December 19, 2018

বরাখাস্ত হচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬ কর্মকর্তা

ঢাকাঃ  বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যে ৬ কর্মকর্তার নাম এসেছে, তাদের সাময়িক বরাখাস্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে রিজার্ভ চুরির সঙ্গে ওই ৬ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ৬ কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

ওই ৬ কর্মকর্তার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের অধীন ‘ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুম’ শাখার যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদার নামও রয়েছে। যিনি ঘটনা ঘটার ৪০ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেছিলেন। এর বাইরে নাম রয়েছে উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, জি এম আব্দুল্লাহ ছালেহীন, শেখ রিয়াজউদ্দিন, রফিক আহমেদ মজুমদার ও গভর্নর সচিবালয় বিভাগের মইনুল ইসলামের। তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি সম্পন্ন হতে সহায়তা করেছে।

এছাড়া গভর্নর সচিবালয় বিভাগের মইনুল ইসলাম এবং অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের শেখ রিয়াজউদ্দিন তাদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড অপরাধীদের হাতে দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কী ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। তারপর তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, প্রতিবেদন আমি দেখিনি। এ কারণে আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি নিয়ে গঠিত কমিটি তাদের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবদেন সোমবার জমা দিয়েছে। সচিবালয়ে কমিটির প্রধান ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

এ সময় কমিটির প্রধান ফরাসউদ্দিন জানান, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। যদিও গত ১৫ মে ফরাস উদ্দিন বলেছিলেন, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সুইফট দায়ী।

রিজার্ভের অর্থ চুরি যাওয়ার এক মাস পর বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ দল তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। এর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও ঘটনার ছায়া তদন্তে নামে। ঘটনার পর ১৫ মার্চ ড. ফরাস উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন ও ৭৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।

প্রসঙ্গত, গত ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে সুইফট কোডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে নেয় হ্যাকাররা। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও ৮১ মিলিয়ন ডলার চলে যায় ফিলিপাইনে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৪ ফেব্রুয়ারি ঘটনা ঘটলেও প্রায় এক সপ্তাহ পরে জানানো হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে। অবশ্য শ্রীলঙ্কার প্যান এশিয়া ব্যাংকিং করপোরেশনে চলে যাওয়া অর্থ আটকে যায় একটি বানান ভুলের কারণে। ৮ ফ্রেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ‘স্টপ পেমেন্ট রিকোয়েস্ট’ ম্যাসেজ পাঠানোর পর ২০ মিলিয়ন ডলার আটকে দেয় সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০ মিলিয়ন ডলার চলে এলেও ৮১ মিলিয়ন ডলার চলে যায় ফিলিপাইনের জুয়ার আসরে।

চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আমান্ডো টেটাংকো জুনিয়রের কাছে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেন। কিন্তু দেশে তিনি এই ঘটনা গোপন রাখেন। এরপর গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের ডেইলি ইনকোয়ারারের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির খবর প্রকাশ পায়। পরে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও এ খবর এলে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

ফরাস উদ্দিনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবদেন অনুযায়ী, সুইফট সার্ভারের পাসওয়ার্ড নকল করতে অপরাধীদের সহায়তা করেছেন অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের জুবায়ের বিন হুদা ও আব্দুল্লাহ ছালেহীন। তবে হ্যাকাররা রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করতে একই বিভাগের কর্মকর্তা শেখ রিয়াজউদ্দিনের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। হ্যাক হওয়ার আগে সর্বশেষ সার্ভারটি ব্যবহার করেছিলেন রিয়াজউদ্দিন, তাই হ্যাকাররা রেকনিসেন্স’ ও ভেরিফিকেশন করে রিয়াজউদ্দিনের আইডি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেয়।

এতে বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক, সুইফট ও ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকেরও দায় রয়েছে।

গত বছর নভেম্বরে সুইফটের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে আসেন নিলাভান্নান। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিলাভান্নান ছিলেন সুইফটের ভুয়া প্রতিনিধি। তিনি এসে সুইফট সার্ভার ব্যবহারকারীদের আইডি ও পাসওয়ার্ড নকল করে নেন। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় নিলাভান্নানকে প্রধানতম অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি।

রিজার্ভ চুরির ঘটনা মাসখানেকেরও বেশি সময় সরকার বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে গোপন রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে চুরির ঘটনা সরকারের কাছে গোপন রাখার কোনও যুক্তি খুঁজে পায়নি ড. ফরাস উদ্দিনের তদন্ত কমিটি। গোপন করার বিষয়টিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদানীন্তন গভর্নর, ডেপুটি গভর্নরগণ গর্হিত অপরাধ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক কৌশলী তৎপরতার সাহায্যে অত্যন্ত যোগ্য আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ৩০ মে ২০১৬

Related posts