November 19, 2018

সাঁওতালরা আমার ভাই, সংখ্যালঘু নামক বিভাজক শব্দে বিশ্বাসী নই

মুহাম্মদ নূরে আলম: কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি বিখ্যাত গানের দুটি লাইন দিয়ে এই লেখা শুরু করছি। “বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল–পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান ॥ বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ–পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান”॥ যে বাংলাদেশে জন্ম গ্রহণ করেছে তার পরিচয় তিনি বাংলাদেশী। কোনো বিভাজন মূলক শব্দ চয়ন করে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করা যাবেনা । কারণ বাংলা আলো বাতাস পানি মাটি সবাই সমান ভাবে ভোগ করার অধিকার রয়েছে । সবাই এই শ্যামল সুন্দর সবুজ বাংলা মায়ের সন্তান । যেখানে বাংলা মা তার সন্তানদের মাটি বাতাস পানি বন্টনে বিভাজন করছে না সেখানে আপনি কে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতা বলে সমাজে ধর্ম ও বর্ণ বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিচ্ছেন !?? যারা এইসব করছে তারা পরিস্কার ভাষায় দুর্বৃত্ত এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক দোষে দুষ্টু । এবার বলি সাঁওতালদের পরিচয় ।

সাঁওতাল:
সাঁওতাল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠী। তাদের বাসস্থান মূলত রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া জেলায়। প্রধান নিবাস রাঢ়বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার অরণ্য অঞ্চল এবং ছোটনাগপুর; পরে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সাঁওতাল পরগনায়। তবে ১৮৮১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায় যে পাবনা, যশোর, খুলনা, এমনকি চট্টগ্রাম জেলায়ও অল্প সংখ্যায় সাঁওতালদের বসতি ছিল। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সাঁওতাল জনসংখ্যা দুই লক্ষের বেশি। ২০০১ সালের জরিপে এদের মোট সংখ্যা জানা যায় নি। সাঁওতালরা অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অস্ট্রেলীয় (প্রোটো-অস্ট্রালয়েড) জনগোষ্ঠীর বংশধর। এদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও কোনো বর্ণমালা নেই এবং ধর্ম থাকলেও কোনো ধর্ম গ্রন্হ নেই। সাঁওতাল সমাজ চলে কিছু সামাজিক প্রথার মাধ্যমে। সাঁওতালরা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং কৃষিসংস্কৃতির জনক ও ধারক হিসেবে স্বীকৃত। সাঁওতালদের প্রধান উপাস্য যদিও সূর্য (তাদের ভাষায় সিং বোঙ্গা) তবু পর্বত দেবতাও (মারাং বুরু) তাদের জন্য যথেষ্ট মর্যাদাব্যঞ্জক হয়ে গ্রামদেবতায় পরিণত হয়েছে। সাঁওতালদের বিশ্বাস আত্মা অমর এবং সেই অনৈসর্গিক আত্মাই (বোঙ্গা) সব ঐহিক ভালমন্দ নির্ধারণ করে থাকে। সাঁওতাল নর-নারী আসলে ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে সর্বপ্রাণবাদী ও প্রকৃতি উপাসক, আবার তারা ‘ঠাকুরজিউ’-কে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মান্য করে। তাদের ধর্মাচরণে মূর্তিপূজার প্রচলন নেই।

সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুল এর সূচনা হয় ১৮৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায়। ইংরেজ আমলে স্থানীয় উচ্চ বর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণ জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়ে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। এটি ছিল তাদের বিরুদ্ধে প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র গণসংগ্রাম। তাদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় সিধু, কানু, চাঁদ প্রমুখ। প্রতিরোধ সংগ্রাম সত্ত্বেও জোতদার-মহাজনদের শাসন-শোষণ থেকে সাঁওতাল সমাজ মুক্ত হতে পারে নি। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল অবধি বাংলাদেশে তেভাগা আন্দোলনে সাঁওতালদের ব্যাপক অংশগ্রহণের কথা এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য। ১৮৫২ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ি বন্দোবস্তের ফলে তাদের উপর অত্যাচার বেড়ে গিয়েছিল। তাই সিপাহী বিদ্রোহের আগে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা সোচ্চার হয়েছিল।

সম্প্রতি দুর্বৃত্তরা সাঁওতালদের দেড় হাজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় অসুস্থ মানসিকতার কিছু রাজনৈতিক নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় । বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধায় নৃ-গোষ্ঠী সাঁওতালদের দেড় হাজারের মতো বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের প্রতিবাদে কয়েকশ সাঁওতাল কয়েকদিন আগে দিনাজপুরে বিক্ষোভ করেছে। সাঁওতালদের অভিযোগ, গাইবান্ধার একটি চিনিকল এলাকা থেকে তাদের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং এ সময় পুলিশের গুলিতে দু’জন নিহত হয়েছে। স্থানীয় সাঁওতালরা দাবী করছে, পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালানো হয়েছে। এসব বাড়ি-ঘর ছন, খড়ি, খড় এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি। ১৯৫৬ গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জ চিনি কলের জন্য প্রায় দুই হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। সেখানে তখন ২০টি গ্রামের মধ্যে ১৫টিতে সাঁওতালদের বসবাস ছিল। বাকি পাঁচটি গ্রামে বাঙালীদের বসবাস ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে গেলে সাঁওতালরা সে জমিতে আবারো ফেরত আসার চেষ্টা করে।

১৯৫৬ সালের জমি অধিগ্রহণের কাগজ-পত্র দেখেছেন দিনাজপুরের আইনজীবি মাইকেল মালো। তিনি বলেন, জমি অধিগ্রহণের চুক্তিতে কিছু শর্ত অন্তর্ভূক্ত ছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, অধিগ্রহণ করা জমিতে আখ চাষ ছাড়া অন্য কোন কিছু করা যাবেনা। যদি এখানে আখ চাষ ব্যতীত অন্য কিছু করা হয় তাহলে সে জমি পূর্বের অবস্থায় ফেরত নেবার শর্ত অন্তর্ভূক্ত ছিল বলে উল্লেখ করছেন মাইকেল মালো। সে যুক্তির ভিত্তিতেই সাঁওতালরা তাদের পূর্ব-পুরুষের জমিতে ফিরে আসার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে চলতি বছরের জুন-জুলাই মাসের দিকে তারা সেখানে বসতি গড়ে তোলে। জানা গেছে, যে জমি নিয়ে সংঘর্ষের শুরু, সেখানে আখের খামার তৈরির উদ্দেশ্যে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ও পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয় ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই। চুক্তির ৪ নং শর্তে বলা হয়, যে উদ্দেশ্যে এ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, তা ছাড়া অন্য কোনো কাজে এ সম্পত্তি ব্যবহার করা যাবে না।

সাঁওতালদের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলছেন, বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগের পর সাঁওতাল পরিবারগুলো এখন দুর্ভোগে আছে।
কতগুলো বাড়িতে ভাংচুর এবং অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে সেটি নিয়ে প্রশাসন এবং সাঁওতালদের মাঝে পরস্পর-বিরোধী বক্তব্য রয়েছে। সাঁওতালরা যদিও বলছে প্রায় দেড় হাজার কিন্তু প্রশাসন বলছে এ সংখ্যা কয়েক’শ। সংঘর্ষের সূত্রপাত কেন হয়েছিল সেটি নিয়েও রয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। পুলিশ বলছে, সাঁওতালরা আখ কাটতে বাধা দিয়ে পুলিশের উপর তীর-ধনুক নিয়ে আক্রমণ করেছে। অন্যদিকে সাঁওতালরা বলছে, সে জমি থেকে তাদের উচ্ছেদের জন্য প্রশাসন অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছে। সূত্র : বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকার খবর ।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে বিভিন্ন মহলের রাজনীতির স্বার্থ কাজ করে। ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। যার পরিণতিতে সংঘটিত হয়েছিল কতিপয় রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ভারতের উগ্র হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে জনগণের আন্দোলন বিভ্রান্ত করার কৌশল নিয়েছিল একাধিকবার। আর ভোটের রাজনীতিতে বারবার পাল্লা ভারি হয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িক দল বিজেপির। যে কারণে ভারতে আজ পর্যন্ত ১৭ হাজার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে । স্বৈরাচারী এরশাদকে আমরা এমন কৌশল নিতে দেখেছি। ‘৮৯ ও ‘৯০ সালে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে সরকারের মদদ ছিল।

এমন ঘৃণ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আর বর্তমান সরকারও এখন সেই পথেই হাঁটছে!? ব্রিটিশ আমলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত মুসলিম লীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, ন্যাপসহ প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্মীরা। আজ সেই প্রতিরোধ শক্তি দেখছি না। বাম সংগঠনগুলো প্রতিবাদ-প্রতিরোধে অগ্রণী থাকত। তারা এখন সাংগঠনিকভাবে দুর্বল।

রাজনৈতিক দল ক্ষমতাভিমুখী হবে তা নিয়ে কথা নেই। কিন্তু সেই ক্ষমতা দখল হবে জনকল্যাণে_ জনস্বার্থ বিলিয়ে দিয়ে নয়, আদর্শের বিনিময়ে নয়। কেউ সংখ্যালঘুদের অধিকার পদদলিত করে কিংবা কেউ এ ব্যাপারে নিস্পৃহ থেকে ক্ষমতার খেলা খেলবে_ তা সমর্থন করা যায় না। একাত্তরে কেবল বাঙালি মুসলমান কিংবা বাংলাদেশি মুসলমানের দেশ কায়েমের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সব ধর্মের সব জাতির সব মানুষের সমঅধিকারের বাংলাদেশের জন্য। এখানে সব ধর্মের সব জাতির অধিকার রক্ষা করাই হবে সরকারের কাজ, বিরোধী দলের অঙ্গীকার।

বলা আবশ্যক, সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে বিভ্রান্তির ধূম্রজাল তৈরি করা যায়, তবে তা স্থায়ী হয় না। ধর্মীয় জিকির তুলে ভারতের শাসকরা শেষ রক্ষা করতে পারেনি। ইতিহাসের এই শিক্ষা নিয়ে সরকার রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে, ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বর্জন করবে, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে_ সেটিই আজ প্রত্যাশিত। দেশের স্বাধীনতা, মর্যাদা, উন্নতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুরক্ষিত ও সুন্দরভাবে বজায় থাকুক এবং সকল কালো মেঘ সরে যাক; দয়াময়ের কাছে এই ফরিয়াদ। শেষ করছি রবীন্দ্রনাথের গান দিয়েই_ বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা–সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান ॥ বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন–এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান ॥

fb_img_1477700211894

লেখক: মুহাম্মদ নূরে আলম ।
 লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক।

( মুক্তমতে লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত, আমাদের প্রকাশনা নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে না  এতে )

Related posts