September 20, 2018

বিদ্যুৎ স্থাপনায় নাশকতায় জেল-জরিমানা

Captureঢাকা::

ব্রিটিশ আমলের তৈরি দীর্ঘ ১০৭ বছর পুরনো বিদ্যুৎ আইন সংস্কার করে ‘বিদ্যুৎ আইন, ২০১৭’ খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন এ আইনে বিদ্যুৎ স্থাপনায় নাশকতার জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল ও ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করেন।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে এ অনুমোদনের কথা জানিয়ে বলেন, বিদ্যুৎ আইনটি ১৯১০ সালের। অনেক পুরনো আইন দিয়েই চলছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পুরনো ইংরেজি আইনগুলো বাংলায় করার অংশ হিসেবে ১৯১০ সালের বিদ্যুৎ আইন হালনাগাদ করে নতুন এ আইন হচ্ছে। অর্থাৎ দীর্ঘ দিনের পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ সেক্টরেও অনেক পরিবর্তন চলে এসেছে। এ জন্য এটিকে পরিমার্জন করে আনা হয়েছে। মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ায় বিদ্যুৎ আইন পাস করতে এখন জাতীয় সংসদে তোলা হবে। সংসদে পাসের পর এটি কার্যকর হবে।

বিদ্যুৎ স্থাপনায় অনিষ্ট সাধনের ক্ষেত্রে নতুন আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কেউ বিদ্যুৎকেন্দ্র, উপ-কেন্দ্র, বিদ্যুৎ লাইন বা খুঁটি বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি নাশকতার মাধ্যমে ভেঙে ফেললে বা ক্ষতিগ্রস্ত করলে বা বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে সরবরাহ লাইন বা যন্ত্রের ওপর কোনো বস্তু নিক্ষেপ করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন ৭ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এটি স্যাবোটাজের আকারে ধরা হয়েছে। এটি স্যাবোটাজ বলতে যা বোঝায় সেটা। অথচ আগের আইনে এই শাস্তি ছিল না, এটাই এই আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি।

শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, ইন্ডিপেনডেন্ট সিস্টেম অপারেটর নামে একটি সংস্থা গঠন করা হবে। যে সংস্থার কাজ হবে বিদ্যুতের লোড ব্যবস্থাপনা করা। আইনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা (পিডিবি, ডেসকো, ডেসা) এ আইনের কোনো শর্ত ভঙ্গ করে বা নিজস্ব এলাকার বাইরে সংযোগ দিলে এক বছরের জেল ও এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

এ আইনে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য সরকার প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একটি ইন্ডিপেনডেন্ট সিস্টেম অপারেটর প্রতিষ্ঠা করবে। ইন্ডিপেনডেন্ট সিস্টেম অপারেটর নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রবাহ মনিটরিং, সিডিউলিং এবং মেরিট অর্ডার ডেসপাস ও বিতরণ ব্যবস্থা বা কোম্পানির চাহিদানুযায়ী ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে লোড বরাদ্দ করবে। মানে লোড ম্যানেজমেন্টের জন্য, কন্ট্রোলের জন্য একটি সংস্থা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে আইনে।

তিনি বলেন, কোনো লাইসেন্সি টেলিফোন লাইনের কোনো অংশের মধ্যে সার্ভিস লাইন বা বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে নতুন পূর্ত কর্ম বা এর মেরামত বা বিদ্যমান পূর্ত কর্মের সংশোধন বলতে ইচ্ছুক হলে সংশ্লিষ্ট টেলিযোগাযোগ সংস্থাকে এ কর্মের বিষয়ে উল্লেখ করে নোটিশ দেবে। এর মধ্যে ইন্টারনেট, সাবমেরিন ক্যাবল-ট্যাবল এগুলো সব এর মধ্যে আসবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, যারা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পিডিবি (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) ও আরইবি (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) এদের কোনো শাস্তির বিধান ছিল না। প্রস্তাবিত আইনে এ বিষয়টি আনা হয়েছে। যদি কোনো লাইসেন্সি (বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান) কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনো দোষ করে বা বিধি লঙ্ঘন করে তবে শাস্তি পেতে হবে। আইনের ৪৩ ধারায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ কর্মচারীরা যদি কোনো অনিয়মের সাথে যুক্ত হন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনিয়মে সহায়তা করেন তাহলে তাদের ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

শফিউল আলম বলেন, সরবরাহ এলাকার বাইরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে বা বিদ্যুৎ লাইন করলে, আইন বা বিধির কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখলে, ত্রুটিযুক্ত বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করলে সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন বা বিতরণ কাজে নিয়োজিত কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মচারী এ আইনে উল্লেখ করা কোনো অপরাধ করলে বা অপরাধ সংগঠনে সহায়তা বা প্ররোচনা বা ষড়যন্ত্র করলে তিনি ওই অপরাধের জন্য দণ্ডিত হবেন। আইনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই যদি কোনো ব্যক্তি এমন অপরাধ করে তবে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। নতুন আইনে বিদ্যুৎ চুরির শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা চুরি করা বিদ্যুতের মূল্যের দ্বিগুণ বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা যেটা বেশি হয় সেটি। আগে জরিমানা ছিল ১০ হাজার টাকা।

সচিব বলেন, বিদ্যুৎ চুরি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হলে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা বিদ্যুৎ চুরির মূল্যের দ্বিগুণ বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগে কোনো যন্ত্র, ডিভাইস বা কৃত্রিম পদ্ধতি স্থাপন বা ব্যবহার করলে তিনি ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এটা মিটার টেম্পারিং হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আগের আইনে জরিমানা ২০ হাজার টাকা।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ অপচয়ে এক থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চুরি ও অপসারণ করলে ২ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কোনো যন্ত্রপাতি বা বিদ্যুতের লাইনের সামগ্রী চুরি করা মালামাল দখলে রাখলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউদ্দিনের মৃত্যুতে মন্ত্রিসভার শোক :
মন্ত্রিসভা একাত্তরে সুন্দরবন অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। মন্ত্রিসভা বৈঠকের শুরুতেই এই শোক প্রস্তাব নেয়া হয় বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী ও মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব:) জিয়াউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে মন্ত্রিসভা শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।

আশির দশকে এইচ এম এরশাদ সরকারের সময় বেশ কিছু দিন সিঙ্গাপুরে ছিলেন এই মুক্তিযোদ্ধা। পরে দেশে নিজের এলাকায় ফিরে শুরু করেন শুঁটকির ব্যবসা। ১৯৮৯ সালে তিনি পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

একাত্তরে সুন্দরবন অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত রাখতে নেতৃত্ব দেয়া এই মুক্তিযোদ্ধা পরে ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন তোলেন। স্থানীয়ভাবে তাকে ডাকা হতো সুন্দরবনের ‘মুকুটহীন সম্রাট’।

মৎস্যজীবীদের সংগঠন দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান জিয়াউদ্দিন সুন্দরবন এলাকায় ডাকাত নির্মূল অভিযানেও সক্রিয় ছিলেন। ২০১৩ সালে বনদস্যুদের গুলিতে তিনি আহত হন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সুন্দরবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তিনি ‘সুন্দরবন সমরে ও সুষমায়’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবন’ নামে দু’টি বইও লিখেছেন।

Related posts