November 15, 2018

বঙ্গোপসাগরে আটকা পড়েছে অর্ধশতাধিক নিত্যপণ্যের জাহাজ!

ঢাকাঃ  বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় জ্বালানি তেলের মজুদ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে ৭০টি জ্বালানি তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ (মাদার ভেসেল) মধ্য বঙ্গোপসাগরে আটকা পড়েছে। গত ২০ এপ্রিল থেকেই জাহাজগুলো বঙ্গোপসাগরে ভাসছে। এই পরিস্থিতিতে সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যবাহী জাহাজগুলো সাগরে ভাসার প্রধান কারণ হলো, বেতনের দাবিতে জাহাজ শ্রমিকদের ধর্মঘট। দ্বিতীয় কারণ, নৌপরিবহনমন্ত্রী শ্রমিকদের অতিরিক্ত বেতন নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রতিবাদে মালিকদের জাহাজ না চালানোর সিদ্ধান্ত। সব শেষে যোগ হয়েছে বৈরি আবহাওয়ার কারণে সাগরের প্রচণ্ড ঢেউ। গত ১৭দিন ধরে মধ্য বঙ্গোসাগরে অবস্থানকারী মাদার ভেসেল থেকে জ্বালানি তেল খালাস করা যাচ্ছে না। এ কারণে জ্বালানি তেল সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। এর ফলে লোড শেডিং বাড়ছে। একই কারণে বাজারে সব ধরনের নিত্যপণ্যের সরবরাহ কমেছে। ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা বলছেন, এ অব্স্থা চলতে থাকে লোডশেডিং বাড়তে থাকবে। একইসঙ্গে নিত্যপণ্যের বাজারেও সংকট দেখা দেবে।

জানা গেছে, ২৬ এপ্রিল থেকে শ্রমিকদের ধর্মঘট শেষ হলেও মালিকদের জাহাজ না চালানোর সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে পারেননি। ২ মে বিকেলে সচিবালয়ে জাহাজ মালিকদের সঙ্গে নৌমন্ত্রীর বৈঠকে জাহাজ মালিকরাও জাহাজ না চালানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। এরপরও লাইটারেজগুলো মাদার ভেসেল থেকে জ্বালানি খালাস করতে পারছে না। এ সব বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে (লাইটারেজ) করে বন্দরে তেল আনার কথা থাকলেও ছোট লাইটারেজগুলো মাদার ভেসেলের কাছে যাওয়ার সাহস করছে না। কয়েকটি লাইটারেজ মাদার ভেসেলের দিকে এগুলেও ফিরে এসেছে বলে জানা গেছে। সাগর উত্তাল। প্রচণ্ড ঢেউ। এ কারণে লাইটারেজ জাহাজগুলো মাদার ভেসেলের কাছে ঘেঁষতে পারছে না। কিছু কিছু লাইটারেজ মাদার ভেসেল থেকে জ্বালানি খালাস করলেও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এ কারণে অনেকটাই জ্বালানি তেল সংকটে পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ফলে লোডশেডিংও বাড়ছে। এদিকে, একই কারণে বাজারে সব ধরনের নিত্যপণ্যের সরবরাহ কমেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিক ধর্মঘট ও সাগর উত্তাল থাকার কারণে বহির্নোঙরে জাহাজ জট লেগেছে। সিমেন্ট, ভোজ্যতেল, কয়লা, চিনি, ডাল, ছোলা, মটর ও গমসহ প্রায় ৬০/৬২টি জাহাজ আটকা পড়েছে মধ্য বঙ্গোপসাগরে। এ ছাড়া বাইরে খালি জাহাজও রয়েছে ২০/২২টি। এ সব জাহাজে আটকেপড়া পণ্যের পরিমাণ কমপক্ষে ৩০ থেকে ৩২ লাখ টন। আগামী সপ্তাহে আরও প্রায় ২০ লাখ টন পণ্য নিয়ে ৪৬টি জাহাজ বহির্নোঙরে এসে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২ মে সোমবার বিকেল থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হলেও লাইটারেজ জাহাজের কার্যক্রম শুরু হয় ওইদিন সন্ধ্যার পর থেকে। এ সময় কয়েকটি জাহাজের বুকিং দেওয়া হলেও বৈরি আবহাওয়ার কারণে জাহাজগুলো মধ্য বঙ্গোসাগরের উদ্দেশে রওয়ানা দিতে পারেনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নৌধর্মঘট ও সাগর উত্তালে সৃষ্ট এ জট খুলতে আরও কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। সামনে রমজান থাকায় এ অবস্থায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে বলেও আশঙ্কা করছেন কেউ-কেউ।

এ প্রসঙ্গে নিত্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেছেন, নৌশ্রমিকদের ধর্মঘটে কিছু সমস্যা তো হয়েছেই। পরে সাগরে প্রচণ্ড ঢেউ থাকার কারণেও স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। এ সব সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে পণ্য খালাসে জট লেগে যাবে।

মুসকান গ্রুপের ব্যবস্থাপক আজিজুর রহমান বলেন, আমদানি করা পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খালাস হয়। তাই কোনও কারণে বহির্নোঙরে জট সৃষ্টি হলে তা কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লাগে। এ সময় বসে থাকতে হয়। এর জন্য বাড়তি ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলারও গুনতে হয় আমদানিকারদের। তিনি জানান, সামনে রমজান। রমজানের যেসব নিত্যপণ্য আটকে গেছে, সে গণ্যগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাস করা উচিত।

বিষয়টি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল খালেদ ইকবাল নৌমন্ত্রী শাজাহান খানকেও জানিয়েছেন বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ প্রসঙ্গে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, আবহাওয়ার ওপরে তো আর কারও হাত নেই। তবে জাহাজগুলো যেহেতু গভীর সাগরে যায়, সেহেতু আবহাওয়া দেখেশুনে চলতে হয়। তাই হয়তো এমনটি হচ্ছে। তবে আবহাওয়া ঠিক হয়ে গেলে দ্রুত পণ্য খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সমস্যা হবে না।

সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনে জ্বালানি তেল না পেলে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা যদি হয়, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, জাহাজে আসা জ্বালানি তেল ভৈরবের পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই তিনটি ডিপোতে রাখা হয়। পরে ওই তেল সড়কপথে ভৈরব-আশুগঞ্জসহ কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নরসিংদী জেলায় সড়কপথে এবং নদীপথে সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরাঞ্চলের কয়েকটি উপজেলায় সরবরাহ করা হয়। উত্তরাঞ্চলের বাঘাবাড়ীসহ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় জ্বালানি তেল সরবরাহ কমে গেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৪৬টি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট উৎপাদনের পরিমাণ ২ হাজার ৬৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ ৯৬, হরিপুর ১১০, পাগলা ৫০ মেগাওয়াট, সৈয়দপুর ২০, ভেড়ামারা ১০৫, যশোরের নোয়াপাড়া ১১০, দোহাজারি ১১০, খুলনা ১৫০, খুলনা ১০১ মেগাওয়াট তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামতের জন্য বন্ধ। এরপর আবার তেল সংকট দেখা দিলে বাকি কেন্দ্রগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোডশেডিং চলছে। তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হলে পরিস্থিতি কঠিন হবে। মঙ্গলবার দেশে বিদ্যুতের চাহিদার ৭ হাজার ৪৪৭ মেগাওয়াটের বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে ৭ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট।

দেশের ১০২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১১ হাজার ৭৪৪ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকট ও মেরামতের কারণে প্রায় ২ হাজার ৪২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এমনিতেই কম উৎপাদন হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আমদানি করা হয় বেশি। এছাড়া কিছু অপরিশোধিত তেলও বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে এখন ব্যবহার করা হয় ৯০ লাখ টন তেল। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল। এর বেশিরভাগই ব্যবহার করা হয় বিদ্যুৎ খাতে। বছরে আমদানি করা জ্বালানি তেলের পরিমাণ প্রায় ৫৫ লাখ টন। এর ৩৩ লাখ টন ডিজেল ও আড়াই লাখ টন ফার্নেস অয়েল।

উল্লেখ্য, বেতন-ভাতা বাড়ানোসহ ১৫ দফা দাবিতে গত ২০ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে সারাদেশে কর্মবিরতি শুরু করেন নৌযান শ্রমিকরা। কর্মবিরতি আহ্বান করা সংগঠনগুলো হলো নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন, জাহাজি শ্রমিক ফেডারেশন, লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন ও কার্গো ট্রলার বাল্কহেড শ্রমিক ইউনিয়ন।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/৫ মে ২০১৬

Related posts