November 19, 2018

বাংলাদেশিদের অবৈধ ইউরোপযাত্রা বাড়ছে

aঢাকা::মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন দেশ হয়ে দুই বছর ধরে অবৈধ পথে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে যাঁরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে। ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে তুরস্কে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি আটকে পড়েছে। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে গেছেন অন্তত সাড়ে পাঁচ হাজার বাংলাদেশি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিঙ্গি নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়া লোকজনের মধ্যে শীর্ষে আছে বাংলাদেশের নাগরিকেরা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এভাবে বাংলাদেশের ২ হাজার ৮০০ জন নাগরিক ইতালিতে গেছেন। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে ইরিন নিউজ জানিয়েছে, এ বছরের শুরু থেকে ২২ মে পর্যন্ত অবৈধভাবে ইতালিতে গেছেন ৫ হাজার ৬৫০ বাংলাদেশি। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫৭৮ জন।

গত কয়েক দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নানাভাবে ইউরোপে গিয়ে অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ কয়েক বছর ধরেই আলাদাভাবে বলে আসছে। গত বছরের শুরু থেকে ২৮ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অবৈধ বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টিতে জোর দিচ্ছে। অবৈধ এইসব লোকজনকে দ্রুত ফিরিয়ে আনা না হলে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর করার কথা জানিয়েছে ইইউ।

গত এপ্রিলে ঢাকা সফরের সময় ইইউ প্রতিনিধিদল ইউরোপে ৮০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশির উপস্থিতির কথা বলেছিল। ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আট বছরে ৯৩ হাজার ৪৩৫ জন বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন।

ইউরোপ থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক বৃহস্পতিবার বলেন, বাংলাদেশ সব সময় নিয়মতান্ত্রিক ও নিরাপদ অভিবাসনের বিষয়টিতে জোর দিচ্ছে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘে একটি কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাবও বাংলাদেশ দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ইউরোপে বাংলাদেশের যেসব নাগরিক আছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনা হবে। অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসনকামীদের ফেরানোর বিষয়ে বাংলাদেশ চাপে আছে কি না, জানতে চাইলে শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ইইউর সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে কথা চলছে। এসব লোককে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে একটি মানসম্মত পরিচালনা পদ্ধতি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর-এসওপি) চালুর বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ব্রাসেলসে ১২ জুলাই অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ-ইইউ যৌথ কমিশনের বৈঠকে এ নিয়ে অগ্রগতি হতে পারে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অবৈধ হয়ে পড়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের কোনো আপত্তি নেই। তবে ইইউ যেভাবে সময়সীমা বেঁধে দিতে চায়, তা নিয়ে বাংলাদেশের আপত্তি আছে। নাগরিকদের পরিচয় যাচাই করে এখন যেভাবে লোকজনকে ফেরত আনা হয়, সেটি সময়সাপেক্ষ বলে অনেকের অভিযোগ আছে। তাই ইউরোপ থেকে বাংলাদেশের অভিবাসনকামীদের ফেরানোর প্রক্রিয়াটি দ্রুততর করার বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে একটি খসড়াও সরকার প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এ বিষয়গুলো উল্লেখ করে ইইউকে ইতিমধ্যে বলা হয়েছে, ইউরোপ থেকে লোকজনকে ফেরানোর জন্য এখনই বাংলাদেশকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না।

ইউরোপ থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ইউরোস্ট্যাটের ২০১৫ সালের পরিসংখ্যানের উল্লেখ করা হলেও এখন পর্যন্ত এই সংখ্যা কিংবা অন্য কোনো সংখ্যার কথা ইইউ সরকারকে জানায়নি। এমনকি কোন দেশে কত অবৈধ বাংলাদেশি আছেন, সেটিও বলা হয়নি।

অবশ্য ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ২১ হাজার ৪৬০ বাংলাদেশি ইউরোপ গেছেন ২০১৫ সালে। অথচ ২০১৪ সালে ওই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৩৫। ২০১৩ সালে সংখ্যাটি ছিল ৯ হাজার ৪৯০ জন। ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে ওই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ৮৫, ৮ হাজার ৮৭০, ৯ হাজার ৭৭৫, ১১ হাজার ২৬০ ও ১৫ হাজার ৩৬০ জন।

ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত সিরিয়ায় শরণার্থীদের পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মানব পাচারকারীরা ২০১৫ সালে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে ইউরোপ যেতে প্রলুব্ধ করেছিল বলে ওই বছর সংখ্যাটি বেড়ে গিয়েছিল।

তুরস্ক থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আল্লামা সিদ্দিকী মুঠোফোনে জানান, সিরিয়া, ইরাক, ইরানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বাংলাদেশের হাজার দুয়েক লোক তুরস্কে আটকা পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে অন্তত ৪৭১ জনকে আটক করা হয়েছে। তুরস্কে যেসব বাংলাদেশি এসেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বৈধভাবেই কাজ করতেন। মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে তাঁরা ইউরোপ পাড়ি দিতে তুরস্কে এসে আটকা পড়ছেন। যেসব লোক দালালদের পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা দিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁরা নিজেদের ও পরিবারকে সংকটে ফেলে দিচ্ছেন।

যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, ইতালি, গ্রিস, লিবিয়া ও পর্তুগালে কাজ করেছেন বাংলাদেশের এমন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয়। তাঁদের মতে, গত বছর তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ‘ওয়ান ইন ওয়ান আউট’ চুক্তি সই করায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের তুরস্কে অবস্থান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, গ্রিক সিপ্রিয়টে আশ্রয় নেওয়া সিরিয়ার একজন শরণার্থী তুরস্কে ফিরলে এর বিনিময়ে তুরস্কে আশ্রয়প্রার্থী একজন সিরীয়কে ইউরোপে আশ্রয় দেওয়া হবে। চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী অন্যান্য দেশের নাগরিকদের তুরস্কে ফেরত পাঠানো হবে।

২০১৫ সালে সিরিয়ার শরণার্থী সংকট জটিল আকার নিলে বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার প্রসঙ্গটিও সামনে চলে আসে। ২০১৪ সালের শেষ দিকে জঙ্গি সংগঠন আইএসের বিস্তারের পর সিরিয়ার লোকজন তুরস্ক, লেবানন ও জর্ডানে আশ্রয় নিতে শুরু করে। একই সময়ে সহিংসতা এবং দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে ইরাক, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, নাইজার এবং কসোভোর লোকজনও ইউরোপ পাড়ি দিতে শুরু করে। মানব পাচারকারীরা ওই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশসহ অনেক দেশের লোকজনকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদ পাতে। ২০১৫ সালে প্রায় ১৫ লাখ শরণার্থী ‘বলকান রুট’ ধরে হেঁটে গ্রিস থেকে পশ্চিম ইউরোপে পাড়ি দেন। শরণার্থীরা গ্রিস থেকে জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ধনী দেশগুলোর দিকে এগোতে শুরু করে। একপর্যায়ে মরিয়া লোকজন ধারণক্ষমতার বেশি নৌকায় চড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে শুরু করে। লিবিয়া থেকে ইতালি অভিমুখী বিপজ্জনক সেই যাত্রায় অংশ নিতে গিয়ে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে সাগরে ডুবে যায় অন্তত ৮০০ মানুষ৷ আর বছর শেষে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মারা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চার হাজার৷

লিবিয়ায় বাংলাদেশের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এম মোজাম্মেল হক গতরাতে ত্রিপোলি থেকে মুঠোফোনে জানান, ঢাকা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো দেশ হয়ে দুবাই কিংবা জর্ডান কিংবা মিসর কিংবা তুরস্ক কিংবা তিউনিসিয়া হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। এরপর তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে, বিশেষ করে ইতালিতে পা রাখেন। লিবিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয় অব্যাহত থাকায় শ্রমবাজারে ধস নেমেছে। ফলে বাংলাদেশের লোকজন লিবিয়া থেকে পাড়ি জমাচ্ছেন ইতালিতে।

ইতালিতে সাহায্য সংস্থাগুলো বাংলাদেশের লোকজনকে উদ্ধার করছে কি না, জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশের ৯ হাজার ৯১৫ জন নাগরিককে উদ্ধারের বিষয়টি ইতালি সরকার বাংলাদেশকে জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে সাগরপথে পাড়ি দিতে বাংলাদেশি নাগরিকেরা প্রত্যেকে ৭০০ ডলার দেন দালালকে। সাগরপথে ইতালি যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক রুটে পরিণত হয়েছে উত্তর আফ্রিকার এই দেশটি। এ বছর সাগরে ডুবে, দম বন্ধ হয়ে কিংবা জাহাজে গাদাগাদির কারণে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশের প্রায় ১ হাজার ১০০ লোক প্রাণ হারিয়েছে।

আইওএমের ঢাকা দপ্তরের কর্মকর্তারা গতকাল এই প্রতিবেদককে জানান, চার বছর ধরে প্রায় একই হারে বাংলাদেশের লোকজন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ পাড়ি দেওয়া অব্যাহত আছে। মানব পাচারকারীদের একটি চক্র এঁদের অনেককে শুরুতে ঢাকা থেকে কয়েক মাসের ভ্রমণ ভিসায় লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে সাগরপথে নিয়ে যায় ইতালিতে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, সিরিয়ার শরণার্থী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মানব পাচারকারীরা বাংলাদেশের লোকজনকে ইউরোপে যেতে প্রলুব্ধ করছে। আবার বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশ হয়ে লোকজনকে ইউরোপ পাঠানোর প্রক্রিয়াটাও অনেক দিন ধরেই চলছে। দেশের বাইরের মানব পাচারকারী চক্রকে রুখে দেওয়া কঠিন হতে পারে, কিন্তু দেশের ভেতরের চক্রটি কেন এখনো প্রতিহত করা যাচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়।

ইউরোপ থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের অবৈধ তালিকায় যুক্ত করা হচ্ছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ, যাঁরা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, সেটির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অবৈধদের তালিকায় নেওয়ার সুযোগ নেই।

Related posts