September 24, 2018

বাংলার মরমী সাধক কবি মনমোহন দত্ত ও তাঁর সূফিসঙ্গীত সাধনা

20151228060307

মুহাম্মদ নূরে আলম সূফি বরষণ: মনমোহন দত্ত ছিলেন মলয়া সংগীতের জনক, মরমী সাধক, কবি, প্রবন্ধকার, বাউল, সমাজ সংস্কারক ও অসংখ্য অসাধারণ গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। যে সকল সম্মতি প্রথিতযশা কীর্তিমান মহাপুরুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জন্ম গ্রহণ করেছেন মরমী সাধক কবি মনোমোহন দত্ত তাদের মধ্যে অন্যতম॥

যাদের হাত ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বাংলাদেশের সংস্কৃতির চারণভুমি এবং সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পেয়েছে বিশেষ মর্যাদা ॥ মনোমোহন তাঁর লেখা ও সাধন কর্মের মাধ্যমে বঙ্গভূমির সীমা পেরিয়ে বিশ্ব সভায় নিজেকে করেছিলেন সুপ্রতিষ্ঠিত॥

মনোমোহন ছিলেন একাধারে আবহমান বাংলার লোকসঙ্গীত, বাউলগান এবং সূফিসঙ্গীতের একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, আধ্যাত্মিক সাধক ও মহাঋষি। যিনি তার স্বল্পায়ু জীবন সীমার মধ্যেই ইহলোকে রেখে গেছেন- মানব আত্মার মুক্তির কিছু মর্মবাণী। তিনি ধর্ম সাধনার সমান্তরালে এমন উচ্চ মাপের সঙ্গীত রচনা করে গেছেন যেগুলো তাত্ত্বিকতার গন্ডি পেরিয়ে, সমকালীন আর্থ সামাজিক ধর্মীয় তথা জীবন ও সমাজে ক্রিয়াশীল নানা সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে ক্রমাগত মানুষের চিত্তের প্রশান্তি যোগাচ্ছে ॥ কারণ তাঁর গান ও জীবন দর্শন অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতাবাদের অনন্য দলিল।
সকল প্রকার ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার, কুপ্রথা এবং ধর্ম বর্ণ জাতি ভেদের গন্ডি পেরিয়ে, তিনি সর্বধর্ম সমন্বয়য়ের সাধনের নিরবিচ্ছিন্ন চেষ্টা করেছিলেন। যার মূলমন্ত্র হলো সকল বিভেদ ভুলে বিশ্বঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নয়, শান্তিময় সমাজ ও আনন্দময় পৃথিবী নির্মাণই এই সর্বধর্ম সমন্বয় বা জয় দয়াময় সাধনার মূল মন্ত্র ॥ মনমোহন দত্তের লেখা গানগুলো সুর দিয়েছেন ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ এর জৈষ্ঠ ভ্রাতা আফতাব উদ্দিন। এখানে উল্লেখ যে, আর এক মরমী কবি হাসন রাজা ছিলেন মনোমোহনের সমসাময়িক॥

জন্ম ও বংশপরিচয়:
ব্রিটিশ ভারতে ১২৮৪ সালের ১০ই মাঘ এক প্রভাত বেলায় বাবা পদ্মনাথ দত্ত এবং মাতা হরমোহনীর ঘর আলো করে জন্ম নেয় মনমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯)। তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার সাতমোড়া গ্রামে। বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার সাতমোড়ায়। মাত্র দুই মাস বয়সেই বাবা মা মনোমোহনকে তুলে দেন গুরু আনন্দ স্বামীর কোলে। আর তাই হয়তবা তিনি আজীবন গুরু ভক্তি হৃদয়ে লালন করে গেছেন। সেই গুরু ভক্তির কথা অকপটে উঠে আসে তার অনেক গানে। পূর্বপুরুষের আদি নিবাস নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে। মনোমোহন দত্তের পূর্বপুরুষরা সোনার গাঁও ভট্টগ্রামের জমিদার ও এ অঞ্চলের প্রধান সাঁজওয়াল ছিলেন। সাঁজওয়াল বলতে সে সময় যারা বাদশাদের সৈন্য সামন্ত যোগান দিত তাদের বোঝায়। পরে ঐ বংশের একটা অংশ সাতমোড়া গ্রামে বসতি স্থাপন করে। সংস্কৃতির রাজধানী এই নবীনগরের প্রবাদ পুরুষ মহর্ষি মনোমোহন দত্ত। নবীনগর যেখানে জন্ম নিয়েছেন জগৎখ্যাত সজ্ঞীতজ্ঞ আলাউদ্দীন খাঁ,আয়েত আলী খাঁসহ অনেক কীর্তিমান পুরুষ।

শিক্ষাজীবন:
মনোমোহন তার শিক্ষা জীবন শুরু করেন তারই গ্রামের এক বৃদ্ধ রামজীবন চক্রবর্তী ব্রাহ্মণের পাঠশালায়। পরবর্তীতে তিনি গ্রামের স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাস করেন। মনোমোহন ছাত্রবৃত্তি স্কুলেও পড়ালেখা করেছেন। পরবর্তীতে ইংরেজি শিক্ষার কথাও আমরা জানতে পারি তাঁর স্বহস্তে লিখা লীলা রহস্য নামক পুস্তকে। তিনি মোক্তারি সম্বন্ধে শিক্ষালাভ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি।তবে আরবী ভাষায়, কোরআন, বাইবেল ও সংস্কৃত ভাষায় তাঁর ছিল অভাবনীয় দক্ষতা। মনোমোহন হয়ত একাডেমিক শিক্ষায় তেমন শিক্ষিত নন। কিন্ত্ত তাঁর রেখে যাওয়া ফসল অসংখ্যগান এবং কবিতায় আমরা পাই সক্রেটিস, জালাল উদ্দিন রুমী, লালন, মহারাজ আনন্দ স্বামী, হাসন রাজা, বাউল আব্দুল করিম, মাইঝভান্ডারির পীর কিংবা নিমাইয়ের মত বড় বড় মনিষীদের চিন্তার সামঞ্জস্য। তাঁর সৃষ্টি যেমন বিস্ময় তেমনি তিনিও একজন বিস্ময়কর জ্ঞানী পন্ডিত॥ যে গুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে উচ্চতর গবেষণা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে॥

পরিবার ও পরলোক গমন:
ছইফুল্লাকান্দি গ্রামের সাধ্বী সৌধামনি দত্তের সাথে ১৩০৮ সনের ২৮শে ভাদ্র সোমবার মনমোহন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে একটি মাত্র সন্তান ছিল, নাম সুধীরচন্দ্র দত্ত । এই মহাপুরুষ মাত্র ৩১ বছর ৭ মাস বয়সে স্ত্রী এবং এক বছরের শিশু পুত্রকে রেখে বাঙলা ১৩১৬ সালের ২০ শে আশ্বিন (১৯০৯ইং) পরলোক গমণ করেন। তাঁকে তার ইচ্ছানুসারে তাঁর সাধনা স্থল বেল তলায় সমাধিস্ত করা হয়। যদিও তিনি হিন্দু পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু তাঁর লাশ হিন্দু ধর্মের রীতি অনুযায়ী আগুনে পোড়ানো হয়নি ॥ বরং ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী কবরস্থ করা হয়॥ এবং তিনি তাঁর জীবীদ্দশায় কোনো মূর্তির পূজা করেনি ॥ করেছেন এক ইশ্বর দয়াময়ের সাধনা ॥ পুত্র সুধীর চন্দ্র দত্ত, নাতি-বিল্বভূষণ দত্ত এবং নাত বউ-কমলা রাণী দত্ত। আনন্দস্বামীর প্রতিভায় মনোমোহন দত্ত যেমন আলোকিত, তেমনি পরিবারের সকল সদস্য ছাড়াও বঙ্গের বহু পরিবার তার আলোকে প্রভাবান্বিত হয়েছে। মনোমোহন ছোটবেলায় শুনেছেন পিতৃব্য বসন্তচন্দ্র দত্ত কাইতলার জমিদারিতে চাকরি করতেন। সেই জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রোগের আরোগ্যের জন্য আনন্দস্বামীর নিকট তিনি যান। আনন্দস্বামী জানান তার রোগ ভালো হবে না উপরন্তু সাতমোড়ার গোপাল সাধুকে দেখা করতে বলেন। ঘনিষ্ঠতার এক সময়ে গোপাল সাধুও তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমন্ত্রণে আনন্দস্বামী সাতমোড়ায় এলে মনোমোহনের পিতা পদ্মনাথ দত্ত পিত্তশূল থেকে মুক্তি পাবার জন্য শিষ্য হন এবং তার ব্যবস্থানুযায়ী রোগমুক্ত হন।

মহর্ষি মনোমোহন দত্তের বংশানক্রম নিম্নরূপঃ রাজ বল্লব দত্ত সাজওয়াল>রাম বল্লব দত্ত সাজওয়াল>কানু বল্লব দত্ত সাজওয়াল> শুকদেব দত্ত>রঘুরাম দত্ত>মুলুক চাঁদ দত্ত>সুধারাম দত্ত>বৈদ্য নাথ দত্ত>পদ্মনাথ দত্ত>মনোমোহন দত্ত>সুধীর দত্ত>বিল্বভূষণ দত্ত> দয়াল মনী(স্বরূপ রতন দত্ত)>অজিত এবং অভয়া দত্ত ।

রচনাবলী:
মনোমোহন লিখেছেন সর্বধর্ম সঙ্গীত, শ্যামাসঙ্গীত, কৃষ্ণ-বিষয়ক সঙ্গীত, শিব সঙ্গীত, শ্রী শ্রী গৌরাঙ্গলীল বিষয়ক গান, দেহতাত্বিক গান, ইসলামীসঙ্গীত, কলব বা মনপাখির গান, আল্লাহ ও রাসুল(সাঃ) বেহেস্ত বিষয়ক গান, বাউল গান, লোকসঙ্গীত, মরমীতত্ত্বের গান এবং সূফিবাদ বিষয়ক গান। এছাড়াও সুন্দর ও গভীর ভাবব্যঞ্জক প্রায় ১০০০ কবিতা পূর্ণ ‘তপোবন’, উপবন, নির্মমাল্য, তিনটি কাব্য গ্রন্থ। আত্মতত্ব সাধনের জন্য লিখেছেন প্রেম ও প্রীতি, পথিক, সত্যশতক, ময়না, যোগ প্রণালী, উপাসনা তত্ব এবং ঋণী। তিনি লিখেন সর্বধর্ম তত্বসার’নামে অতি জটিল তত্বসম্পর্কিয় ২০০ টি বিষয়ের সহজ বোধগম্য প্রকান্ড পুস্তক। মাত্র ৩১ বছর ৭ মাস জীবনে এই ক্ষণজন্মা মনীষী ঋত্বিক কবি যে সৃষ্টিকর্ম ও মরমী সূফিবাদ সাধনার চিহ্ন রেখে গেছেন তা চিরকালের অমূল্য সম্পদ এবং আত্মার পাথেয় হয়ে মানব জাতিকে পথ দেখাবে॥

তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে:
মলয়া – প্রথম খন্ড
মলয়া – দ্বিতীয় খন্ড
মলয়া ৩য়খন্ড
প্রেম পারিজাত
তপোবন
উপবন
পথিক
পাথেয়
ময়না
প্রেমও প্রীতি
সত্যশতক
যোগ প্রণালী
লীলারহস্য
উপাসনা তত্ব
খনি (দয়াময়)

সঙ্গীত সাধনা:
মনমোহন দত্তের চিন্তাভাবনার পরিচয় তার গানেই পাওয়া যায় । সমকালীন নানা কুসংস্কার, সামাজিক বিভেদ, সাম্প্রদায়িকতাসহ বিভিন্ন কুপ্রথার বিরুদ্ধে তিনি গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ তুলে ধরেন। তার গানে স্রষ্টা ও সৃষ্টির অলৌকিক সর্ম্পকও খুব সাবলীলভাবে ফুটে উঠে। তার গান নিয়ে শিল্পকলা একাডেমী,জাতীয় নাট্যশালাসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষ স্থানীয় সংস্থা বিভিন্ন সময় গবেষণাসহ স্মরণনভা অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারের অনুসারীরা মনমোহনের ভাব সঙ্গীতের দ্বারা বেশ প্রভাবিত। তাঁর স্বল্প জীবনকালে প্রায় হাজার খানেক গান, কবিতা এবং আধ্যাত্মিক সাধন প্রণালী এবং মনুষত্ত্ব অর্জনের পথের দিশা সংক্রান্ত গান লিখে গেছেন।
বাঙালির প্রাচীন রাগাশ্রিত গীতিকবিতা ‘চর্যাপদ’। রাগ-রাগিণীর ব্যবহার যদি সে সময়েই হয়ে থাকে তাহলে কেন বলা হয় মোগল শাসনের সময় এসবের সৃষ্টি। তবে সংস্কার ও মিশ্রণ হয়েছে একথা বলা যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১)’র এ পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে ২০০৭ এ। চর্যাপদের বিষয়বস্তু নদী, খাল, নৌকো, পাল, প্রেম, নিত্য ব্যবহার্য জিনিস। তবে সুর যে গ্রামীণ নয়, রাগ-রাগিণীর ব্যবহার থেকে তা বোঝা যায়। গ্রামীণ সুর কোনো না কোনো রাগে; কিন্তু শিরোনামে এর ব্যবহার এবং শব্দ চয়নে বোঝা যায় এর সুরছন্দ উচ্চাঙ্গের।
মীরাবাঈ, কবির, সুরদাস যে ভজন গানের স্রষ্টা সেই গানের বিষয়বস্তু ঈশ্বর ভজন, বন্দনা। এই সময়টি চর্যাপদের পর মধ্যযুগের পূর্বে। ভাষা মৈথিলী, সংস্কৃত ও হিন্দী ভাষা। কিন্তু আমাদের গল্পের নায়ক আরও পরে- মনোমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯) তাঁর মরমী সাধন বিষয়ক সঙ্গীতধারা নিয়ে বাংলাভাষা আবির্ভাব ঘটে।

বাংলার ক্ল্যাসিক্যাল ফোক গানের এই কীর্তনের পাশাপাশি আরও কয়েকটি গ্রামীণ ধারা লোক মুখে মুখে প্রবর্তিত হয়। রামপ্রসাদ সেন (১৭৭২-১৭৮২) একটি ধারার প্রবর্তক। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় (১৭১০-১৭৮২) এর মুহুরীগিরি ছিল তাঁর পেশা। ‘কালীকীর্ত্তন’ তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম। বহু ঈশ্বর যুগের এক শক্তি কালীর সাধনা ও ভজন রামপ্রসাদের রচনার বিষয়। তাঁর রচিত গানকে ‘রামপ্রসাদী গান’ বলা হয়। সাথে সাথে সংস্কারবাদী আর একটি সহজিয়া বাউল ধারা। তার অগ্রপথিক বাউল সম্রাট লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০)। এক সময় বিশাল এক জনগোষ্ঠী তার পতাকা তলে সমবেত হয়েছিল। সংস্কৃত শব্দের উচ্চকোটির বাংলা পদাবলী কীর্তনের পাশাপাশি বাংলার গ্রামে গ্রামে লোকজধারা কবিগানের সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের ঢাকা, ফরিদপুর, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, যশোর, পাবনাজুড়ে একদল কবিয়াল গড়ে ওঠে; সেই সাথে সাথে রচিত হয় কবিগান। রাজা রামমোহন (১৭৭২-১৮৩৩) যখন থেকে ব্রাহ্মধর্মের কথা বলছেন তখন থেকেই তাঁর বাণী নিয়ে বিখ্যাত সনাতন ধর্মের সংস্কারক কেশব চন্দ্র সেন (১৮৩৮-১৮৮৪) এর আবির্ভাব। তখন পূর্ববঙ্গ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। ঠিক সেই সময় জন্ম মনোমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯)’র।১

বৃহত্তর ত্রিপুরা অঞ্চল স্থানীয় শক্তিপূজার আধার। নানা অঞ্চলে বিভিন্ন শক্তির উদ্ভব। ত্রিপুরা মহারাজার এলাকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদার গড়ে উঠেছে সেই সময়। মহারাজার ভজন ও তৈল মর্দনের জন্য জমিদারে জমিদারে নানা বিনোদন গোষ্ঠী তৈরি করতে থাকল। রাজ্য রক্ষার জন্য চলল যুদ্ধ। সৈনিকদের উৎসাহ দেবার জন্য প্রয়োজন হলো-বাদ্যযন্ত্রীর। প্রকৃতির কাঠ, বাঁশ, বেতের সাথে সংযুক্ত হলো চামড়া। চামড়া সংগ্রহ ও বাদ্যযন্ত্রের নির্মাতাদের বিশেষণ নাক্কার্চি বা নাগারচি। এটি ফার্সি শব্দ। লোকজ ভাষা নাগারচি। তারা যুদ্ধে নামল নাকাড়া ও টিকাড়া নিয়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় ভাষায় এদের বলে বাজাইন্যা। নিম্নশ্রেণীর অনেক সম্প্রদায়ের মাঝে এ বাজাইন্যাডির চরিত্র অসাম্প্রদায়িক। বারো মাসে তের পার্বণে পেশায় ওরা ব্যস্ত।

মনোমোহনের সুরের সাথী ছিলেন ফকীর আফতাবউদ্দিন। মলয় শব্দের আভিধানিক অর্থ উদ্যান, বাগান, দখিনা বাতাস। সেই থেকে গানের নামকরণ মলয়া। যে গানের সুর মানুষের মনে দখিনা বাতাসের আমেজ এনে দেয়। যে গান শুনে মন আনন্দে নেচে উঠে, যে সুরের লহরী দেহ মন আর চিত্তের প্রশান্তি এনে দেয় সেই গানই মলয়া বা সদ্ভাব সঙ্গীত ॥ আমরা আজকে বাংলার লোকসঙ্গীতের একটি অন্যতম ধারা মলয়া সঙ্গীত এবং এর রচয়িতার জীবন এবং গান সম্পকে কিছু বিষয় তুলে আনার চেষ্টা করব। আমরা চাই মলয় সঙ্গীতের এই বাতাস বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌছে যাক।লালনের গানের চেয়ে মলয়ার আবেদন ও কম নয়। কিন্ত্ত প্রসার ততটা নেই।

কাননে ফুল আপনি ফুটে,
বিহগে গীত আপনি গায়।
ফুলটি নিজে ফুটেই সুখি,
আপনা রঙ্গ আপনি চায়।

এমনি এক ফুল গানের পাখি সর্বধম্মের সাধক পুরুষ মনোমোহন দত্ত। লবচন্দ্র পাল (১৮৮২-১৯৬৬) তিনি একজন বিএসসি ডিগ্রিধারী শিক্ষক। এই দুই শিষ্যের মধ্যে আফতাবউদ্দিন জ্যেষ্ঠ। তারপর মনোমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯) এবং লবচন্দ্র পাল( ১৮৮২ -১৯৬৬) সর্বকনিষ্ঠ। সর্বজন কথিত মনোমোহনের ‘ম’, লবচন্দ্রের ‘ল’ এবং আফতাবউদ্দিনের ‘য়া’ নিয়ে ‘মলয়া’ গীতিগ্রন্থ। এর অর্থ শান্তির হাওয়াও হতে পারে। ১৯১৬ সালে ‘মলয়া’ গীতিগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সাতমোড়ার আনন্দ আশ্রম এবং প্রকাশনার সাথে লবচন্দ্র পাল আত্মিকভাবে সম্পৃক্ত। এতে ২৮৭টি গান ছিল। এতে ভাব ও বিবিধ শ্রেণীর গান সংগৃহীত ও মুদ্রিত। আমরা লক্ষ্য করছি তার গানে ‘শ্যামা’ বিষয় উঠে এসেছে। এছাড়া তাঁর গুরু আনন্দস্বামীর মানস বিগ্রহ ‘দয়াময়ী;র নিরাকার প্রতিমা উদ্ভাসিত। গান রচনার বিষয়বস্তুতে সে সময় যে সামাজিক অবস্থা বিরাজ করছিল তার প্রমাণ মেলে গানে। বাংলা অসম অঞ্চলের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর গানে। সনাতন সমাজে অবস্থিত ধর্মীয় দর্শন নয়, সচেতন শ্রেণীর মধ্যে সর্ব ধর্মের সমন্বয়িক রূপ প্রতিভাত। বহু ঈশ্বরীয় ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়। তবে একদম র্যাডিক্যাল পরিবর্তন নয়। ধর্মের সমন্বয়ের চেষ্টা মনোমোহনকে তাড়িত করেছে বারবার।

লবচন্দ্র পাল তাঁর শিষ্য। আবার তাকে মনোমোহন শ্রদ্ধাও করতেন। তাই তাকে এক চিঠিতে মনোমোহন লিখেছেন,‘তুই আমার গুরুতুল্য শিষ্য’। আর তার গানের রূপকার আফতাবউদ্দিন। মনোমোহনের সব গানের সুরকার আফতাবউদ্দিন। এরাই ব্যান্ডদল নিয়ে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় চুক্তিতে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। বিশেষ করে সমবেত বাদন। তাদের জীবিকার একটি উদাহরণ নীরদচন্দ্র চৌধুরী (১৮৯৭-১৯৯৯)’র কথায় ফুটে উঠেছে। তাঁদের কিশোরগঞ্জের বাড়িতে একদিন বিয়ে হচ্ছিল। সেই স্মৃতির কথা বলেছেন- তিনি তাঁর ‘আমি একাধারে বাঙালি ও ইংরেজ’ শীর্ষক লেখায়। শারদীয় দেশ-১৩৯৭ (পৃষ্ঠা-১১০, আনন্দ পাব)-এর বিশেষ সংখ্যায়। উল্লিখিত লেখা থেকে অবশেষে উদ্ধৃত করছি :
“১৯৭০ সনের শেষে আমি আমার এক জ্ঞাতি সম্পর্কে ভাইপো’র বিবাহ দেখিবার জন্য পৈত্রিক গ্রাম বনগ্রাম যাই। ভাইপো হইলেও সে আমার অন্তত বারো বছরের বড় ছিল, আমার বয়স তখন সবে দশ হইয়াছিল, ভাইপো আমাদের শরীকের দিকের, তাহার বিবাহ অতিশয় ধুমধাম করিয়া হইতেছিল। অন্য আমোদ-প্রমোদের মধ্যে গান-বাজনার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র ভাই আফতাবউদ্দিকে আনা হইয়াছিল। তিনি বাঁশি বাজাইতেন এবং গানও শুনাইতেন। আমি আসরে বসিয়া তাহার মধুর বাঁশি বাজানো শুনিলাম। তিনি হঠাৎ বাঁশি বাজানো বন্ধ করিয়া এক হাতে বাঁশিটি ঘুরাইতে ঘুরাইতে গাহিয়া উঠিলেন…….
পুরান কথা জাগাই দে-রে,
নতুন হইয়া উঠুক দেশে।
আমি পুরাতন কথাকেই নতুন বলিয়া প্রচার করিতেছি। উহা আমার কল্পিত কথা নয়।”৩

শ্যামাসঙ্গীত রচনার বংশপরম্পরা ঐতিহ্য ছিল মনোমোহনদের। পিতামহ বৈদ্যনাথ দত্তের রচনা,
কালী কালী বলে যে তার কিসে ভয়,
দীনহীন প্রতি যদি তব দয়া হয়।
তবে মা করিব পূজা মনে করি সার,
দরিদ্র হইলে বৃথা জীবন তাহার।
মানস করিয়া আছি মনে ভাবি দুঃখ,
কামনা করিলে পূর্ণ যাবে সব শোক।৪
এ অবস্থা থেকে অবশ্য মনোমোহনের গানের বিষয়বস্তুতে অনেকটা উত্তরণ হয়েছিল। যেমন,
যাবি যদি মন ফকির হাটা,
মুর্শিদাবাদ গিয়ে তবে, পরওয়ানা লও মোহর আটা।
ধরিয়ে পীরের কদম,
খেদমতে কর নরম
যতক্ষণ থাকে দম,
ভুলনা সেই ঐ কথাটা ॥
. . . . .
সার করিয়ে জঙ্গলা-ঝোপ
দিল দরিয়ায় মারলে ডুব
মনোমোহন কয় ছাড়লে লোভ
কিঞ্চিত পাওয়া যায় ফকিরির বাটা ॥৫

মনোমোহন দত্ত তাঁর অধ্যাত্ম জীবন গড়েছেন ও সাধনা করেছেন সাধক মহাপুরুষ মহারাজ আনন্দচন্দ্র নন্দী (১৮৩২-১৯০০)’র শ্রীপদতলে। আনন্দ পরবর্তীকালে স্বামী উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর পিতা রামদুলাল নন্দী ত্রিপুরা মহারাজের দেওয়ান। তিনি প্রতিদিন ফুল দিয়ে মালা গেঁথে কালী প্রতিমাকে পরাতেন আর একটি করে সঙ্গীত রচনা করতেন। তাঁর রচিত মালসী গান জনসাধারণের নিকট প্রিয় ছিল। তার প্রিয় মালসী গান:
জানি না মা তারা, তুমি জান ভোজের বাজী
যেভাবে যে তোমায় ডাকে, তাতে তুমি হও মা রাজী।৬
কাজেই গান রচনার প্রভাব আনন্দ স্বামী পেয়েছেন পিতার কাছ থেকে। মনোমোহন কার কাছ থেকে জ্ঞান ও সঙ্গীত রচনার দীক্ষা পেলেন- সেই গুরুদেবের পরিচয় সমাজসেবা, সঙ্গীত সাধনা ও উদারতা জানলে মনোমোহনকে জানা হবে।
বাংলা ১২৩৯ সালের ১১ বৈশাখ আনন্দচন্দ্র নন্দী জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামদুলাল আরবি, ফার্সি, হিন্দি, উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শেখার জন্য পুত্রকে শিক্ষক রেখে দেন। পনের বছর বয়সে আনন্দ একজন ভাষাবিদ ও সঙ্গীত বিশারদ হয়ে ওঠেন। এখনও কালীকচ্ছের বাড়িতে সন্ধ্যাবেলা সুরের জলসা বসে। সঙ্গীত, জ্ঞান ও ধর্মচর্চায় তিনি সিদ্ধহস্ত হন। ব্রাহ্ম সমাজের পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’ পাঠ করে সনাতনপন্থীদের মূর্তিপূজার প্রতি বিরাগ জন্মে। কলকাতা গেলে ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন (১৮৩৮-১৮৮৪) ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়। ১৮৬৬ সালে ঢাকায় পূর্ববাংলা ব্রাহ্মসমাজ মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন ভাই কৈলাসচন্দ্র নন্দীসহ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। ফিরে কালীকচ্ছে ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করে ধর্মে মন দেন। স্থানীয় সনাতনপন্থীদের বাঁধা ও বিরূপ সমালোচনাকে উপেক্ষা করে তাঁর সংগ্রাম এগিয়ে নেন।

যখন মনোমোহনের তিন চার বছর বয়স তখন মা হরমোহিনী পুত্রকে নিয়ে সাতমোড়ায় আনন্দস্বামীর পদধূলি ও আশীর্বাদ নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য পিতার সাথে মনোমোহন কালীকচ্ছে এসেছিলেন। দারিদ্র্যের কারণেও লেখাপড়ার উচ্চদ্বারে পৌঁছুতে না পেরে ১৮৯৬ সালে পুনরায় মনোমোহন কালীকচ্ছে আসেন দীক্ষালাভের জন্য। গুরু সতের দিন থাকার নির্দেশ দিলেন। নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে তাকে নিয়ে। পুরনো চিন্তার মানুষ ধীরে ধীরে উদার মানুষ হতে যাচ্ছেন। ভেতরে ভেতরে পাল্টে যাচ্ছেন তিনি। তাই মনোমোহন লিখেছেন……….
“আমি একজন নতুন মানুষ হইয়া পড়িয়াছি-কেবল ভাবনা, ঐ চিন্তা, ঐ আলাপ,…নূতন নূতন অলৌকিক লীলা দর্শন, নূতন নূতন ভাব সকলই আমার পক্ষে তখন নূতন ও অমিয়মাখা বোধ হইতে লাগিল।”৮
গুরুগৃহে উনচল্লিশ দিন কঠোর সাধনায় কেটে গেল। ঐ বছরই (১৩০৩ শ্রাবণ মাসে) তাঁর গান রচনার সূত্রপাত। কলমের ডগায় উঠে এলো,
নাথ তোমা বিনে এ ভব ভুবনে
যত কিছু কিছু নয়,
তুমি মূলাধার সর্ব্ব সারাৎসার
তুমি হে ব্রহ্মাণ্ডময়।৯

এভাবে কবিতার সাথে সাথে গান রচনা। ভাববাদী গানে সে সময় পুরনো কবিরা যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে গিয়েছিলেন-তার আধুনিক রূপকার রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০), বিভিন্ন লেখক ও গবেষক মনোমোহনের কথা আলোচনা করতে গিয়ে ফকির আফতাব উদ্দীনের কথা আলোচনা করেছেন। প্রাসঙ্গিকভাবে মনোমোহনের গুরুকুল নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। আর নন্দী পরিবারের মহাপুরুষ মহেন্দ্রনাথ আরও অন্ধকারে।
নানা সমস্যা নিয়ে মনোমোহন বেশ কয়েকবার কালীকচ্ছ এসেছেন। নানা অঞ্চলের মানুষের সাথে তাঁর ভাব বিনিময় হয়েছে। এ আশ্রমে দ্বারকানাথ, ফরিদপুরের প্রিয়নাথ দত্ত, চৌদ্দগ্রামের গিরিশ চন্দ্র চৌধুরী, হরেন্দ্রচন্দ্র দাশ যখন অবস্থান করেছেন তখন তিনি এখানে দীর্ঘদিন ছিলেন। গুরুমাতা জয়দুর্গার (আনন্দস্বামীর মা) পৌরহিত্যে তিনি উপাসনা করেছেন। এ তাঁর কাছে পরম পাওয়া। নবীনগড়ের জমিদার মোহিনী বাবু আনন্দস্বামীর শিষ্য। ১৩০৫ সালের আষাঢ় মাসে তাঁর আয়োজিত এক ধর্মসভায় মনোমোহন ভক্তগায়ক রামদয়াল মালী এবং হরিমোহনকে নিয়ে যোগ দেন। সেই ধর্মসভায় অন্যদের সাথে উপস্থিত ছিলেন গুলমোহাম্মদ, কৃষ্ণশীল ও উদয় সরকারের মতো বিশিষ্ট সঙ্গীত সাধকগণ। আরও মনোমোহন আচার্য। এঁদের অনেকেই গুরু আনন্দস্বামীর শিষ্য। কালীকচ্ছে অনেকবার যাবার সূত্রে গুরুপুত্র পণ্ডিত ও সঙ্গীতজ্ঞ ডা. মহেন্দ্র নন্দীর সাথে তাঁর বহুবিধ আলাপ হয়েছে।

মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দী অজয় সিংহ রায়ের মাতামহ। তিনি একজন সিতারী, সুরকার ও মিউজিকোলজিস্ট।

বাংলাদেশের সর্বধর্ম মিলনের ও সংস্কৃতি চর্চার সমন্বয়িক অংশগ্রহণ প্রাচীনকাল থেকে। সেই অবস্থা থেকে আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে ভাবতে অবাক লাগে। হে মানুষ! কবে আবার তোরা মানুষ হবি! ঘুরেফিরে সবাই এখনো জীবজন্তুর মতো বিচ্ছিন্ন; কখনো কখনো সারমেয়র প্রভুভক্তি মানুষের সাম্প্রদায়িক ক্রিয়াকর্মকে ভেংচি কাটে। অথচ, মাটিতে সর্বধর্মের সমন্বয় ও মানব সেবাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এ মন্ত্রেই তার চিন্তা।

এদের প্রভাবে মনোমোহনদের চরিত্র গঠিত হয়েছিল। মনোমোহনের শিষ্য মনসুর আলী, শিক্ষক লবচন্দ্র পাল, ফকির আফতাব উদ্দিন প্রধান। মনসুর আলী স্ত্রী-পুত্র নিয়ে মনোমোহনের আশ্রমে আসেন। তখন নিজের রচিত গান গেয়ে গুরুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর গানের পঙক্তি ছিল,
গৌর তোমারে নি পারবে ভিক্ষার ছলে
দয়াল আল্লারে তোমারে নি পারবে,
যে পথে গৌরাঙ্গ গেছে (তার) পদধূলি পড়ে আছে নিরলে
হাতে তজবি গলে ঝুলুনি, কাঁদছে গৌরা জয় রাধা, শ্রী রাধা বলে।
দ্বিতলেতে মানুষ আছে, ভাবের মানুষ পাব কই গেলে (নিরলে) ॥১৬

তাঁর এই গান শুনে মনোমোহন ভাবে মুগ্ধ হন এবং ধর্মীয় বিতর্কের পর তাকে শিষ্য করে নেন। আর লবচন্দ্র ছিলেন ছাত্রাবস্থা থেকে তার ভক্ত। তাঁর আর এক শিষ্য আফতাব উদ্দিন (১৮৬৯-১৯৩৩)র কথা মনোমোহন তার জীবন কথায় লিখেছেন,
“বসিয়া নানারূপ আন্দোলনে মগ্ন আছি। এমন দুইজন যুবক সম্মুখে উপস্থিত হইল- একজন প্রৌঢ় ও একটি বিনয়ী যুবক, তাহারা লালপুর যাইবে- জাতিতে বাদ্যকর, সেলাম জানাইয়া বিদায় গ্রহণ করিল। একটু পরেই আফতাব উদ্দিনের কথা হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম আফতাব উদ্দিন কোথায়! সে নাকি খুব ভালো বাঁশি বাজাইতে পারে শুনিয়াছি। অনেকদিন হইতে তাহাকে দেখিবার ইচ্ছা। অমনি সকলে বলিয়া উঠিল- এইমাত্র যে কালরঙ এর ছেলেটি আপনাকে ছালাম জানাইয়া, লালপুর রওনা হইল সেই আফতাব উদ্দিন।”১৭

এই বিখ্যাত শিষ্যদের সঙ্গে-নিশিকান্ত সেন, গুরুদয়াল, রমজান আলী, রজনী পাল, পুলিন বিহারী বর্ধন, গগন পাল, রামদয়াল শীল, ভরতচন্দ্র সাহা, নবীন পাল, ভরত রিশি, দেলোয়ার আলী মুন্সী, দেবেন্দ্র রায়, অলীক দে, আব্দুল করিম, কৃষ্ণকুমার নম। সারদা সূত্রধর, মহিম কর্মকার, রাধানাথ নম, কুমুদ বন্ধু দে, গোবিন্দ পাল, দুলাল নম, হরিমোহন দে, জগৎ পাল, দেবেন্দ্র রায়, রসিক আচার্যসহ অনেকে আজও শিষ্য পরম্পরা দীক্ষা নিচ্ছেন। ত্রিপুরার আগরতলা, ভোলাচঙ এলাকায় গড়ে উঠেছে এদের ‘সর্বধর্ম আশ্রম’।
মনোমোহন বেঁচে ছিলেন-একত্রিশ বছর সাত মাস। এই ক্ষণজন্মা পুরুষ বিশটির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বারোয়াঁ রাগে একতালে রচনা করলেন,
ক. গায়েবী আওয়াজে কয় শুনরে মুসলমান
আখেরে দুনিয়া ফানা, রাখরে ঈমান।১৮
আবার লিখলেন,
খ. অহিংসা পরম ধর্ম সত্যই যদি সত্য হয়,
সত্য ছেড়ে একেআরে দ্বন্দ্ব তো উচিত নয়।১৯
উপরোক্ত গান দুটি ‘মলয়া’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় খণ্ডে দেখা গেলো তিনি পারস্যের বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ওমর খৈয়াম (১০৫০-১১৩২) মতো লিখেছেন,
চাইনা বেহেস্ত চাইনা দোজখ,
আমি চাই শুধু তোমারে।
আমি কে, তুমি কে, তুমি কে, আমি কে?
প্রেম কর সদা অন্তরে।২০
আর পরবর্তীকালে এই ভাবধারায় স্নাত হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) লিখছেন,
খোদার প্রেমে শরাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে।
চাইনা বেহেশ্ত খোদার কাছে
নিত্য মোনাজাত করে॥২১

সুফিবাদে মানুষ ঈশ্বরের মাঝে বিলীন হওয়ার কথা বলা হয়,বলা হয় স্রষ্টার রঙে রঙিন হওয়ার কথা মনোমোহন বলেন-
আমাতে কি আর আমি আছি?
যার প্রাণ তারে দিয়ে নিরব হয়েছি।
শুধু তাহারি লাগি সারাটি নিশ জাগি
ডাকি ডাকি থাকি থাকি কত কেন্দেছি।
ধরিতে না পেয়ে তারে,চলিয়া এসেছি ফিরে,
অভিমানে রাগ করে ফেরে পড়েছি।
প্রাণের লাগি প্রাণ,উদিসী গায় হে গান,
নিঝুমে পাতিয়ে কান থাকতে তারে দেখেছি।
তাহারি আকুলতা,সহেনা এত ব্যথা,
গাহিয়া প্রাণের গাথা প্রাণে প্রাণে সঁপিয়াছি।

মানব সেবাই পরম ধর্ম। স্রষ্টাকে রাজি করতে হলে তার সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হবে।যে হৃদয়ে সৃষ্টির প্রতি প্রেম নেই সে হৃদয়ে ধর্ম নেই,সে হৃদয়ে স্রষ্টা নেই।সে হৃদয় কপটতায় ভরপুর।মনোমোহন
সেবাকেই পরম ধর্ম মানেন।গ্রহন করেন সেবা ব্রত।
শিষ্য হোরে বিশ্ব মাঝে
সেবা ব্রতে প্রাণ সঁপিলে
স্বর্গেও তার ডঙ্কা বাজে।
খুলবি যদি যোগের মর্ম
শিকষা কর সেবা ধর্ম
তা বিনে আর নাহি কর্ম
মহাজন বিধি দিছে।
ভজনের বল করতে বৃদ্ধি,
সেবাই পরম সিদ্ধি,
সেবাতে সে পরম নিধি,
বিকশিত রহিযাছে।।

সাকার, নিরাকার, দ্বৈতবাদ,অদ্বৈতবাদ ইত্যকার বিবাদে লিপ্ত না হয়ে আত্মতত্তে মনোযোগ দিলেই সত্যে পৌঁছানো যায়। সর্ব ধর্মের জয়গান বেয়ে উঠে প্রাণ।মনোমোহন গেয়েছেন সর্ব ধর্মের গান-…
ছাড়রে ধর্ম্ম- বিবাদ
সাধরে কল্যাণ।
সকলে মিলিয়া কর
দয়াময় নাম গান।
শিব, কালী, কৃষ্ণ নাম
আল্লা, রাধা, যত নাম;
দয়াই আরাধ্য কাম-ভবরোগ হতে ত্রাণ।
যে নামে তাহার তৃপ্তি
দয়াময় নামে প্রীতি,
সাধরে সাধ সম্প্রীতি,
মিলিবে কার্য্য আরাম।
রূপ নাম শত শত,
একেরই বিভূতি যত;
জেনে লও সিদ্ধ-ব্রত
হইবে পূরণ কাম ॥২৪

মনোমোহন ইশ্বরের সন্ধান করেছেন সারা জীবন।ধর্মের গোড়ামি ছিলনা।ঈশ্বরকে পেতে তিনি
মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। গ্রামে গ্রামে ছুটে গিয়েছেন ধর্মলোচনায়।সর্বোপরি তিনি যেন নিজের অন্তরেই ঈশ্বরের ডাক শুনতে পেয়েছিলেন।আর তাইতো তিনি করূণ সুরে গেয়েছেন,
মন মাঝে যেন কার ডাক শুনা যায়।
কে যেন আমারে অতি সাধ করে,
হাত দু’খানা ধরে কাছে টেনে নিতে চায়।
ঈঙ্গিতে সঙ্কেতে পলকে পলকে,
কোথা যেতে নারি পাছে থেকে ডাকে,
শুনে সেই তান চমকে উঠে প্রাণ,বলে কথা মান ফিরে ফিরে আয়।
অবহেলা করি দৌড়াইয়া যাই,
চৌদিকে নেহারি নাহি কিছু পাই,
ফিরে এসে কাছে,দেখি হৃদিমাঝে দাড়াইয়া আছে আমার অপেক্ষায়।
হেন প্রাণ বন্ধু হৃদয়ের স্বামী,
কাছে রেখে আমি দূরে দূরে ভ্রমি,
করি কত দোষ,নাহি করে রোষ,সুজন পুরুষ মাখা মমতায়।
আমি হলে তারি সে হতো আমারি,
নিলে তারি মর্ম কাটত কর্ম ডুরি,
কেন কি কারণ নিলে না তার মন,বৃথা মনোমোহন নামটি ধরায়।
তিনি যে প্রশ্ন করেছিলেন ধর্মীয় রক্ষণশীল সনাতনপন্থী ও উগ্র মৌলবাদীদের তার গানে তার উত্তর কি এখনো মিলছে?
কও দেখি মন আমার কাছে, তুমি হিন্দু না মুসলমান?
আল্লা না হরি তোর ঠাকুর বটেরে;
তুই কে তোর মনিব কেরে কহরে ইনসান॥২২
# নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগরে বসে লিখছেন
‘হিন্দু না মুসলিমই ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?23
মনোমোহন দত্তের রচিত গানে গুরুর সঙ্গীত প্রতিভার প্রভাব পড়েছে। শিষ্য আফতাব উদ্দিন সে সব অমৃত ভাবসঙ্গীত রাগ-রাগিণীর বিভিন্ন ছকে ফেলে অপূর্ব সুরব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন। মলয়া’র গানে যেসব রাগ-রাগিণী ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে-বেহাগ-খাম্বাজ, সুরট-মল্লার, সিন্ধু-ভৈরব, আলাহিয়া ও বিভিন্ন কীর্তনের সুর ব্যবহৃত হয়েছে। আর তালগুলির মধ্যে আড়াঠেকা, যৎ, মধ্যমান, ঢিমা কাওয়ালী, এতকাল ও ঝাঁপতাল ব্যবহৃত হয়েছে।
গুরু, গুরুভাই, শিষ্য, প্রশিষ্য, গুরুকুল সবাই যে সাধনায় জীবনপাত করেছেন- আজও তার সুরাহা হলো না। আজ জাতিসংঘ যে দাবি নিয়ে এক বিশ্ব গড়ার কথা তুলেছে- তার দাবিদার তো আনন্দস্বামী, মনোমোহন, ফকির আফতাব উদ্দিন, ডা. মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দী। আজ পর্যন্ত ‘সর্বধর্ম আনন্দআশ্রম; যে এক ধর্মের দুনিয়া গড়ার স্বপ্ন দেখছে হয়তো দক্ষিণ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংসদ তার প্রাথমিক প্রচেষ্টা। তবুও আমরা আশাবাদী। সাধক মনোমোহন দত্তের গান দিয়ে শেষ করছি,.
.খুলে দাও শান্তির দুয়ার।
কাছে বসে তাক তুমি সর্বদা আমার।
করাঘাতে হাতে বেদনা প্রচুর,ডেকে ডেকে বুকে বেজে গেছে সুর,
নিশি ভোর ভোর হ্যারে চিত্তচোর,বড়ই কঠোর অন্তর তোমার।
সুখে শয্যা মাঝে, শুয়ে আছো তুমি,অন্ধকারে দ্বারে ভ্রমিতেছি আমি,
আশা দিয়ে টেনে ,দ্বারের কাছে এনে,দূর্বলের সনে একি ব্যবহার।
ধরা দিবে বলে,প্রাণে দিয়ে আশা, ঘর ছাড়াইয়া চুপি চুপি হাসা,
হায়রে ভালোবাসা কূল ধর্মনাশা, গাছতলা বাসা করিলি এবার।
তবুও যদি দয়া হইত তোমার খুলে দিতে চির রুদ্ধ দ্বার,
জনমের ধার,জীবনের ভার,ভুলে যেত মনো বিপত্তি অপার।

উৎস ও উদ্ধৃতি
১. সুকুমার বিশ্বাস- মনোমোহন দত্ত। বাংলা একাডেমী ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯। পৃষ্ঠা-৯। ঢাকা
২. অরুণ কুমার বসু। আলাউদ্দিন জীবন, সাধনা ও শিল্প প্রসঙ্গে আলাউদ্দিন খাঁ জীবন, সাধনা ও শিল্প : সম্পাদনা- অরুণ কুমার বসু ও কঙ্কন ভট্টাচার্য। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সঙ্গীত আকাদেমি। জানুয়ারি-১৯৮৯। পৃষ্ঠা-১৪১। কলকাতা
৩. আমি একাধারে বাঙালি ও ইংরেজ নীরদ চন্দ্র চৌধুরী। শারদীয় দেশ-১৩৯৭। আনন্দ পাবলিশার্স পৃষ্ঠা-১১০। সম্পাদক সাগরময় ঘোষ।
৪. সুকুমার বিশ্বাস, মনোমোহন দত্ত। বাংলা একাডেমী-ফেব্রুয়ারি। পৃষ্ঠা-১২। ঢাকা
৫. মহর্ষি মনোমোহন মলয়া বা সদ্ভাব সঙ্গীত (১ম খণ্ড)। আনন্দ আশ্রম সাতমোড়া। ২৪ জানুয়ারি ২০০১। ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
৬. সুকুমার বিশ্বাস- মনোমোহন দত্ত। বাংলা একাডেমী- ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯। পৃষ্ঠা-২১। ঢাকা।
৭. শ্রী লবচন্দ্র পাল- শ্রী শ্রীমৎ আচার্য মহারাজ। সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশন- ১৯৯৩ (১৪০০) ২য় সংস্করণ। কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার। ভোলাচং ব্রাহ্মণবাড়িয়া। পৃষ্ঠা : ১-২।
৮. সুকুমার বিশ্বাস……………… পৃষ্ঠা-২৯। ঢাকা
৯. প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা : ৩১।
১০. শ্রী লবচন্দ্র পাল- পৃষ্ঠা : ৭৩-৭৫। ভোলাচং ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
১২. প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা : ২০-২১।
১৩. প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা : ২১
১৪. প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা : ২২
১৫. প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা : ২৩
১৬. সুকুমার বিশ্বাস : মনোমোহন দত্ত। বাংলা একাডেমীÑ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯। পৃষ্ঠা-৫২। ঢাকা।
১৭. প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা-৫৫।
১৮. মহর্ষি মনোমোহন মলয়া বা সম্ভব সঙ্গীত (১ম খণ্ড)। আনন্দ আশ্রম ২৪ জানুয়ারি, ২০০১। সাতমোড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া। পৃষ্ঠা-১৭২।
১৯. মহর্ষি মনোমোহন দত্ত- মলয়া (২য় খণ্ড) আনন্দ আশ্রম ২৪ জানুয়ারি, ২০০১। সাতমোড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। পৃষ্ঠা-৯২। বাংলা একাডেমী।
২০. প্রাগুক্ত। পৃষ্ঠা-৫৩।
২১. জুলফিকার-কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল রচনাবলী চতুর্থ খণ্ড : সম্পাদনা পরিষদ; ২৫ মে-২০০৭।
২২. মহর্ষি মনোমোহন : মলয়া (১ম খণ্ড)। আনন্দ আশ্রম- সাতমোড়া; ২৪ জানুয়ারি ২০০১। পৃষ্ঠা-১৭৫। ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
২৩. সর্বহারা- কাজী নজরুল ইসলাম।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক ও মহর্ষি মনোমোহন গবেষক ।।

Related posts