুণ। রাজধানীর বর্জ্যের ১১ শতাংশ মিশছে তুরাগ নদীতে, বালু নদীতে মিশছে ২৭ শতাংশ আর মিরপুরের খালে মিশছে ১৩ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লিস্টডোজের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীর তালিকায় বুড়িগঙ্গার স্থান চতুর্থ। তবে জুজুটপ ডটকম বলছে, বুড়িগঙ্গা বিশ্বের তৃতীয় দূষিত নদী।

২০১৫ সালের ২০ জুন বুড়িগঙ্গার সদরঘাট থেকে গাবতলীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানির দূষণমাত্রা পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের বিশেষজ্ঞ দল। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সদরঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গার পানিতে প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য দশমিক ২৪ মিলিগ্রাম।

যদিও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০০৭ অনুযায়ী, মৎস্য ও পানিপ্রাণীর জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকা প্রয়োজন ৫ মিলিগ্রাম বা তার বেশি।

গত দুই দশকে বুড়িগঙ্গাকে রক্ষার নানা পরিকল্পনা ও প্রকল্পে ব্যয় হয়ে গেছে দেড় হাজার কোটি টাকা। তার পরও প্রাণ ফেরেনি বুড়িগঙ্গায়। রাজধানীর প্রান্তঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন পৌঁছেছে শূন্যের কোঠায়। এ অবস্থায় বুড়িগঙ্গা রক্ষায় নেয়া হচ্ছে আরো একটি প্রকল্প, যাতে ব্যয় হবে ২২৮ কোটি টাকা।

তবে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে সবার আগে ট্যানারি ও নদী ঘিরে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর করতে হবে। তা না করে যত প্রকল্পই নেয়া হোক, বুড়িগঙ্গাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না।
যুক্তরাজ্যের টেমস নদী পরিষ্কার করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লেগেছিল ৩৮ বছর। টেমসের পানি এখন মানুষ পান করতে পারে। বুড়িগঙ্গা রক্ষায়ও যদি নিয়মিত কাজ করা হয়, তাহলে এ নদীকেও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

মূলত আমরা মনে করি, নদ-নদী রক্ষার জন্য শুধু দুনিয়াবী পদক্ষেপ নয়; পাশাপাশি সম্মানিত ইসলামী অনুভূতিরও জাগরূক করা উচিত।

প্রসঙ্গত, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “প্রত্যেকেই রক্ষক। তাকে তার রক্ষিত বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”

বলাবাহুল্য, বর্ণিত নদী দূষণের বিষয়টিও এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার আওতাভুক্ত। তাছাড়া এ ব্যাপারে সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার সরাসরি নির্দেশাবলীও রয়ে গেছে।

বলা হয়েছে, ওযু করতে গিয়ে বা প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পরিমিতের বেশি নদীর পানি ব্যবহার করা মাকরূহ্। যদিও তা প্রবাহিত নদী হোক না কেন।

মূলত এ আহকাম দ্বারা সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনাতে নদীর পানি ব্যবহারে পরিমিত বোধ ও পরিচর্যা এবং সচেতনতাবোধ ও সযত্নে পদক্ষেপের কথা প্রতিভাত হয়।

উল্লেখ্য, নদী ব্যবহারে অপরিমিত প্রক্রিয়া একদিকে যেমন অপচয় যা শয়তানী কাজ রূপে চিহ্নিত। পাশাপাশি এর দূষণ প্রক্রিয়ায় হক্কুল ইবাদ নষ্ট করা হয়। যা পরিণতিতে ব্যাপক ও বিশাল আকার ধারণ করে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/১০ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts