September 25, 2018

বিজিবি-পুলিশে-কাষ্টমস্ ক্ষমতাসীন দলের কর্মী ভাই ভাই দেশী শিল্পের ধ্বংস চাই


শামসুজ্জোহা পলাশ,
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ
আসন্ন ঈদ কে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তের ৮ টি রুট দিয়ে চোরাচালানীরা ভারতীয় শাড়ি, থ্রি পিস, প্যান্ট পিস, থান কাপড়, জুতা সেন্ডেলসহ বিভিন্ন কসমেটিকস্ বিজিবি-পুলিশ ও কাষ্টমসকে ম্যানেজ করে নিয়ে আসছে অবাদে। ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় ও ছত্রছায়ায় বিজিবি-পুলিশ-কাষ্টমসের নিয়োগ করা লাইন ম্যানরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়ে চোরাচালানীদের এসব মালামাল নিরাপদে সঠিক সন্তব্যে পৌছেদিতে সার্বিক সহযোগীতা করছে। স্থানীয় ভাবে এসব চোরাচালানীদেরকে লাগেজ পার্টি বলা হয়।

কতিপয় বিজিবি, পুলিশ ও কাষ্টমসের অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারী নিজেদের আখের গোছালেও সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। অন্যদিকে ভ্যাট ট্যাক্স ফাঁকি দিকে অবৈধ পথে ঢোকা এসব পণ্যের সাথে প্রতিযোগীতায় টিকতে না পেরে দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে পড়ছে রুগ্ন আর বন্ধ।

দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্ত থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন রুটের রেলপথ ও সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হওয়ায় খুব অল্প সময়েই চোরাচালানীদের কাছে এই উপজেলার সীমান্ত পথগুলো খুবই জনপ্রীয় হয়ে উঠেছে। ভারত-বাংলাদেশ সরাসরি চলাচলকালী একমাত্র মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটিও চলাচল করে এই সীমান্ত দিয়ে।

যার ফলে ঢাকার লাগেজ পার্টির সুন্দরী নারীরাও সরাসরি যোগ দিয়েছে এই চোরাচালানীতে। সপ্তাহে ৬ দিন চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি যে তিন দিন ভারত থেকে বাংলাদেশে আসে সে তিন দিন ট্রেনের বাংকার বা র‌্যাকগুলো থাকে লাগেজ পার্টির মহিলাদের দখলে। নিজেদের সততার প্রমান দিতে দর্শনা কাষ্টমস্’র কর্মকর্তারা লোক দেখানো কখনও কখনও ট্রেনে অভিযান চালিয়ে ৩০/৪০ লাখ টাকার অবৈধ শাড়ী, কাপর ও থ্রি পিস আটক করে সাংবাদিকদের ডেকে ফটো সেশন করে থাকেন।

অবশ্য আটককৃত ওই সকল শাড়ী, কাপড় ও থ্রি পিসগুলো পিছনের দরজা দিয়ে রাতের আধারে চলে যায় চোরাচালানীদের হাতে।

গত ১৫ জুন ও ২০ জুন চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি’র সদস্যরা পৃথক অভিযান চালিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস, থান কাপড়সহ বিভিন্ন কসমেটিক্স আটক করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের তৈরী পোষাক মালিক সমিতি বিজিএমইএর তথ্য মতে সম্প্রতি প্রায় সাড়ে ৩ শ’ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও ৩ থেকে ৪ শ’ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী বন্ধের পথে। এতেই প্রমান হয় কতিপয় অসৎ সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীর কারণে দেশীয় শিল্প কলকারখানার অবস্থা কি।

কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারীর উৎকোচ নিয়ে যেমন এসব মালামাল দেশে ঢোকাচ্ছে তেমই বিজিবি’র সাহসী ও সৎ কর্মকর্তা কর্মচারীদের অভিযানে এ সব মালামালের কিছু চালান মাঝে মধ্যে ধরাও পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লাগেজ পার্টির মূল মালিক বা মহাজনরা অধিকাংশই ঢাকা, পোড়াদহ ও ঈশ্বরদীর। এরা বৈধ পথে কলকাতায় গিয়ে লাখ লাখ টাকার শাড়ি, থান কাপড় ও থ্রি পিস ও কসমেটিক্স কিনে ভরতের সীমান্তবর্তী এলাকার নির্দ্রিষ্ট ব্যাক্তির হেফাজতে রেখে আসে। পরে সময় সুযোগ বুঝে ভারত ও বাংলাদেশের দালালরা কমিশনের মাধ্যমে ওইসব মালামাল ৫০০ টাকা জোন (লেবার/কামলা) হাজিরায় পুরুষ ও মহিলারা সড়ক ও রেল পথে নির্দ্রিষ্ট স্থানে পৌছে দেয়।

দামুড়হুদা উপজেলার নীমতলা, দর্শনা চেকপোষ্ট জয়নগর, বাড়াদি, চাকুলিয়া, ফুলবাড়ী, ঠাকুরপুর, মুন্সিপুর, হুদাপাড় দিয়ে ভারতীয় শাড়ি, থ্রি পিছ, প্যান্ট পিছ, থান কাপড়, জুতা স্যান্ডেল ও বিভিন্ন কসমেটিক্স নিয়ে আসছে চোরাচালানীরা। আর টাকার বিনিময়ে এসব অবৈধ মালা মালের অ-লিখিত বৈধতা দিচ্ছে কতিপয় অসৎ বিজিবি-পুলিশ-কাষ্টমসের কর্মকর্তা কর্মচারী। এসব সীমান্তে বিজিবি, পুলিশ ও কাষ্টমস্’র টাকা তোলার জন্য সরকার দলীয় কতিপয় নেতাকর্মীর ছত্রছায়ায় নিয়োগ করা লাইন ম্যান রয়েছে।

এরা হলো দর্শনা চেকপেষ্ট জয়নগরের  বিজিবির লাইন ম্যান বাবলু ওরফে জামাই বাবলু, নাসির পুলিশের কুরবান, ইজা কাষ্টমসের মমিন ও ডিএসবির কুলি আলী টাকা তোলে। লাগেজে প্রতি বিজিবি নামে তোলা হয় ৩ হাজার টাকা, পুলিশের নামে ১ হাজার ২ শত ৫০ টাকা, কাষ্টমসের নামে ১ হাজার ৫ শত টাকা ও ডিএসবি পুলিশের নামে ১ শত টাকা।

এই চেকপোষ্ট দিয়ে চোরাই পথে প্রতিদিন ৫ টি থেকে ৫০ টি পর্যন্ত করে লাগেজ আসে। এই লাগেজ ভারত থেকে বড় ঢপে করে নিয়ে বাংলাদেশী সীমান্তবর্তী জয়নগর গ্রামে পৌছায়। পরে এখান থেকে ৫০০ টাকা জোন (লেবার/কামলা) হাজিরায় পুরুষ ও মহিলারা বস্তায় ভরে এসব শাড়ি, কাপড় ও থ্রি পিস ও কসমেটিক্স দর্শনা হল্ট ষ্টেশন নিয়ে ট্রেন যোগে এবং সড়ক পথে তা চোরাচালানীদের নির্দ্রিষ্ট গস্তব্যে পুড়াদাহ, ঈশ্বরদী অথবা ঢাকায় পৌছে দেয়। সপ্তাহের নির্দ্রিষ্ট দিনে পুড়াদাহে বসে দেশের বৃহত্তর শাড়ির হাট। তাই খুব সহজেই এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যায় অবৈধ পথে ভারত থেকে আনা এসব শাড়ি, থান কাপড় ও থ্রি পিস।

মালামালের  মুল মালিকরা এখানে কেউ থাকে না। সম্পূর্ণ ব্যবসাটায় চলে বিশ্বাসের উপর কমিশনের  মাধ্যমে। ব্যবসা করে। দর্শনা চেকপোষ্ট জয়নগর কমিশনের ব্যবসা করে বাবলু জামাই, কুলি আলী, শহিদুল কানা, করিম মোল্লা, জামসেদ, রহিদ, মহিদুল, শওকত, কুদ্দুসসহ প্রায় অর্ধশতধীক চোরাচালানী।

এছাড়া মুন্সিপর সীমান্তে বিজিবি লাইন ম্যান আকবর, ফারুক, শাহাবুদ্দিন পুলিশের হাকিম, কালু হুদাপাড়ার সীমান্তে বিজিবির বাবু, নাজমুল হক গ্যাগা পুলিশের উছমান ঠাকুরপুর সীমান্তে বিজিবির কাইজার পুলিশের আব্দুল হাই, ফুলবাড়ী সীমান্তে বিজিবির কালু, জলিল পুলিশের মিলন, চাকুলিয়া সীমান্তে বিজিবির মনি, আরিফ পুলিশের হাবিবুর, শসসের, স্বপন টাকা তোলে।

এখানে বিজিবি ১ শত পিছ শাড়ি ও থ্রি পিসে নেয় ২ হাজার টাকা, পুলিশ ১ মাস চুক্তি ১ জন চোরাচালানী প্রতি ৫ হাজার টাকা। এখানে প্রায় শতাধিক সংঘবদ্ধ চোরাচালানী রয়েছে। এরা প্রতিনিয়ত সীমান্ত দিয়ে মালামাল নিয়ে আসে।

এসবের পাশা পাশি এসব সীমান্ত দিয়ে একই পন্থায় এদেশ থেকে সোনা ও মানুষ পাচার হয়ে থাকে।

চুয়াডাঙ্গা ৬ বিজিবি পরিচালক মোহাম্মদ আমির মজিদ বলেন, এই চোরাচালানীদের সাথে বিজিবির কোন সদস্য জড়িত আছে কি না জানা নেই। তবে প্রশ্ন যখোন উঠেছে তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে বিজিবি’র কোন সদস্য এই চোরাকারবারীদের সাথে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার রশীদুল হাসানও অভিন্ন ভাষায় বলেন, পুলিশের কোন সদস্য এই চোরাচালানের সহযোগীতা করে থাকলে তদন্ত পূর্বক তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ৩০ জুন ২০১৬

Related posts