November 16, 2018

বাকশাল – বাংলাদেশ এর প্রেক্ষাপট


সাঈদুর রহমান সাঈদ
বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ। তার নিজস্ব স্বকীয়তা, নিজস্ব পতাকা অর্জনের প্রাথমিক অবস্থায় নানা প্রতিকুলতার মুখোমুখী হতে হয় তাকে । তার মধ্যে ছিল তথাকথিত সর্বহারা পাটির স্বসস্ত্র আনাগোনা, সদ্য সৃষ্ট জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর নানা ধরনের অপকর্ম এবং একদল অবৈধ অস্ত্রধারী তথাকথিত বিপ্লবীদের বিবিধ কার্যক্রম। তার উপরে ঐসব তথাকথিক বিপ্লবীদেরকে ৭১ এর পরাজিত শক্তিসমূহের আন্তর্জাতিক ইন্দন দেশকে অস্থিরতার এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। রক্ষী বাহিনী তৈরী করে ঐসব অস্ত্রধারীদেরকে শায়েস্তা করতে গেলে তারা চলে যায় আন্ডারগ্রাউন্ডে। এই পরিস্থিতিতে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, জনকল্যানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বংগবন্ধু শেখ মুজিব প্রবর্তন করেন একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, বাংলাদেশ কৃষক, শ্রমিক, আওয়ামী লীগঃ সংক্ষেপে বাকশাল।

আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবি এবং স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদ ১৯৭৫ সনে বংগবন্ধুর একদলীয় শাসন (বাকশাল) প্রবর্তনের জন্য বংগবন্ধুর সমালোচনা করে থাকেন। এমনকি কেহ কেহ তাঁকে স্বৈরাচারী বলতেও দ্বিধা করেন না। কিন্তু তারা কি আসলেই জানেন বাকশাল কি, কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে গনতন্ত্রের জন্য আজীবন সংরামী বংগবন্ধুকে এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হয়েছিল?

১৯৪৭ সনে ভারত বিভক্তির পর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯ এর গন আন্দোলন এবং ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি নানাবিধ সংগ্রাম ও রক্তস্রোতে অবগাহনের প্রাপ্ত ফলশ্রুতি আমার প্রিয় বাংলাদেশ। । এই সব শ্রোতের মাঝেই উদয় হয়েছিল এক মহান দেশ প্রেমিকের, এক মহান যোদ্ধার যিনি জেল জুলুম, অত্যাচারে ভীত ছিলেন না, ভয় করতেন না শাসক বর্গের রক্তচক্ষুকে, তিনি ছিলেন বংগবন্ধু শেখ মুজিব, জাতীর পিতা, সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাংগালী শেখ মুজিবুর রহমান। আজীবন সংগ্রাম ও আন্দোলন করে, যাবতীয় ত্যাগ তীতিক্ষাকে উপেক্ষা করে, ৩০ লক্ষ শহীদ ও লক্ষ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে, পাকিস্তানী শাসন ও শোষনের হাত থেকে বাংগালীকে মুক্ত করে, একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে পরিচিতি এনে দিয়েছেন এই বংগবন্ধু শেখ মুজিব, জাতির পিতা শেখ মুজিব।

বংগবন্ধু শেখ মুজিবের অবদানকে সবাই স্বীকার করেন কেবল কিছু পাকিস্তানী মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শে বিশ্বাসিরা ছাড়া। ঐ গ্রুপের সমর্থকরা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে, স্বকীয়তা লাভের জন্য ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্বাস করেনি, এমনকি এখনও করেনা। তাদের অনেকেই ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হেরেমে, কেহবা রাজাকার আল-বদর হিসেবে করেছে পাক আর্মির সহযোগীতা এবং করেছে সার্বিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা। তারা আজও তাদের সেই মানসিকতাকে পরিবর্তন করতে পারেনি, পারেনি বাস্তবতাকে উপলব্ধি ও গ্রহন করতে এবং সেই কারনেই আজও সেই ৭১ এর বর্বর হায়েনাদেরকেই হিতাকাংখী বন্ধু হিসেবে সালাম করে চলেছেন।

স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধের ইতিহাস এক পুরোনো ইতিহাস যে ইতিহাস আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না অথচ তা জানা একান্তই প্রয়োজন। যদি নতুন প্রজন্মকে সে ইতিহাস আমরা জানাতে পারতাম তবে অবশ্যই আজ সেই ৭১ এর পাক বাহিনীর আশ্রিতা ও দোষরেরা আমাদের দেশের শাসন ক্ষমতায় আরোহন আশার স্বপ্ন দেখতে পারতো না।

বংগবন্ধুর বাকশাল কি আসলেই একদলীয় ব্যবস্থা ছিল নাকি বহু দলীয় কিংবা সর্বদলীয় এ নিয়েই বিতর্ক। অনেকেই মনে করেন এবং এখনও বলে বেড়াচ্ছেন ঐ ব্যবস্থা ছিল এক দলীয় স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা যার মাধ্যমে গনতন্ত্রের মানষপুত্র, সংগ্রামী বংগবন্ধু তাঁর ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন। কিছু রাজনীতিক তাদের ফায়দা হাসিলের জন্য অথবা বংগবন্ধুর অবদানকে খাটো করার জন্য আজও সেই ব্যবস্থার সমালোচনা করে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই জানেন না বাকশাল কি আর যারা জানেন তারাও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য না জানার ভান করছেন। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, ঐসব সমালোচনাকারীরা যদি বাকশাল সম্পর্কে বিশদভাবে জানতেন এবং ঐ ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষন করে দেখতেন তবে “বাকশালের” সমালোচনা করার পরিবর্তে তার প্রসংসাই করতেন। আর যারা জানেন, বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তনের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যেও অনেকেই এখন না জানার ভান করে যাচ্ছেন।

আমি রাজনীতির সাথে কখনও জড়িত ছিলাম না, এমনকি এখনও নই। বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তনের সময় এমন এক সংস্থায় চাকুরী করতাম যেখানে রাজনৈতিক আলোচনাও চাকুরী বিধির পরিপন্থী ছিল। ঐ সময়ই চাকুরী করার পাশাপাশি রাষ্ট্র বিজ্ঞানে স্নাকোত্তর পরীক্ষার্থী ছিলাম। লেখাপড়া এবং ব্যক্তিগত আগ্রহের কারনে আমি বাকশালের মেনিফেষ্টো পড়েছিলাম এবং ঐ ব্যবস্থা সম্পর্কে সুধীজনের পক্ষে কিংবা বিপক্ষের লেখা অধ্যয়নের সু্যোগ পেয়েছিলাম যে কারনে বাকশাল পদ্ধতির উপর আমার বেশ ভক্তি ও স্রদ্ধা জন্মেছিল। সেই অর্জিত ধ্যান ধারনার উপর ভিত্তি করে ঐ শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত না লিখে বিদগ্ধজনের ভ্রান্ত ধারনা মোচনের জন্য এবং নব প্রজন্মের জ্ঞাতার্থে একটু সংক্ষেপে আলোচন করব।

বাকশাল সম্পর্কে আলোচনায় যাবার আগে বর্তমান বহুদলীয় গনতন্ত্রের প্রচলিত প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটু আলোচনা করতে চাই। বর্তমান বহুদলীয় গনতান্ত্রিক পন্থায় গঠিত সরকারের নীতি অনুযায়ী সরকারী দল থেকে কোন বিল সংসদে উত্থাপিত হলে সবাই সেই বিলের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য। কিন্তু সেই একদলীয় সংসদে বিরোধী দল বলতে কিছুই ছিল না। সেই একদলীয় সংসদে কোন সাংসদ জনকল্যনমূলক কোনো বিল উত্থাপন করলে তার পক্ষে/বিপক্ষে আলোচনা করার দ্বার ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত। সেই ব্যবস্থায় সকলের উন্মুক্ত আলোচনা/সমালোচনা ও বিশ্লেষনের পর সেই বিল প্রত্যক্ষ ভোটে যাওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল। যেহেতু ঐ ব্যবস্থায় ভোটের সময় কোন দলীয় প্রভাব থাকবে না, সেই হেতু যে কোনো সংসদ সদস্যের অধিকার ছিল ঐ বিলের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে ভোট দেয়ার। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোট লাভে সক্ষম হলে সে বিল আইনে পরিনত হতো। কোন সদস্য বিপক্ষে ভোট দিলেও তার সদস্যপদ বাতিল হবে না এবং সংসদ নেতা কিংবা দলীয় উচ্চ পর্যায় থেকে কোন রক্তচক্ষু প্রদর্শনের বিধান ছিল না। প্রত্যেক সদস্যের অধিকার ছিল পক্ষে/বিপক্ষে ভোট দেয়ার। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হলে সে বিল আইনে পরিনত হতো। অথচ বর্তমানে প্রচলিত বহুদলীয় গনতন্ত্রে সংসদে কোন সদস্যের কি অধিকার আছে তার দলের আনীত বিলের বিপক্ষে ভোট দেয়ার? নেই, একেবারেই নেই। সরকারী দল থেকে বিল এলে তার পক্ষে অবশ্যই ভোট দিতে হবে, অন্যথায় সংসদ সদস্যপর বাতিল হয়ে যাবে কিংবা দলীয় প্রধানের রক্তচক্ষু দেখতে হবে । সুতরাং এখানে বাকশাল পদ্ধতির সমালোচনাকারীদের কাছে জানতে চাই, কোন ব্যবস্থা বেশী গনতান্ত্রিক, বহুদলীয় গনতন্ত্র নাকি সেই হারিয়ে যাওয়া একদলীয়, অন্য নামে প্রচলিত বাকশাল কিংবা একদলীয় শাসন পদ্ধতি?

নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচন করতে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সদ্য স্বাধীন যুদ্ধার্জিত একটা দেশের জন্য ঐ বাকশালী ব্যবস্থা ছিল একান্তই প্রয়োজনীয়। কারন আমাদের সাধারন নাগরিকের মধ্যে তখনও গনতান্ত্রিক ধ্যান ধারনা ও শিক্ষার অগ্রগতি ছিল একান্তই পিছিয়ে। তাই বংগবন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমান যে অস্থায়ী (২০ বছরের জন্য)একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা সংক্ষেপে বাকশাল প্রবর্তন করেছিলেন তা ছিল আমাদের দেশের জন্য, রাজনীতির জন্য, অর্থনীতির জন্য একান্তই প্রয়োজনীয় ছিল। যদি সেই ব্যবস্থা নিয়ে বংগবন্ধু এগিয়ে যেতে পারতেন তবে আজকের অবস্থানে, বিশ্বের কাছে উন্ননয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ, অনেক আগেই পৌছে যেত কিন্তু দেশের শত্রু, সেই শত্রুদের বান্ধবেরা নানা ধরনের আন্দোলন, এমনকি স্বসস্ত্র আন্দোলনেও, ঝাপিয়ে পড়ে সব স্তিমিত করে দিয়েছিল যে ক্ষতি পূরন করা আর সম্ভব হয়নি এবং হবেও না কোনোদিন।

লেখকঃ সাঈদুর রহমান সাঈদ মুক্তিযোদ্ধা বিমানসেনা (অবঃ) নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

Related posts