November 16, 2018

বিদেশে যাচ্ছে পশুর অন্ডকোষ

এক সময় পশু জবাইর পর এর যেসব উচ্ছিষ্ট অংশ ফেলে দেয়া হতো, বর্তমানে সেসব উচ্ছিষ্ট অংশগুলোর কিছু অংশ দিয়ে সুস্বাদু খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে। রপ্তানিও করা হচ্ছে ভক্ষণযোগ্য এসব উচ্ছিষ্ট অংশ।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভক্ষণযোগ্য উচ্ছিষ্ট অংশের মধ্যে পুরুষ গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়ার অন্ডকোষের চাহিদা বিদেশে অনেক বেশি। বিশেষ করে থাইল্যান্ড, জাপান, হংকং, সিঙ্গাপুর, চীনে এর বড় বাজার। এসব দেশে মদের সঙ্গে অন্ডকোষ দিয়ে তৈরি সুস্বাদু খাবার বিশেষ আকর্ষণ। এখানকার মদের বারগুলোয় এসব উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়।

পশু ও মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, বছর দশেক আগেও ভক্ষণযোগ্য পশুর উচ্ছিষ্ট অংশের ব্যবসায় আগ্রহ ছিল না তেমন। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর ব্যাপক চাহিদা থাকা ও লাভজনক হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকেছেন এ ব্যবসায়ে। খুব ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও দেশের অভ্যন্তরেও বাজার গড়ে উঠেছে ভক্ষণযোগ্য উচ্ছিষ্ট অংশের। একসময় যা সম্পর্কে দেশের মানুষের ছিল ভ্রান্ত ধারণা। কিন্তু এখন জানায় অনেকেই ঘরে মুখরোচক খাবার প্রস্তুত করে খাচ্ছেন। পাঁচ তারকা হোটেল থেকে মধ্যম পর্যায়ের রেস্তোরা, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, বারে মুখরোচক খাবার প্রস্তুত করে বিক্রি করা হচ্ছে হরদম।

হাজারীবাগ, কাপ্তান বাজার, মিরপুর, ঠাটারি বাজার, খিলগাঁও রেলগেট বাজারসহ রাজধানীর বৃহৎ মাংস বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, অন্ডকোষ যে ভক্ষণযোগ্য এটা তারাও এসময় জানতেন না। এখন তারা নিজেরাও এটি দিয়ে স্যুপ, ভূনা, ফ্রাই, কাবাব প্রস্তুত করে খাচ্ছেন। প্রতিদিন অসংখ্য ক্রেতাও আসছেন এসব কিনতে। এমনকি নগদ অর্থ দিয়ে অগ্রিম বুকিংও দিয়ে যান কেউ কেউ।

সূত্র জানায়, এর কেজি ১০০ থেকে ১২০ ও প্রতিপিস ৩০ থেকে ১০০টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে গরুর মাংস ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই গাভী জবাই করেন। আর মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মাংস বিক্রেতাদেরও বেশিরভাগই মহিলা ছাগল-ভেড়া জবাই করেন। ফলে অণ্ডকোষ খুব বেশি পাওয়া যায় না।

হাজারীবাগের মাংস ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, ষাঁড়ের দাম বেশি হওয়ায় মাংসের দামও বেশি। এজন্য কাস্টমার কম। গাভীর দাম কম বিধায় মাংসের দামও কম, এজন্য ক্রেতা বেশি।

কাপ্তান বাজারে ছাগল-ভেড়ার মাংস বিক্রেতা ইমদাদুল জানান, পুরুষ ছাগল-ভেড়া পাওয়া কঠিন। পেলেও দাম খুব বেশি পড়ে। তাই বেশি দামে মাংস বিক্রি করতে হয় বলে ক্রেতা কম। এজন্য মহিলা ছাগল-ভেড়ার মাংসই বিক্রি করা হয়।

টিপু সুলতান রোডে ৬০ বছর বয়সী একটি দোকানের সন্ধান পাওয়া যায়, এক নামেই পরিচয় দোকানটির, ‘বাদশা মিয়ার মাংসের দোকান’। তারা সারাবছরই ষাঁড়ের মাংস বিক্রি করেন। দোকানের অন্যতম কর্তা এমদাদুল জানান, অণ্ডকোষ তার এখানে অগ্রিম অর্ডার পড়ে। কোনো কোনো সময় তারাও এসব ভক্ষণ করেন স্যুপ, কাবাবসহ নানা আইটেম বানিয়ে।

মাংসের মতো শুধু অণ্ডকোষ বিক্রির হয় না কোনো বাজার বা দোকানে, এর কোনো আড়তও নেই। রপ্তানিকারকরা বিভিন্ন এলাকার মাংসের দোকানে কর্মী নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন। তারাই এসব সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠান। ব্যবসায়ীরা এসব গুদামজাত করেন।

পুরান ঢাকার বংশালের অণ্ডকোষ ব্যবসায়ী জমির উদ্দিন বলেন, লোকজন দিয়া এসব সংগ্রহ কইরা গুদামে রাখি। পাঁচ-ছয় মন খানেক জমলে পাঠাই চট্টগ্রাম। তারা এগুলি জাহাজে কইরা থাইল্যান্ডে পাঠায় শুনছি। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত কোরবানির ঈদে চার টন অণ্ডকোষ জোগাড় করছিলাম। কোরবানি ছাড়া মিলাইতে খুব কষ্ট হয়। কেননা, পুরুষ পশু জবাই হয় কম।

এদিকে, শুধু অণ্ডকোষই নয়, হাড় থেকে শুরু করে শিং, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রথলি, রক্ত, চর্বি, পিত্ত বা চামড়ার অব্যবহত অংশ সবই রপ্তানিযোগ্য বলে জানান ব্যবসায়ীরা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, রাজধানীতে প্রতিদিন এসব উচ্ছিষ্ট বিক্রি হয় অন্ততঃ ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকায়।

জানা গেছে, রাজধানীর হাজারীবাগের কিছু ব্যবসায়ী এই উচ্ছিষ্টের বাণিজ্য করে আসছেন। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে এগুলো জড়ো হয় তাদের কারখানায়। গরু-ছাগলের শিং, হাড়সহ দেহের বিভিন্ন অংশ দাম দিয়েই কেনেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে হাজারীবাগসহ সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে এই হাড়ের ব্যবসা। রাজধানী ছাড়াও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাড় সংগ্রহ করে তা হাজারীবাগের কারখানায় নিয়ে আসা হচ্ছে। গরু, মহিষ ও ছাগলের এসব হাড় টাকা দিয়েই সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলেন, জবাইয়ের পর একটি মাঝারি আকারের গরু থেকে ১৫ থেকে ২০ কেজি হাড় ফেলে দেওয়া হয়। আর এই হাড় সংগ্রহ করে প্রতিদিন ব্যবসা হয় অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। নাড়িভুঁড়ি বিক্রি হয় আরো অন্তত ১২ লাখ টাকার।

জানা যায়, গরুর হাড় দিয়ে তৈরি হয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ক্যাপসুলের কাভার। নাড়ি দিয়ে অপারেশনের সুতা, রক্ত দিয়ে পাখির খাদ্য, চর্বি দিয়ে সাবান, পায়ের খুর দিয়ে অডিও ভিডিওর ক্লিপসহ আরও কিছু জিনিস। সিরামিক শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে চাহিদা রয়েছে পশুর বিভিন্ন অংশের হাড়ের।

মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার হাড় ব্যবসায়ী নিয়াজ আলী বলেন, লোক দিয়ে কেজিপ্রতি ৪ টাকা দরে বাসাবাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করি। পরে ৬-৮ টাকা দরে ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করি।

বাংলাদেশ বোন এক্সপোর্টার অ্যান্ড মাচের্ন্ট অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায় হাড় কেনা-বেচায় কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। রপ্তানির পাশাপাশি দেশেও গড়ে উঠছে নানা শিল্প-কারখানা। হাড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে দেশীয় পণ্য। শুধুমাত্র কোরবানি ঈদের দিন থেকে পরবর্তী ১ মাসে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন পশুর হাড় সংগ্রহ করা হয়। এগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। উচ্ছিষ্ট রফতানি ঘিরে দেশীয় মার্কেটেই প্রতিবছর প্রায় ১২০ কোটি টাকার লেনদেন হয়।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts