September 22, 2018

বন্ধ হচ্ছে মেডিক্যাল ভর্তি কোচিং সেন্টার!

ঢাকাঃ  মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া নিয়ে গত কয়েক বছর সরকারকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। এবার তাই আগাম ‘প্রতিরোধমূলক’ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে মেডিক্যাল কোচিং সেন্টার বন্ধের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসছে। এ ছাড়া পরীক্ষার আগে-পরে ফেসবুক-ট্ইুটারসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখার একগুচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা হচ্ছে।

গত কয়েক বছর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তুলে পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পরীক্ষা স্থগিতের জন্য উচ্চ আদালতে রিটও হয়। বিষয়টি নিয়ে সরকারও বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। এ বাস্তবতায় ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির ধরন, প্রশ্নপত্র ফাঁস বা ফাঁসের গুজবসহ যে কোনো ধরনের ‘ষড়যন্ত্র’ রোধে পদক্ষেপ গ্রহণে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, মেডিক্যাল কলেজের প্রধান, চিকিৎসক নেতা, সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা হ্রাস, মেডিক্যাল কোচিং সেন্টার বন্ধ, পরীক্ষার আগে-পরে ফেসবুক-ট্ইুটারসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখার বিষয়ে মত দেন। কোচিং সেন্টার বন্ধের বিষয়টির ওপর কয়েকজন জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। মন্ত্রীও তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এক পরিচালক বলেন, এর আগেও কোচিং সেন্টার বন্ধের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা প্রস্তাবও দিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। তাই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত কোনো কিছু পরিষ্কার করে বলা যাবে না।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীও চান সবার মতামতের ভিত্তিতে মেডিক্যাল কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ হোক। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় তিনি নিতে চান না। কারণ তার কাছে অনেকের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলো জড়িত থাকে।

সরকারসংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেন, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কোচিং ব্যবসায়ের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সুসম্পর্ক আছে, এমন অনেকেই জড়িত। যার কারণে সদিচ্ছা থাকলেও তা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার থেকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত এলেই শুধু কোচিং সেন্টার বন্ধ করা সম্ভব।

বৈঠকে বক্তারাও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস বা ফাঁসের গুজব ছড়ানোর সঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলোর জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব কোচিং সেন্টারের মালিক বা পরিচালনাকারীরা হচ্ছেন বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক ও শিক্ষক। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা ফাঁসের গুজবসহ সব ধরনের ষড়যন্ত্র রোধে মেডিক্যাল ভর্তি কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করে দেওয়া দরকার।

তাদের মতামত, সারা দেশের ২৩টি পরীক্ষা সেন্টার না রেখে ঢাকায় ৫-৬টি ও বিভাগীয় পর্যায়ে একটি করে সেন্টার করা যেতে পারে। এতে পরীক্ষা গ্রহণ কার্যক্রম আরও নির্বিঘ্ন করা যাবে।

বৈঠকে সবার মতামত শুনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হলেই মানুষ গুজব ছড়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছে সরকার। আপনারা মেডিক্যাল ভর্তি কোচিং সেন্টার বন্ধসহ পদক্ষেপ গ্রহণের পক্ষে মতামত দিয়েছেন তা আমলে নেওয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। এ বিষয়ে একটি সাবকমিটি গঠন করে দেওয়া যায় কিনা ভাবছি। আপনাদের ও কমিটির মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমি চাই যে কোনো মূল্যে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা স্বচ্ছ হোক এবং কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না হোক। মেধাবীরা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হতে পারে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বৈঠকে স্বাস্থ্য সচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান ও মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ইসমাইল হোসেন, বিএসএমএমইউর প্রোভিসি শারফুদ্দিন আহমেদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষ), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক। তিনি বলেন, দেশের সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ৩ হাজার ২১২টি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে সাড়ে ৬ হাজার আসনসহ প্রায় ১০ হাজার আসন রয়েছে। এসব আসনে হাজার-হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে থাকে। দেশের ২৩টি মেডিক্যাল কলেজে একযোগে ভর্তির পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে। প্রশ্নপত্র তৈরি, পরীক্ষা কেন্দ্র সরবরাহ ও পরীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশে হলেও পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, একজন লোক যদি এমএ পাস করার পর কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে তার মেধা কম হলেও জাতির ওপর তেমন প্রভাব পড়ে না। সেটার প্রভাব পড়ে একমাত্র কর্মক্ষেত্রে। কিন্তু একজন চিকিৎসক যদি ভুল করে তার প্রভাব অনেকটাই জাতির ওপর পড়ে। যারা চিকিৎসক হবে তাদের মেধা যাচাই করে নিতে হবে।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি তৌফিক মারুফসহ কয়েকজন প্রায় ভিন্ন বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি নিশ্চয়তা দিচ্ছে কোচিং সেন্টারগুলো। এসব কোচিং সেন্টারের দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত। কারণ কোচিং সেন্টারগুলো থেকে বলা হয়ে থাকে, ভর্তি পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হবে। এমন প্রলোভনে পড়ে শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। যারা ডাক্তার হবে তাদের মেধার পাশাপাশি মানবিকতা ও ব্যবহার জেনে নেওয়ার কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা দরকার।

বৈঠকে বক্তারা বলেন, গত বছর মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি পরীক্ষার আগে মেডিক্যাল অ্যাডমিশন টেস্ট-২০১৫ নামের একটি গ্রুপ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, তারা প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র নেওয়া হলে পরীক্ষায় শতভাগ কমন পড়বে। গ্রুপটির কেউ কেউ নমুনা হিসেবে হাতের লেখা কয়েকটি প্রশ্ন লিখে দিয়েছেন। ফেসবুকে এমন স্ট্যাটাস দেখে কেউ কেউ প্রশ্ন কিনতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও পারে।

Related posts