September 20, 2018

বাংলা ভাষা না থাকলে মাকে কী বলে ডাকতাম?

589
‘মা’ শব্দটি পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর। মা মানেই আবেগ আর ভালোবাসায় ভরপুর একটি ডাক। ‘মা’ শব্দটি মুখে আসলেই চোখে জল আসে, প্রাণ জুড়ায়। অন্য কোনো ভাষায় এই মধুর শব্দটি পাওয়া যাবে না। বাংলা ভাষা না থাকলে আমরা মাকে কী বলে ডাকতাম, আম্মি, আম্মাজান? না। তা সম্ভব নয়।’

কথাগুলো বলেন, বৃটিশ ও পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের প্রথিতযশা পুরুষ বিপ্লবী কামাক্ষ্যা প্রসাদ রায় চৌধুরী। কথাগুলো বলার সময় লাল হয়ে ওঠে তার মুখ। কামাক্ষ্যা প্রসাদের বয়স একশো’র কাছাকাছি। এরপরও চিন্তাশক্তি প্রবল। শরীর জুড়ে বার্ধক্যের ছাপ। ভাষা আন্দোলন ও অতীত ইতিহাস বলতে বলতে চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। যেন তার চোখের সামনে ভাসছে মহাকালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো।

‘অন্য যে কোনো দাবির চেয়ে ভাষার দাবি সবচেয়ে বড়। কেউ আমার কাছ থেকে ‘মা’ ডাক কেড়ে নিতে চাইলে আমার সত্ত্বা জেগে ওঠবে। তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেই। অর্থাৎ কোনো জাতির ভাষার উপর আঘাত করলে, তার প্রতিবাদ আসবেই। আর বাঙালি জেগে উঠলো, রুখে দাঁড়ালো, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিলো রাজপথে-’ থেমে থমে বললেন কামাক্ষ্যা রায়।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী সোনালি দিনগুলোর কথা স্মরণ করে কামাক্ষ্যা রায় বলেন, ‘চারিদিকে যখন ভাষার জন্য সবাই রাজপথে আন্দোলনরত, তখন আমি, কামাল লোহানীসহ অনেক নেতাই জেলে বন্দী। আমরা জেল থেকে আঁচ করতে পারছিলাম বাইরের অবস্থা। জেলে থেকেই আমরা ভাষার দাবিতে মিছিল মিটিং অনশন করেছিলাম। বাইরের আন্দোলরত জনতার সঙ্গে আমরাও জেলে বসে একত্মতা ঘোষণা করেছি। জেলে থাকার কারণে হয়ত রাজপথে মিছিল করতে পারিনি।’

১৯২০ সালে জন্ম কামাখ্যা রায় চৌধুরীর। ১৬ বছর বয়সেই জড়িয়ে পড়েন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে। দেশমাতাকে মুক্ত করতে স্বশস্ত্র আন্দোলনসহ বহু আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এই বিপ্লবী। পরবর্তীতে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। শুরু থেকেই বামপন্থী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। বাম রাজনীতির পুরোধা বলা চলে বিপ্লবী এ প্রবীন নেতাকে। বর্তমানে উদীদী শিল্পীগোষ্ঠীর উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তিনি।

ভাষা আন্দোলনে শহীদের সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে অনেক বেশি দাবি করেন তিনি। তার মতে, ‘ভাষা আন্দোলনের সময় প্রকৃতপক্ষে কত জন শহীদ হয়েছে কেউ এর হিসাব দিতে পারেনি। সালাম, রফিক, জব্বার বরকতসহ কয়েকজনের নাম ছাড়া আমরা আর কারো নাম জানি না। প্রকৃতপক্ষে এ আন্দোলনে আরো অনেকেই শহীদ হয়েছিলেন। সেসব লাশ গুম করে ফেলা হয়েছিল।’

বর্তমান প্রজন্ম বাংলা ভাষা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্ত্বাকে অবজ্ঞা করছে করে তিনি বলেন, ‘যে ভাষার জন্য এত আন্দোলন, এত প্রাণ ঝরলো বর্তমান প্রজন্ম সেই ভাষাকে বিকৃত করে উচ্চারণ করছে। ভাষার প্রতি তাদের টান নেই। তবে বর্তমানে ভাষার শুধু বেহাল দশা তা নয় এর সাথে বাঙালি সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হয়ে গেছে। চোখের সামনে এসব দেখছি, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি তরুণরা ভুলে যাচ্ছে।’

আমাদের পোশাক আশাকে বিদেশী ছাপ। নাটক সিনেমা কোনোটাতেই বাঙালির কালচার নেই- বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন এ বিপ্লবী।

তরুণদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘তরুণদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলতে চাই, তোমার বড় হও, কোনো অতীত গ্লানি যেন তোমাদের স্পর্শ করতে না পারে। মানুষের মত মানুষ হয়ে দেশ ও দেশের ভাষা সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করো। দেশর জন্য কাজ করো। কোনো পরিবর্তনই যেন তোমার ভাষা ও সংস্কৃতিকে আঘাত না করে।’

নবতিপর এ বিপ্লবীর কাছে ২১ ফেব্রুয়ারি কি করবেন জানতে চাইলে শরীরে সব শক্তি গলায় এনে বলে ওঠেন ‘অবশ্যই প্রভাতে উঠে খালি পায়ে শহীদ মিনারে যাব। ঢাকায় এসেছি আর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাব না এটা হতেই পারে না।’

যে ভাষায় ‘মা’ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে আবেগ ও অনুভূতি সৃষ্টি হয়, মনে অনাবিল প্রশান্তি নামে, চোখে জল আসে- এই অনুভূতি যাদের দ্বারা সৃষ্টি আমি কি তাদের ভুলতে পারি? দৃপ্তকণ্ঠে বলেন কামাক্ষ্যা রায় চৌধুরী।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts