September 21, 2018

বাংলাদেশী বাঙালিরা কি হুজুগে মাতাল?

রাজু আহমেদ

বাঙালী জাতিসত্ত্বার যতগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম তারা হুজুগে মাতাল হয়-এই উপাধি কোন ভিনদেশীর দেয়া নয় বরং আমরাই আমাদের ওপর আরোপ করে নিয়েছি । কোন সাধারণ ইস্যুতে এ জাতি যেমন দেশে হুলস্থুল কান্ড ঘটাতে পারে তেমনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এরা চুপ থাকতেও ওস্তাদ ! কান নিয়েছে চিলে-এমন ঘোষণা শুনে এ জাতি চিলের পেছনে এক রাজ্য ছুটবে অথচ হাত দিয়ে একবারও ছুঁয়ে দেখবে না যে সত্যিই কি কান চলে গেল নাকি আগের যায়গাতেই রয়েছে ! উড়ো খবরের সূত্র ধরে এরা তা দিয়ে অলীক ইতিহাস রটিয়ে জীবন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে বটে কিন্তু প্রকৃত সত্য খুঁজবে না কিংবা জানতে চাইবে না কখনো ! আজও ভুলি নি, সিডরের কিছুদিন পরে দেশের দক্ষিনভাগে পানি আসছে বলে যে গুজব রটেছিল তা শুনে গ্রামের পর গ্রামের মানুষ ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালালেও একবারও জানতে চায়নি কোনদিক থেকে কিসের পানি আসছে !
…..
ফুটবল বিশ্বকাপের সময় ভিন্ন দেশের পতাকা দিয়ে এরা গোটা শহর মুড়িয়ে দিতে পারে অথচ দেশের পতাকা নিয়ে এদের খুব বেশি সম্মান কিংবা আবেগ কোনদিন প্রকাশ পায়নি । আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে এরা নির্ভাবনায় হিন্দি গান বাজাতেও খুব পটু । পয়েলা বৈশাখ ছাড়া এ জাতি যে বাঙালী তা বুঝতে খুব কষ্ট হয় । এদের বাঙালীত্ব ডি এন এ কিংবা ফরেনসিক টেষ্ট দ্বারা খুঁজে বের করতে হয় ! দেশ রসাতলে গেল নাকি দেউলিয়া হল তা নিয়ে এদের ততোটা ভাবনা নাই যতটা ভাবনা সালামান খান, বিরাট কোহলি কিংবা শহীদ আফ্রিদির পেট খারাপের কথা শুনলে হয় । শহিদ আফ্রিদির মেয়ের মৃত্যুর গুজবে এরা তার জন্য প্রার্থণা করে আমীন আমীন বলে গোটা দেশ ভাসিয়ে দিতে পারে কিন্তু প্রতিদিন যে দেশের ডজন ডজন মানুষ হত্যা-খুন, গুম হচ্ছে তা নিয়ে তাদের মোটেও মাথাব্যথা নাই । কণ্ঠশীল্পি শাকিরা ১২ বয়সে কার দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল সে খবর শুনে সেই পুরুষের ওপর এরা ঘৃণায় ছিঃ ছিঃ বর্ষণ করে ঝড় তুলে দিতে পারে কিন্তু আমাদের তনু, ধর্ষিতা সেই উপজাতি মেয়েটি কিংবা আরও হাজারা হাজার তনুর ভাগ্যবরণীয়াদের নিয়ে এদের চিল্লাপাল্লা মাত্র দিন দু’য়েক-তারপর বেশ হাসি হাসি রব ওঠে । ভুলে যাই সব কিছু, তনুরা হারিয়ে যায় কালের গর্ভে । মনেই থাকেনা যে, এককালে আমাদের তনু নামের একটা বোন ছিল । এইতো আমরা, এটাই আমাদের স্বভাব ।
……
দেশ-বিদেশের ক্রিকেট নিয়ে আমাদের উম্মাদনার শেষ নাই । কোন খেলোয়ার একদিন ভালো খেললে তাকে আকাশে তুলে দিতে পারে কিন্তু ভুলেও যদি খারাপ করে তবে ওর বংশবৃদ্ধি করে দেই গালি দিয়ে ! বিভিন্ন গুরুত্বহীন বিষয়ে হুজুগ দেখাই বটে কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মের যে মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে, সেই সব অনাচার বন্ধের দাবীতে আমাদের মোটেও উম্মাদনা নাই । আপন সংস্কৃতির ঢোল পেটাতে পেটাতে ওর খোল ফাটিয়ে ফেলেছি কিন্তু আমাদের শিকড়ের সংস্কৃতি যে কি তার খোঁজ আমাদের কাছে নাই । ভিন্ন দেশের বস্তাপঁচা অপসংস্কৃতি আমাদের তরুণ সমাজকে ধ্বংষের কিনারায় নিয়ে গেলেও আমরা তা নিয়ে উঁহু পর্যন্ত উচ্চারণ করার সাহস রাখি না । আমাদের দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে বিদেশী চরিত্র এবং এর বিনিমেয়ে আমাদের দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি ডলার অথচ আমরা এর প্রতিবাদ করিনি কখনো । আমাদের দেশের মানুষ যে পণ্য ভোগ করবে সে পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়ার মত কোন পর্যাপ্ত চরিত্র কি আমাদের দেশে জন্ম নেয়নি ? সচেতনতার কথা বললেই, আমরা বলি আমাদের কি করার আছে ? আমরা যে দেশপ্রেমিক ! বিদেশী পণ্যের কারণে একের পর এক আমাদের দেশী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথচ আমরা দেশের পণ্য ব্যবহারকে গরীবি খাছলাত ভেবে নিয়েছি । মুখে কত সুন্দর কথা উচ্চারণ করি, ‘দেশী পণ্য কিনে হই ধন্য’-অথচ সারা বাসা খুঁজেও একটি দেশী পণ্য পাওয়া যাবে না । আমরা সর্বদা স্বপ্ন দেখি আমাদের দেশ উন্নত দেশ হবে এবং আমরা হবো উন্নত জাতি ! হুজুগে যা চলছে তাতে দেশ গঠন করে আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে কিনা সন্দেহ কিন্তু ধ্বংসের পথে আমরা উন্নতি করবো নিশ্চিত !

রাজু আহমেদ।কলামিষ্ট ।

(ইহা লেখকের একান্ত ব্যক্তি গতমত,প্রকাশক বা সম্পাদক দায়ী নহে)

Related posts