September 22, 2018

বাংলাদেশি মুসাকে নিয়ে ভারতজুড়ে তোলপাড়

ঢাকাঃ  যে বাস্তব ঘটনা চলচ্চিত্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, তার এক যথার্থ উদাহরণ তৈরী করেছেন জামান ইবনে মুসা নামের এক বাংলাদেশি। বহুল আলোচিত ভারতীয় চলচ্চিত্র ‘বজরঙ্গি ভাইজান’র প্রেরণায় তাকে ডাকা হচ্ছে ‘বাংলাদেশি বজরঙ্গি ভাইজান’। চলচ্চিত্রের বজরঙ্গি ভাইজানকে (সালমান খান) ব্যাপক কষ্ট ও দুর্ভোগ মেনে নিয়ে পাকিস্তানি বোবা মেয়েকে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে হয়েছিল। বাস্তবে হারিয়ে যাওয়া এক সন্তানকে ভারতীয় বাবা-মার কাছে পৌঁছে দিতে তার চেয়েও বেশি কষ্ট, যন্ত্রণা ও হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বাংলাদেশের জামাল ইবনে মুসাকে।

এখন অবশ্য তিনি ভারতীয় বাবা-মার কাছে ৬ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সোনুকে পৌঁছে দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে। মামলার শিকার হওয়া, কারা জীবন যাপন ও চাকরি হারানোর পরও থেমে থাকেননি মুসা। সম্প্রতি ভারতে গিয়ে দেখা করেছেন সনুর বাবা-মায়ের সঙ্গে। মুসা দেখা করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গেও। তার কষ্টকর অভিযাত্রাকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হচ্ছে। ‘বাংলাদেশি বজরঙ্গি ভাইজান’ নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় চালু হয়েছে একটি ট্রেন্ডও। মুসাকে নিয়ে ভারতজুড়ে চলছে তোলপাড়।

ঘটনার সূত্রপাত ভারতের রাজধানী দিল্লির নিউ সীমাপুর যুগ্গি এলাকায়। সেখানকার বাসিন্দা মাহমুদ ও মাধুরী মমতাজের ছেলে সনুকে ২০১০ সালের ২৩ মে অপহরণ করা হয়। সনুকে দিল্লি থেকে অপহরণ করে রহিমা বেগম ও আকলিমা বেগম নামের দুই বোন বাংলাদেশের বরগুনায় নিয়ে আসেন। রহিমারা সাত বোন। তাদের কয়েকজন দিল্লিতে বাস করেন। তাদের বিরুদ্ধে শিশু পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

সনু ও মুসা

অপহরণের পর রহিমা ও আকলিমার সঙ্গে বরগুনা গেরামারদন গ্রামে থাকতে হয় সনুকে। তার ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন। দেশ ও বাবা-মা ছেড়ে এমন নির্যাতনের মুখে কয়েক বার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সনু। কিন্তু ব্যর্থ হয়। রহিমাদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন জামাল ইবনে মুসা। সনুর ওপর নির্যাতনের বিষয়টি তিনি নিয়মিতই দেখতেন। তিন বছর আগেই এ নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু পুলিশ সেই বাড়ি পরিদর্শন করলেও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। এর মধ্যে গত বছর সনু তৃতীয়বারের মতো রহিমাদের কাছ থেকে পালায়। এবার মুসা তাকে ধরে ফেলেন। নিজ দায়িত্বে ঢাকা নিয়ে আসেন তাকে। মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে চেষ্টা করেন সনুকে ভারতে ফেরত পাঠাতে। ২২ ডিসেম্বর বরগুনার একটি আদালতে সনুকে হাজির করেন মুসা। কিন্তু পুলিশ উল্টো সনুকে অপহরণের দায়ে মুসাকেই গ্রেফতার করে। তবে আদালত ও পুলিশের মধ্যস্ততায় ওই সময় সমস্যার সাময়িক সমাধান হয়। আদালত সনুকে যশোরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠান। তবে এর বিপরীতে রহিমা ও আকলিমার পরিবারের সদস্যরা মুসার বিরুদ্ধে ৪টি মিথ্যে মামলা দায়ের করে। ওই সময়ের দুর্দশা ও হয়রানির কথা জানান মুসা। তার কথায়, ‘ওরা আমাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মিথ্যা মামলার কারণে আমার পরিবারের ওপর নেমে এসেছে বিপর্যয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারিয়েছি আমি। দুই দফায় ৪১ দিন কারাগারে কাটিয়েছে। সনুকে সহযোগিতা করতে গিয়ে আমার শ্যালককেও কারাগারে যেতে হয়েছে।’

মুসা এতে দমে যাননি। সাহস না হারিয়ে নতুন করে সনুকে বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন তিনি। গত ১৪ মে মুসা দিল্লি গিয়ে সোনুর বাবা-মাকে খুঁজে বের করার কঠিন কাজটি শুরু করেন। সনু তাকে খুব বেশি কিছু জানাতে পারেনি। টানা চারদিন খোঁজার পর অবশেষে দিল্লির দিলশান গার্ডেনের সিমাপুরি এলাকায় সনুর বাবা-মাকে খুঁজে বের করেন। মুসা জানান, ‘সনুর বাবা-মা তাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলের খবর জানতে পেরে অত্যন্ত আপ্লুত হয়ে পড়েন।’

এরপরের ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে দ্রুত। স্থানীয় পুলিশের মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে সনু ও মুসার খবর প্রকাশ শুরু হয়। মুসাকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘বাংলাদেশি বজরঙ্গি ভাইজান’ নামে পরিচিত করে তোলে। কোনও কোনও ভারতীয় তাকে আখ্যা দেন সত্যিকারের নায়ক বা ‘রিয়েল হিরো’।

মুসা ও সনুর পরিবারকে একটি টিভি প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

এরপর টনক নড়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক উদ্যোগ ত্বরান্তিত হতে থাকে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন মুসা। সনুকে ভারতের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মন্ত্রীকে অনুরোধ জানান জানান তিনি। এরপর ২৪ মে একাধিক টুইটে সনুকে ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সুষমা জানান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ বিষয়ক যুগ্মসচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথন সনুর বাবা ও মা দাবি করা মেহবুব ও মুমতাজের সঙ্গে দেখা করেছেন। ওই দম্পতির সঙ্গে সনুর ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হবে। পরীক্ষায় ডিএনএ এক হলে শিগগিরই সনুকে ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

এদিকে সুষমা স্বরাজের টুইটের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জানান, সনুকে ভারতের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ ভারতীয় দূতাবাসকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সনুর ভারতের বাবা-মায়ের কাছে ফেরত যাওয়ার বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে। এ ব্যাপারে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি রামাকান্ত গুপ্ত ছেলেটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে ওই কেন্দ্রে গিয়েছেন। সনুর স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের বলেছি বাংলাদেশে আসতে। সনুকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আদালতে কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।’

কবে নাগাদ তাকে ভারতে ফেরত পাঠানো যাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ ছাড়া অন্য কোনও পদ্ধতি নেই। আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর দুই দেশের মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের করা হবে। মন্ত্রণালয় থেকে ট্রাভেল পারমিট দিলে তাকে নিয়ে যাওয়া যাবে। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ।’

এদিকে বাংলাদেশের বজরঙ্গি ভাইজান মুসাকে নিয়ে ভারতে চলছে তোলপাড়। টুইটারে বাংলাদেশি বজরঙ্গি ভাইজানকে নিয়ে ভারতে একাধিক হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হচ্ছে । একই সঙ্গে প্রশংসা পাচ্ছেন সুষমা স্বরাজ ও শাহরিয়ার আলম।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ৩০ মে ২০১৬

Related posts