September 24, 2018

বাতিল হচ্ছে নিজামী-সাঈদীর প্লট, আজ-কালের মধ্যেই চিঠি!

ঢাকাঃ যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর পর অপর যুদ্ধাপরাধী দলটির নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্লটও বাতিল করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ইতোমধ্যেই ফাঁসি কার্যকর হয়েছে নিজামীর। আর সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাঈদী কারাগারে আছেন। তার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে ওই রায়ের পুনর্বিবেচনা চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ আবেদন রয়েছে শুনানির অপেক্ষায়।

সোমবার (২২ আগস্ট) বা মঙ্গলবার (২৩ আগস্ট) যেকোনো দিন সময় দুই যুদ্ধাপরাধীর ঠিকানায় প্লট বাতিল সংক্রান্ত রাজউকের চিঠি পৌঁছে দেওয়া হবে। এরপর আইন অনুযায়ী নিজামী ও সাঈদীর প্লটের মালিকানা রাজউকের অধীনে চলে আসবে।

সোমবার দুপুরে রাজউকের চেয়ারম্যান এম বজলুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সকল আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নিজামী ও সাঈদীর প্লট বাতিল করা হয়েছে। আজ বা কালের মধ্যেই তাদের ঠিকানায় চিঠি যাবে। এরপর আইন অনুযায়ী ওই প্লটের মালিক রাজউক। তাদের প্লট নিয়ে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে’।

‘আইন অনুসারে তাদের পরিবার হাইকোর্টে কোনো রিট আবেদন না করলে তাদেরকে প্লট ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হবে’।

রাজধানীর বনানীর ১৮ নম্বর রোডের ৬০ নম্বর প্লটটি নিজামীকে বরাদ্দ দিয়েছিলো বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। পরবর্তীতে মিশন ডেভেলপার লিমিটেড কোম্পানিকে দিয়ে ওই প্লটে বাড়ি তৈরি করে নেন তিনি। অফ হোয়াইট রঙের ‘মিশন নাহার’ নামের ওই ছয়তলা বাড়িটিতে মোট দশটি ফ্ল্যাটের পাঁচটি নিজামীর। এ বাড়ির নামের প্রথম অংশ ডেভেলপার কোম্পানির নামের অংশবিশেষ এবং শেষ অংশটি নিজামী স্ত্রী শামসুন নাহারের নামের শেষ অংশ, যিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

১৯৯৫ সালে আজিজুর রহিম নামের এক ব্যক্তিকে পাঁচ কাঠার ওই প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালের ২১ মে আগের বরাদ্দ বাতিল করে প্লটটি তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীকে বরাদ্দ দেয় রাজউক। বাড়িটি তৈরি হওয়ার আগেই গ্রেফতার হন নিজামী। ফলে তিনি আর এ বাড়িতে থাকতে পারেননি। নিজামীর ৫টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৬এ এবং ৬বি ফ্ল্যাট (টপ ফ্লোর) দু’টিতে নিজামীর পুরো পরিবার বসবাস করে। আর বাকি ৩টি ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

গত ২৮ জুলাই রাজউকের ০৭/২০১৬তম সাধারণ সভায় (বোর্ড সভা) নিজামীর প্লট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজামীকে প্লট বরাদ্দে পাঁচটি ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়। ত্রুটিগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্লট বরাদ্দকালীন মূল হলফনামা না থাকা ও দাখিলীয় ফটোকপি হলফনামায় নিজামীর সই না থাকা, মিশন ডেভেলপারের আমমোক্তার হিসেবে রাজউকের অনুমোদন না পাওয়া, আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার, সরকারের অনুশাসন ছাড়াই নিজামীর নামে প্লট বরাদ্দ এবং পরবর্তীতে পাওয়া সরকারের অনুশাসন রাজউকের বোর্ড সভায় (সাধারণ সভা) উপস্থাপন না করা।

আরেক যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর নামে পূর্বাচলে ৫ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ ছিল। উত্তরা ৭নং সেক্টরের ১০৭নং রোডের ৮৬নং প্লটটি ছিল তার নামে। সেটিও বাতিল করেছে রাজউক। বাতিলের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, কিস্তির টাকা পরিশোধ করেননি সাঈদী।

রাজউক সূত্রে জানাযায়, ২০০৬ সালের ৯ মে বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী রাজউকের একটি প্লট পেতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানান। একই আবেদনে তিনি বনানী আবাসিক এলাকার ১৮ নম্বর সড়কের ৬০ নম্বর প্লটটি সরেজমিনে অবরাদ্দকৃত অবস্থায় খালি আছে বলেও জানান।

নিজামীর এ আবেদনে মন্ত্রীর নির্দেশে রাজউকের ০৮/২০০৬তম সাধারণ সভায় নিজামীকে বনানী অথবা উত্তরায় প্রাপ্তি সাপেক্ষে পাঁচ কাঠা আয়তনের একটি প্লট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের আলোকে ১৩ সেপ্টেম্বর নিজামীর নামে বনানীর ১৮ নম্বর সড়কের ৬০ নম্বর প্লটের সাময়িক বরাদ্দপত্র দেয় রাজউক। এক মাস পর দেওয়া হয় চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র। চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র পাওয়ার চারদিনের মাথায় (১৫ অক্টোবর) নিজামীকে সরেজমিনে প্লটটির দখল বুঝিয়ে দেয় রাজউক।

এরপর নিজামী প্লটের ওপর ভবন নির্মাণ ও আমমোক্তারও নিয়োগ করেন। এর আগে প্লটের পুরো মূল্য পরিশোধ করেন তিনি।

নিজামীকে এই প্লট বরাদ্দ দেওয়ার সময় রাজউকের প্লট বরাদ্দ বিধিমালা ১৯৬৯ এর ১৩/এ ধারা অনুসরণ করা হয়। ১৩/এ ধারাটি হল দেশের প্রতি যারা অবদান রেখেছেন তাদের প্লট বরাদ্দ দেওয়ার জন্য প্রযোজ্য। অথচ এই নিজামীকেই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কিছুদিন আগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, ৬০ নম্বর প্লটটি নিজামীকে বুঝিয়ে দেওয়ার পরপরই প্লটের মূল ফাইল রাজউক থেকে গায়েব হয়ে যায়। এ ব্যাপারে রাজউকের একজন সহকারী পরিচালক ২০০৬ সালের ১৭ অক্টোবর মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এই ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর তারিখ থেকে ফাইলটি পাওয়া যাচ্ছে না।

কমিটির মন্তব্যে বলা হয়, এসব কারণে এটা প্রতীয়মান হয় যে, তিনি (নিজামী) হয়ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে থাকতে পারেন। প্লটটির মূল ফাইল হারিয়ে গেলেও তা উদ্ধারে নিজামীর পক্ষ থেকে কোনো চাপ না দেওয়া এবং নির্লিপ্ততার বিষয়টিও রহস্যজনক মনে হয়।

রাজউক জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির রিপোর্টটি বিবেচনায় এনে নিজামীর প্লট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রাজউকের সিদ্ধান্তে বলা হয়, সরকারের অনুশাসন ছাড়া পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিবিহীন আবেদনের বিষয়ে রাজউক কর্তৃক প্লট বরাদ্দ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনিয়মের পর্যায়ভুক্ত। আবেদনকারীকে হলফনামা দাখিল করতে বলা হলে তিনি স্বাক্ষরবিহীন (স্বাক্ষরিত লেখা) হলফনামার ফটোকপি দাখিল করেন। হলফনামা দাখিল না করা সত্ত্বেও প্লট প্রদানের লক্ষ্যে গৃহীত সকল কার্যক্রম গুরুতর অনিয়ম। সরকারের ১৩এ ধারার অনুশাসন কর্তৃপক্ষের সাধারণ সভায় উপস্থাপন না করে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত গৃহীত অন্যান্য কার্যক্রম যথাযথ হয়নি, যা অনিয়মের শামিল।

Related posts