September 25, 2018

বজ্রপাতঃ সচেতানতাই একমাত্র বিকল্প

রাজু আহমেদ
মহান আল্লাহ তার বিশ্ব সৃষ্টির রহস্যে মানবজাতির জন্য রেখেছেন নানা দূর্বোধ্য বিষয় অথচ যা অত্যন্ত শিক্ষণীয় । জগৎ সৃষ্টির পরতে পরতে এঁকে দিয়েছেন তার সীমাহীন শক্তির প্রকাশ । বিশ্ব প্রকৃতির স্রষ্টা জগতের সবকিছুতে দিয়েছেন ভারসাম্য । যার ফলে বিশ্ব প্রকৃতি হয়েছে মানুষের বাসপোযোগী । তবে কিছু অসৎ মানুষের অশুভ কর্মকান্ড কখনো কখনো জগৎ সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় পূর্ব প্রতিষ্ঠিত ভারসাম্যকে বিনষ্ট করে ।  তখন সৃষ্টি হয় নানা দুর্যোগ । হুমকির মুখে পতিত হয় মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী বৈচিত্র্যের অস্তিত্ব । মানুষের ক্ষতিকর ক্রিয়াকলাপে মানবজাতির জন্য যতগুলো হুমকি সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে ব্রজপাত বা বাজ অন্যতম  ।

গাছপালার পরিমান হৃাস পাওয়ার কারণে বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে । বিজ্ঞানীর মনে করেন, পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি অক্ষুন্ন রাখার জন্য বজ্রপাত প্রাকৃতিক চার্জ হিসেব কাজ করে ।  আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়েছে । অতীতে বজ্রপাত হত, এখনো হয় । তবে অতীতের চেয়ে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে বহুগুন । পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে বজ্রপাতে আমাদের দেশে মারা গেছে ১ হাজার ২৪৯ জন । সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে বেশি লোক মারা যায়। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবারে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৭০ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছে । যা স্মরণকালের সর্বাধিক সংখ্যক । জানা গেছে, বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মারা যায় কৃষক (৫১শতাংশ), ঘরে থাকা মানুষ(২২ শতাংশ), রাস্তাঘাটে ও পানিতে থাকা মানুষ (প্রায় ১৪ শতাংশ), স্কুলশিশু (প্রায় ১১ শতাংশ) এবং আঘাতের শিকার হয়ে(প্রায় ২২ শতাংশ) । তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলেই বজ্রপাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় ।

গড় তাপমাত্র বাড়ার অনুপাতে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশেরও বেশি বজ্রপাত হওয়ার পাশাপাশি আগামীতে আমাদের দেশে এর পরিমাণ আরো বাড়ার আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা । যুক্তরাষ্টের কেন্ট সেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, হিমালয়ের পাদদেশে থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অ লে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ধারায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ । যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি ইনস্টিটিউটের ২০১০ সালের প্রতিবেদন মতে, প্রতি বছর সারাবিশ্বে বজ্রপাতে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে তার এক-চতুর্থাংশ ঘটে বাংলাদেশে । তথ্যাদি ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট যে, বজ্রপাত বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে । বিজ্ঞানীদের মতে, স ালনশীল গভীর মেঘমালায় সংঘর্ষের ফলে বজ্রপাত হয় ।

মূলত বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগেও বিজ্ঞান বজ্রপাত সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য দিতে পারে নি । প্রাচীনকালের মানুষের বাজকে মনে করতো সৃষ্টিকর্তার রাগের বহিঃপ্রকাশ ! আর এজন্য প্রকৃতি দেবীকে সন্তুষ্ট করতে বড় ধরণেল আয়োজন করে চলতো পূজার্চনা । মানুষের সে কুসংস্কার বর্তমানে বহুলাংশে দূর হয়েছে বটে কিন্তু আজও বজ্রপাতের সঠিক রহস্য উদঘাটিত হয়নি । ভূমিকম্পের মত বজ্রপাত সম্পর্কেও আবহাওয়াবিদরা আাগাম সতর্কতা দিতে না পারায় বজ্রপাতে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে । প্রশ্ন জেগেছে, বজ্রপাত কি শুধু প্রাকৃতির দুর্যোগ নাকি মানুষের পাপের ফল ? যদি এটা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হত তবে বছরের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে বজ্রপাত সংঘটিত হত কিন্তু এখন এর পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে । দেশের ইতিহাসের স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে বৃহস্পতি-শুক্রবারের বজ্রপাতে ।  বর্জপাত এমন প্রকৃতির দুর্যোগ, যা করো প্রতি আঘাত হানলে তার রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বজ্রপাতের বিষয়ে বিজ্ঞান যতটুকু ধারণা দিতে পেরেছে তা থেকে জানা যায়, এর তাপমাত্রা ৪০,০০০ ডিগ্রি সেন্টেগ্রেড, গতিবেঘ ঘন্টায় প্রায় ২,২০,০০০ কিলোমিটার, দৈর্ঘ্য ১০০ মিটার থেকে ৮ কিলোমিটার পর্যন্ত, ব্যাসার্ধ ১০-২৫০ মিলিমিটার, বিদ্যুত প্রবাহ ১০ কিলো থেকে  ১ কোটি ভোল্ট, স্থায়িত্ব ১-২মাইক্রো সেকেন্ড ।  শুনে অবাক হবেন, আপনি যে মূহুর্তে এই প্রতিবেদনটি পড়ছেন, তখনই পৃথিবীতে দুই হাজারেরও বেশি বজ্রপাত ঘটে গেছে । যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অফ জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডবিউ স্মিডলিনের ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলেন, প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪০টি বজ্রপাত হয় ।  বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, একেকটি বজ্রপাতের সময় ৬০০ মেগাভোল্ট বিদ্যুত প্রবাহিত হয় । কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য মাত্র ১১০ ভোল্ট বিদ্যুত যথেষ্ট । সাধারণত আমরা বাসাবাড়িতে মাত্র ২২০ ভোল্ট এবং শিল্প-কারখানায় ১২’শ ভোল্ট বিদ্যুত ব্যবহার করি ।

পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে বজ্রপাতের সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে । অথচ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও তা মানা হচ্ছে না । ইসলামী জীবনদর্শনে প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আচরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন । পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলামের শিক্ষা ও মূল্যবোধই পরিবেশ বিপর্যয় রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম । ইসলামের মৌলিক শিক্ষানুযায়ী আজ যদি মানুষ পরিবেশকে স্বাভাবিক রাখত, তবে বজ্রপাতের সংখ্যা যেমন কম হত তেমনি প্রাণের ক্ষতি দাঁড়াত শুণ্যের কোঠায় । আল্লাহ পক্ষ থেকে গাছপালা, পাহাড়-পর্বত মানুষের জন্য বিশাল নিয়ামত । অথচ মানুষ অপরিকল্পিতভাবে গাছ ও পাহাড় কেটে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের খাঁদ তৈরি করছে । আরও লক্ষ্য করলে দেখা যায়, চন্দ্র-সূর্যের আবর্তন, বাতাস, মেঘ-ছায়া, রৌদ্র ও নদীর পানি ইত্যাদি নিদর্শন জ্ঞানীদের চিন্তার খোরাক । এ বিষয়ে কোরআনে কারিমে ঘোষণা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না।’ সূর ইবরাহি-৩৯ ।

মহান স্রষ্টা জগতের কিছুই যে অনর্থক সৃষ্টি করেননি তার বড় প্রমাণ বজ্রপাত । সূর আদ দোখানের ৩৮ সংখ্যক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘আমি আকাশম-লী ও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যে কোন কিছুই অনর্থক সৃষ্টি করিনি।’ মানুষ যখন প্রাকৃতিক পরিবেশের বৃহৎ ক্ষতি সাধণ করছে তখন মধ্যাকর্ষণ শক্তির ভারসাম্য রাখার জন্য বজ্রপাত ঘটানো হচ্ছে । আর মানুষের অশুভ কৃতকর্মের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষ ।  কেননা নগর পুড়লে যে দেবালয় এড়ায় না ।

বজ্রপাতের আগাম সতর্কতা না থাকায় দিন দিন বজ্রপাতের কারণে প্রাণহানীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ।  মূলত বজ্রপাতকে প্রতিরোধ করার সাধ্য কারো নাই যদি না পরিবেশের ভারসাম্য বজায়ের উদ্যোগ গ্রহন করা হয় । তবে বর্তমানে পরিবেশ বিপর্যয় এমন স্তরে পৌঁছেছে, যা থেকে পূর্বের অবস্থায় উত্তরণের সম্ভাবনা প্রায় অসাধ্য । সুতরাং বজ্রপাত এবং এর থেকে সৃষ্টি ক্ষতিকে আমাদের কৃতকর্মের ফল ভেবে সচেতনতা ও সতর্কতা সৃষ্টির মাধ্যমে জীবন ও সম্পদ রক্ষার চেষ্টা করার বিকল্প নাই । সতর্কতার কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করলে বজ্রপাতের বৃহৎ ক্ষতি থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমানে রেহাই পাওয়া সম্ভব । এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ । দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম এ ব্যাপারে বৃহৎ উদ্যোগ নিতে পারে । মিডিয়ায় বজ্রপাত নিয়ে বৃহৎ পরিসরে আলোচনা না হওয়াও এর বৃহৎ ক্ষতির কারণ । সাধারণ যে উপায়গুলো অনুসরণ করলে বজ্রপাতের তুমুল ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হল- ১. ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোন অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু স্থানে অবস্থান করা যাবে না । কেননা বজ্রপাত সর্বদা উঁচু স্থানে ঘটে ।

উঁচু গাছপাল ও বিদ্যুত লাইন থেকে দূরে অবস্থান করতে হবে । খোলা স্থানে বিচ্ছিন্ন যাত্রী ছাউনি ও তালগাছ বা বড় গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল থাকে । বজ্রপাত শুরু হলেই পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিতে পারলে ভালো হয় । ২. বজ্রপাতকালীন সময়ে ঘরে অবস্থান করলেও কোনভাবেই জানালার পাশে যাওয়া উচিত নয় । বজ্রপাতের সময় ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা ঝুঁকিপূর্ণ । এ সময় টিভি দেখা, ল্যান্ড লাইন টেলিফোন বা মোবাইল ফোনে কথা বলাও অত্যন্ত ঝুঁকির ।  ৩. বজ্রপাতের সময়  পানিতে সাঁতার কাটা বা জলবদ্ধ স্থানে থাকা যাবে না । কেননা পানি খুব ভালো বিদ্যুত পরিবাহী । কয়েকজন মিলে খোলা স্থানে থাকাকালীন যদি বজ্রপাত শুরু হয় তাহলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যাওয়া উচিত। ৪. যদি বজ্রপাত হওয়র উপক্রম হয় তাহলে কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসুন । মাটিতে শুয়ে পড়া নিরাপদ নয় ।  এ সময় রাবার বা প্লাষ্টিকের বুট ব্যবহার করুণ ।

বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সতর্কতাই একমাত্র বিকল্প পথ। সাথে সাথে নিজের অবস্থান থেকে পরিবেশকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। পরিবেশের বিপর্যয় রোধে যদি আশু ব্যবস্থা গ্রহন করা না হয় তবে অচিরেই বাংলাদেশ ও এখানকার মানুষের জন্য বজ্রপাত মহাদূর্যোগ হিসেবে আবিভূর্ত হবে । আমাদের বয়সে এক দিনে বজ্রপাতে অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর দ্বিতীয়বার শুনিনি, যার স্বাক্ষী হতে হয়েছে চলতি বছরে । বজ্রপাত থেকে রক্ষার পাওয়ার জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগের চেয়ে আল্লাহর কাছে এ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রার্থণা করা বেশি জরুরী । আল্লাহ আমাদের সবাইকে রক্ষা করুণ । সর্বোপরি কথা হচ্ছে, কোন জনপদে অনাচার, পাপাচার বৃদ্ধি পেলে সেখানে প্রভূর গজব পতিত হবেই । আমাদের ওপর দিয়েও বোধহয় তেমন কোন ক্রান্তিকাল যাচ্ছে । কেননা পাপের সাগরে নিয়ত হাবুডুবু খাচ্ছি আমরা ।  আমাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে এবং বেশি বেশি প্রার্থণা করলে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদেরকে তার গজব থেকে পরিত্রান দিবেন ।

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

Related posts