April 25, 2019

বাজেয়াপ্ত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীর সম্পত্তি

যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের দাবি

স্টাফ রিপোর্টারঃ   আদালত প্রদত্ত মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড কার্যকরই নয়, যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তেরও দাবি উঠেছে দেশব্যাপী। এ ব্যাপারে সরকারও চিন্তাভাবনা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সব যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করাসহ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তে শিগগির একটি প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে সংশোধন করা হতে পারে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন-১৯৭৩।

জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বোর্ড সভা ডেকে বাতিল করতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নামে বরাদ্দকৃত ৫ কাঠার প্লট। গত শনিবার দিনগত রাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। এ বিষয়ে রাজউকের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, মুজাহিদকে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে রাজধানীর উত্তরায় ৫ কাঠা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানে তিনি ছয়তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাজার আদেশ দেওয়ায় বরাদ্দকৃত প্লটটি বাতিলের দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে।

ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আলী আহসান মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী ও মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামে বরাদ্দকৃত প্লট বাতিল সংক্রান্ত নথিপত্র তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয় রাজউকের বোর্ড সভায়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী রাজউকের এস্টেট বিভাগ প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্তসহ নথিপত্র রাজউকের বোর্ডসভায় উত্থাপনের জন্য প্রস্তুত রেখেছে।
এই নথি রাজউকের বোর্ড সভায় উত্থাপিত হলেই ওই তিনজনের নামে বরাদ্দকৃত প্লট বাতিল হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান জিএম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া বলেন, আলী আহসান মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী ও মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামে রাজউক থেকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাদের বিরুদ্ধে সাজা কার্যকর হওয়ায় এসব প্লটের বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত জানাবে রাজউক তাই কার্যকর করবে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন জানান, নিজামী-মুজাহিদের প্লটগুলো বাতিলের আইনগত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের রাষ্ট্রীয় কাজে অবদানের জন্য প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, এটা সত্য নয়। আমরা অবশ্যই প্লটগুলো ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করব। তবে আপিল বিভাগ থেকে চূড়ান্ত রায় আসার আগে প্লট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।

এদিকে শুধু মুজাহিদ, নিজামী ও সাঈদীর প্লট বাতিলই নয়, যেসব যুদ্ধাপরাধী আদালতের রায়ে সাজা পাচ্ছেন, তাদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সংশোধনের দাবি জোরালো হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের রায় কার্যকরের পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে শহীদ পরিবারগুলোকে দিতে হবে। কারণ একাত্তরে শহীদদের পরিবারগুলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে, অসহায় জীবনযাপন করছে। ’৭৫-এর পর থেকে এই যুদ্ধাপরাধীরাই বেশিরভাগ সময় ক্ষমতায় ছিল। তখনো তারা শহীদ পরিবারকে অপমান করেছে, ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। এখন সরকারের উচিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও সম্মান জানানো। যেসব যুদ্ধাপরাধী এতদিন ক্ষমতায় থেকে বিশাল বিত্তের মালিক হয়েছে, তাদের দন্ড কার্যকরের পাশাপাশি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে শহীদ পরিবারগুলোকে দেওয়া উচিত।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের কারণে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক শহীদ পরিবারে অন্ধকার নেমে আসে। পরিবারগুলো মানসিক, শারীরিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ একই সময়ে যুদ্ধাপরাধীরা সম্পদের পাহাড় গড়েছে। এখন সরকারের উচিত তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে যেসব শহীদ পরিবারের প্রয়োজন রয়েছে, তাদের কল্যাণে এ অর্থ ব্যয় করা।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার একটি প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। গত ৫ জুলাই রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন-১৯৭৩ সংশোধনের আহ্বান জানান। বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন আয়োজিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের প্রধান খসড়া প্রণয়নকারী অধ্যাপক অটো ভনের স্মরণসভায় মন্ত্রী বলেন, যেসব যুদ্ধাপরাধী আদালতের রায়ে সাজা পাচ্ছেন, তাদের সম্পদও বাজেয়াপ্ত করতে হবে। না হলে সেই অর্থ দিয়ে তাদের উত্তরসূরিরা যা খুশি তাই করবে। এটা হতে দেওয়া যায় না। তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে যুদ্ধাপরাধ আইন সংশোধন করতে হবে।




দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts