September 21, 2018

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও তার সূতীকাগার


সাঈদুর রহমান সাঈদ

“জাতীয়তাবাদ” আমাদের জাতীয় জীবনের একটি বিশেষ রাজনৈতিক শ্লোগান। এই শ্লোগান রাজনীতিক কলুষিত করা ছাড়া আর কোনভাবে আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করেছে এমন কোন নজীর নেই। তবুও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা/সমালোচনা খবরের পাতায়, এখানে সেখানে অহরহই  চলছে এবং কতকাল এভাবে চলবে তা আমরা কেউই জানিনা। অনেকে জেনেশুনে স্ব স্ব রাজনীতির  বন্ধ্যাত্বকে ঢাকা দিতে এ নিয়ে মাতামাতি করছেন আর কেহ না জেনেই। আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে  কখন এবং কিভাবে এ দুষ্টগ্রহ নতুন ‘জাতীয়তাবাদ’ এসে আসন গেড়েছে এবং সমাজকে বিভক্ত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে একটু আলোচনা করতেই অদক্ষ হাতে লেখা আমার এ প্রচেষ্টা।

জাতীয়তা এমন একটা বিষয় যা কেউ সৃষ্টি করে না,  সৃষ্টি করতে পারে না। জাতীয়তাবাদ কালের বিবর্তনের পরিক্রমায় আপনা আপনি সমাজ জীবনে সৃস্টি হয়। জাতীয়তাবোধ মানুষের সমাজ জ়িবনে এক পরম সম্পদ যা মানুষ অর্জন করে পারস্প্রিক কল্যান সাধন করার ইচ্ছা বা অনুভুতির মাধ্যমে সমাজের প্রতি ভালবাসা থেকে।  এই অনুভুতি ও ভালবাসাই সমষ্টিকভাবে জাতীয়তাবাদ এবং সেই জাতীয়তাবাদের অনুভুতি হলো জাতীয়তাবোধ।  জাতীয়তাবাদ নয়,  জাতীয়তাবোধই পারে জাতিকে একত্রিত করে সন্মুখের দিকে এগিয়ে নিতে । এই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে প্রচেষ্টা তা হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্নমুখী, বিভিন্ন রুপী। কখনও যদি এ প্রচেষ্টা সুনির্দৃর্ষ্ট নেতৃত্বের দ্বারা সঠিক পথে পরিচালিত হয় তখনি সে সমাজ পরিগ্রহ করে এক স্বার্থক সামাজিক রূপ।  তারাই আত্মপ্রকাশ করে থাকে একটি গোষ্ঠীবদ্ধ মানব সমাজ বা দেশ হিসাবে।  এভাবেই কালের বিবর্তনে সৃষ্টি হয়েছে সমাজ এবং রাষ্ট্র।

আমরা আমাদের সমষ্টিগত জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই ঝাপিয়ে পড়েছিলাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে এবং তার ধাবাহিকতারুপে মুক্তি্যুদ্ধে এবং অর্জন করেছি কাংখীত স্বাধীনতা। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাক্কালে অর্থাত ৫২এর ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে বাংগালীর প্রানে কোন বিশেষ জাতীয়তাবাদের বীজ নিহীত ছিল না,  ছিল শুধু একটাই মূলমন্ত্র,  আমরা বাংগালী এবং বাংলা আমাদের ভাষা। আমাদের ভাষাকে ছিনিয়ে নিতে কাউকে দিব না।  পরবর্তী ২ দশকেরও বেশী সময়ের বিভিন্ন আন্দোলনে এই মূলসুর থেকে বাংগালী বিন্দু মাত্রও সরে যায়নি।  আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যে ঐ একই মূলমন্ত্র দারা পরিচালিত হয়েছিল তা  আমরা অস্বীকার করতে পারি?

কিন্তূ স্বাধীনতা অর্জনের ৪/৫ বছর পরে এইজাতীয়তাবাদরূপী বিতর্ক আমাদের জাতীকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছে।  বহুজন বহুভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু কেন এবং কি কারনে এই নতুন বিভ্রান্তি এবং কোথায় এর সূতিকাগার সেই সত্য ভাষনটি আমাদের কাছে এক অজানা কারনে কেহই পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করছেন না।

আমাদের স্বাধীনতা উত্তর কালে পাকিস্তানের পূর্বাংশে যেসব বৃহদাকার কলকারখানা,  ব্যাবসা বানিজ্য ছিল তার অধিকাংশেরই মালিক ছিল তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তানী কিংবা মারওয়ারী সম্প্রদায়ের লোক। তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানতো করেইনি, এমনকি কতিপয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ওরা সবাই কায়মনোবাক্যে আমাদের এ জ়ীবনপণ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতাই করেছে। দীর্ঘ ৯ মাসের  রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ লাভ করি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং পাক আর্মীর আত্মসমর্পনের ঠিক পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত ঐ সব অবাংগালীরা তাদের যাবতীয় ব্যাংক ব্যালেন্স ও অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমে পাচার করে। আমাদের সকলেরই জানা আছে ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ এর পর থেকে পি আই এর ঢাকা-কারাচী ফ্লাইট সংখ্যা বহুগুন বেড়ে গিয়েছিল যদিও ঐসব ফ্লাইট সরাসরি ভারতের উপর দিয়ে না গিয়ে সিংহল বা শ্রীলংকা হয়ে করাচী থেকে ঢাকায় আসত খালি জাহাজ আর ফিরতি সব ফ্লাইট কানায় কানায় পূর্ন থাকত ওদের অস্থাবর সম্পত্তি ও লুন্ঠনকৃত সব মালামাল।

স্বাধীনতা লাভের পর প্রথম রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশ বলে সংগত কারনেই ঐসব অবাংগালীদের অবশিষ্ট ফেলে যাওয়া যাবতীয় স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের অনুকুলে বাজেয়াপ্ত করা হয় এমনকি পাকিস্তান আর্মীর সহযোগী যে সব বাংগালী যুদ্ধাপরাধী তাদের কৃতকর্মের পরিনতি হিসাবে পাকিস্তানে বা অন্য কোন দেশে চলে গিয়েছিল তাদের সম্পত্তিও একইভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। ঐসব বাজেয়াপ্তকৃত সম্পত্তির অধিকাংশই সেনাবাহিনীর কল্যানার্থে সেনাকল্যান সংস্থা এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাষ্টকে হস্তান্তর করা হয়।

পরবর্তিতে বিভিন্ন সময়ে কিছু বাংগালী তাদের ভুল স্বীকার করে এবং মুচলেকা দিয়ে দেশে  ফিরে আসেন এবং তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যথাযথ আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের কাছে ফেরত দেয়া হয়। কিন্তু অবাংগালীদের সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় হেফাজতেই থেকে যায়। উদাহরন স্বরুপ শিল্প উন্নয়ন সংস্থার ব্যাবস্থাপনায় সব শিল্প কারখানা এবং তদানিন্তন জিন্নাহ এভিনিউ (বংগবন্ধু এভিনিউ) এর মার্কেট,  অনেকগুলী সিনেমা হল।  এছাড়া আরও অনেক সম্পত্তি ছিল যা সময়ের ব্যাবধানে আমার  শ্মরনে আসছে না।  অবশ্য সরকারী দলিলে তা অবশ্যই নথিভুক্ত আছে।

জিপিওর সন্মুখে বংগবন্ধু এভিনিউর একটি সুবিশাল ভবন ছিল এক অবাংগালীর পরিত্যাক্ত সম্পত্তি।  স্বাধীনতা অর্জনের পর ঐ ভবনটিতে বাংলাদেশ ট্রেডিং কর্পোরেশন কসকর নামক একটি খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র  স্থাপন করেছিল যেখান থেকে নিম্ন আয়ের শহরবাসী,  কর্মজীবি,  চাকুরীজীবি প্রভৃতি শ্রেনীর লোকেরা আমদানীকৃত নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করতে পারতো।  জানিনা ঐ ষ্টোরটি এখনও আছে কিনা।  ঐ পাকিস্তানী মোহাজীর ভদ্রলোকের অন্যান্য আরও বহু সম্পত্তি ছিল ঢাকা তথা বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে ছড়ানো। একইভাবে অনেক বিহারী কিংবা মোহাজিরদের অনেক স্থাবর সম্পত্তি দেশের বিভিন্ন শহরে অবস্থিত ছিল যা ফেলে রেখে তারা পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল।

১৯৭৫ এ বংগবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর ঐসব পরিত্যাক্ত সম্পত্তির অবাংগালী মালিকেরা আবার বাংলাদেশে আনাগোনা শুরু করে। তাদেরই একজনের সম্পত্তি ছিল ঐ কসকর ভবন।   মালিক ভদ্রলোকের নাম মনে নেই। তিনি ছিলেন পাকিস্তানে মোহাজীর হিসাবে ভারত থেকে আগত এবং করাচীতে বসবাসকারী বাংলাদেশ বিরোধী এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার খুব কাছের আত্মীয়।  ঐ মোহাজীর ভদ্রলোক পাকিস্তানের নাগরিক হিসাবে অনেকবার বাংলাদেশ সফর করেন এবং খুজতে থাকেন নানা অলিগলি কিভাবে তার হারানো সম্পত্তি ফিরে পাওয়া যায়।  যেহেতু ভুল স্বীকার করে অনেক বাংগালী তাদের পরিত্যাক্ত সম্পত্তি ফেরত পেয়েছিল, ঐ পাকিস্তানী মোহাজীর ভদ্রলোকও সেই একই উপায়ে তার সম্পত্তি ফেরত পাবার জন্য দেন দরবার চালিয়ে যেতে থাকেন।

রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ বলে অবাংগালীর পরিত্যাক্ত সম্পত্তি জাতীয়করন করা হয় এবং একইভাবে অন্য এক অধ্যাদেশ বলে বাংগালীদের সম্পত্তি বিজাতীয়করন করা হয়েছিল।  সুতরাং সে অধ্যাদেশ ঐ মোহাজীর ভদ্রলোকের বেলায় প্রযোগ করা সম্ভব হয়নি।  তার পক্ষে বাংগালী পরিচয় দেয়াও কোন প্রকারেই সম্ভব  ছিল না কারন তিনি বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারতেন না।  যদিও খবর বেড়িয়েছিল যে তিনি ইতিমধ্যেই কোনোভাবে বাংলাদেশী পাসপোর্টও সংগ্রহ করে ফেলেছিলেন।  একই সময়ে মোহাজীর ভদ্রলোকের এক আত্মীয় পাকিস্তানী জেনারেল বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং তার সমসাময়িক পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমির সমসাময়িক ক্যাডেট আমাদের দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা  সামরিক আইন প্রশাসকের সাথে সরকারী ও বেসরকারীভাবে বহুবার সাক্ষাত করেন।  তার আব্যাবহিত পরেই আমাদের জাতীয়তা ‘বাংগালী’ থেকে হয়ে যায় ‘বাংলাদেশী’। যার অর্থ ছিল বাংলাদেশে বসবাসকারী সব লোকই ‘বাংলাদেশী’। এ ক্ষেত্রে ভাষা আর কোন বিবেচ্য বিষয় রইল না।  যে বাংলাভাষার জন্য বাংগালী অকাতরে রক্ত দিয়েছিল সে ভাষা তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেললো।

বাংলাদেশের প্রথম  সামরিক  আইন প্রশাসকের এক সামরিক ফরমান বা অধ্যাদেশের বলে ‘বাঙ্গালী’ শব্দকে কেটে ফেলে ‘বাংলাদেশী’ শব্দ সংযোজন করা হলো। এই পরিবর্তনের দুই সপ্তাহের মধ্যেই খবরের খবরের কাগজে খবর বের হয় যে বংগবন্ধু এভিনিউর সেই বাজেয়াপ্তকৃত সম্পত্তি ঐ মোহাজের ভদ্রলোক ফেরত পেয়েছেন।  তার কিছুদিন পরেই আবার সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে ঐ অবাংগালী মোহাজীর ভদ্রলোক তার ফিরে পাওয়া সম্পত্তি এক বাংগালী ধনকুবেরের কাছে বিক্রী করে দিয়ে আবার পাকিস্তান চলে গিয়েছেন। প্রথম অধ্যাদেশের বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বহাল থাকলে তিনি কোনদিন তার ফেলে যাওয়া সম্পদ ফেরত পেতে পারতেন না। একই উপায়ে বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসন বহাল থাকা কালীন আরও অনেক অবাংগালীই তাদের পরিত্যাক্ত সম্পত্তি ফিরে পেয়েছেন।

বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংগালী এবং বাংলাদেশ নামক দেশটির সৃস্টি হয়েছিল ঐ বাংগালী জাতীয়তাবাদ ও  বোধের উপর ভিত্তী করেই।  স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সন পর্যন্ত আমাদের সেই জাতীয়তাবাদ নিয়ে নাড়াচাড়া করার কোন প্রয়োজন দেখা দেয়নি। কিন্তু বাংলার অবিসংবাদিত নেতা,  সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংগালী, বাংগালী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, জাতির পিতা বংগবন্ধুর হায়েনাদের হাতে শাহাদাত বরন করার পরই এসব মিমাংশিত বিষয় নিয়ে আবার নাড়াচাড়া শুরু হয় এবং সামরিক শাসকের এক কলমের খোচায় জন্মগ্রহন করে এক আজব শিশু যার নাম রাখা হয় ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”। আর সেই পরিবর্তন সাধারন মানুষের কল্যানের জন্য নয়,  ক্ষমতাসীন সামরিক স্বৈরশাসকের এক পুরানো বন্ধুকে এক বিশাল পরিত্যাক্ত সম্পত্তি উপহার হিসাবে ফেরত দেওয়ার জন্যই সামরিক সূতিকাগারে জন্ম নেয় সেই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। অবাংগালীদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার একটা বাহানা ছাড়া আর কোন প্রভাব আমাদের জাতীয় জীবনে এই জাতীয়তাবাদ আনতে পেরেছে কি?  পারেনি।  সুতরাং আমাদেরকে জাতীয়তাবাদ নিয়ে আর বিভেদ নয়, আমাদেরকে  জাতীয়তাবাদ ও বোধের দীক্ষা নিতে হবে এবং সে জাতীয়তাবোধই পারবে আমাদেরকে সন্মুকের দিকে এগিয়ে নিতে।

আমার বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমাদের জাতীয়তাবোধই পারবে সেই সুনামকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে এবং আমরা যে পারবো তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে? নেই। সুতরাং  আমাদের  জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয়তাবোধ অটুট থাকবে এবং বিশ্বের কাছে এই রোল মডেল হিসেবেই পরিচিত থাকবে।

সাঈদুর রহমান সাঈদ।
মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত বিমানসেনা।

Related posts